বর্তমান সরকার পদ্মা ব্যারাজের পাশাপাশি তিস্তা ব্যারাজও নির্মাণ করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (২০ মে) বিকেলে গাজীপুরে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে তিনি এ ঘোষণা দেন।এর আগে তিনি এই ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আপনাদের সবার সামনে আজকে আমি পরিষ্কার একটি কথা বলে যাই, ইনশাআল্লাহ এই বিএনপি সরকার পদ্মা ব্যারাজের কাজে হাত দেবে।ইনশাআল্লাহ তিস্তা ব্যারাজের কাজেও হাত দেবে।”
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যারা বড় বড় কথা বলছে, তাদের উদ্দেশে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই—আজকে এখানে দুর্যোগ মন্ত্রী (আসাদুল হাবিব দুলু) বসে আছেন, এই লোকটার নেতৃত্বেই তিস্তায় বিএনপি কর্মসূচি পালন করেছে, যা বাংলাদেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক দল করেনি।
তারা হয়তো গরম কথা বলেছে, কিন্তু কাজ যদি কেউ করে থাকে, পরিস্থিতি যদি কেউ তৈরি করে থাকে, সেটা বিএনপিই করেছে এবং ইনশাআল্লাহ বিএনপিই সেটা করবে।”
পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ কেন জরুরি
পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের যৌক্তিকতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সীমান্তের ওপারে ব্যারাজ তৈরি করে বিভিন্নভাবে পানি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে আমরা কম পানি পাচ্ছি। নদীতে স্রোত কমে যাওয়ায় আশপাশ শুকিয়ে যাচ্ছে। একসময় পদ্মা নদীর এপার থেকে ওপার দেখা যেত না, এখন তা পানিশূন্য।”
তিনি আরও বলেন, “ফারাক্কা বাঁধের কারণে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় ধীরে ধীরে দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রের নোনা পানি ঢুকছে। এর ফলে সুন্দরবনসহ ওই অঞ্চলের গাছপালা নষ্ট হচ্ছে এবং বিভিন্ন বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে এবং শুষ্ক মৌসুমে মানুষকে পানি সরবরাহ করতে আমাদের ব্যারাজ নির্মাণ করে বর্ষার বাড়তি পানি ধরে রাখতে হবে।”পরিবেশ-জলবায়ু বদলাচ্ছে
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের আবহাওয়া পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময় আমরা যে পরিমাণ শীত দেখতাম, এখন আর তা দেখা যায় না। বিদেশ থেকে জুমে মিটিং করার সময়ও দেখেছি, ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসেও দেশের মানুষ বলছে শীত পড়েনি।”
রাস্তায় আসার সময় বালির ওপর পড়ে থাকা একটি বড় ডিঙি নৌকার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “এটি দেখে মনে হলো, ২০-২৫ বছর আগে হয়তো ওই জায়গাটিতে নদী বা পানি ছিল। জনসংখ্যা বাড়ছে এবং জায়গা সংকুচিত হচ্ছে, তাই পরিবেশের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে।”
কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে গিয়ে বিপুল সংখ্যক বৃক্ষ নিধনের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “সম্প্রতি পত্রিকায় দেখলাম কক্সবাজারে বিচ রোড করার জন্য প্রায় তিন হাজার গাছ কেটে ফেলা হবে। আমি তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীকে ফোন করে বলেছি, প্রয়োজনে ডিজাইনে পরিবর্তন আনতে হবে, কিন্তু কোনো গাছ কাটা যাবে না।”দুর্যোগ মোকাবিলায় সচেতন হতে হবে
প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা মানুষের নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ একটি জনবহুল ও দুর্যোগপ্রবণ দেশ। এই নতুন প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করা এবং ভূমিকম্প বা জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগে সম্পদ ও মানুষের প্রাণ কীভাবে রক্ষা করা যায়, তার উপায় বের করা।”
শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণের জন্য খাল খনন কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, “দুর্যোগ আমরা থামাতে পারব না, তবে মানুষকে সচেতন করতে পারব। নিজেদের অজ্ঞতা ও অবহেলায় যেন দেশের সম্পদ নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরিবেশকে রক্ষা করতে আমাদের বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ এবং খাল খনন করতে হবে। প্রকৃতিকে যত কম ডিস্টার্ব করা যায়, আমরা সেই কাজটিই করব।”
জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন, মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খান এবং জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজানুর রহমান।
অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে স্মারক শুভেচ্ছা দেওয়া হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামসুল ইসলাম, সংসদ সদস্য মনজুরুল করিম রনি, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকারসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।