পর্ব – ৮
কারাগারের সেই দরজাটা আবার খুলল।
অনেক বছর পরে।
কেউ একজন চিৎকার করে বলল—
“সামির!”
সে চমকে উঠল।
এই নামটা সে কতবার শুনেছে—
স্বপ্নে, দুঃস্বপ্নে, নিজের ভেতরে।
কিন্তু আজ—
এটা বাস্তব।
মুক্তি—নাকি আরেকটা শূন্যতা,
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার চুলে পাক ধরেছে।
চোখে বয়স।
কিন্তু বয়সটা শুধু বছর দিয়ে মাপা যায় না।
সে বাইরে বের হলো।
আলো তার চোখে লাগল।
সে চোখ কুঁচকে ফেলল।
এই আলো—
এতদিন পরে অচেনা।
দরজার ওপাশে
সে চারদিকে তাকাল।
কেউ নেই।
কোনো মা দাঁড়িয়ে নেই।
কোনো পরিচিত মুখ নেই।
শুধু খালি জায়গা।
সে আস্তে বলল—
“আম্মা…”
কোনো উত্তর নেই।
ফিরে যাওয়া,
সে তার এলাকার দিকে হাঁটতে শুরু করল।
পথগুলো বদলে গেছে।
কিছু রাস্তা নেই।
কিছু বাড়ি নেই।
সে থেমে যায়।
“এইখানে তো…”
তার বাড়ি ছিল।
এখন সেখানে—
ধ্বংসস্তূপ।
স্মৃতির ভেতর হাঁটা
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
একটা ভাঙা দেয়ালে হাত রাখল।
তার মনে পড়ছে—
তার মা এখানে বসে থাকত।
তার বোন এখানে খেলত।
সে চোখ বন্ধ করল।
সব শব্দ ফিরে আসছে—
“সামির…”
“ভাইয়া…”
তারপর—
সব থেমে যায়।
পাশে এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে ছিল।
সে সামিরের দিকে তাকাল।
“তুমি কি… নাজওয়ার ছেলে?”
সামির তাকাল।
“হ…”
বৃদ্ধ ধীরে মাথা নেড়ে বলল—
“তোমার মা… শেষ পর্যন্ত তোমার জন্য অপেক্ষা করছিল…”
সামিরের বুক কেঁপে উঠল।
“তিনি প্রতিদিন বলত—
‘আমার ছেলে আসবে…’”
শেষ অপেক্ষার গল্প
বৃদ্ধ বলল—
“শেষ দিন… তিনি বসে ছিলেন দরজার সামনে…”
“আকাশে তখন শব্দ…”
“তবুও তিনি উঠেন নাই…”
“তিনি শুধু বলছিলেন—
‘আমি যামু না… আমার ছেলে আসবো…’”
সামির দাঁড়িয়ে।
তার চোখে পানি নেই।
কারণ এই কান্না—
শব্দের বাইরে।
“আর তোমার বোন…”—বৃদ্ধ থামল।
“সে শেষ দিন তোমার চিঠিটা ধরে ছিল…”
“সে বলত—
‘ভাইয়া আসবে…’”
এই কথাটা শুনে সামির হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
তার হাত কাঁপছে।
সে মাটিতে হাত রাখল।
যেন এই মাটির ভেতরেই তার সবকিছু আছে।
একটা শহরের গল্প
সে চারদিকে তাকায়।
এই শহর—
যেখানে মানুষ ছিল।
হাসি ছিল।
স্কুল ছিল।
হাসপাতাল ছিল।
এখন—
ধুলা।
ভাঙা দেয়াল।
নীরবতা।
কিছু শিশুর খেলনা পড়ে আছে।
কিন্তু শিশু নেই।
আকাশ আর মাটি
সে আকাশের দিকে তাকাল।
এই আকাশ—
যেখান থেকে একসময় আলো আসত।
এখন—
ভয়ের স্মৃতি।
সে মাটির দিকে তাকাল।
এই মাটি—
যেখানে তার মা, তার বোন…
সব আছে।
সে তার ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বের করল।
কারাগারে সে লিখেছিল।
সে আবার লিখতে শুরু করল।
“আমি সামির…”
তার হাত কাঁপছে।
“আমি ফিরে এসেছি…”
সে থামল।
তার চোখ ভিজে উঠল।
“কিন্তু কেউ নেই…”
সে লিখতে থাকে—
“আমরা ছিলাম…”
“আমরা বেঁচে ছিলাম…”
“আমাদের গল্প ছিল…”
তার হাত থেমে যায়।
তারপর সে লিখে—
“যদি কেউ পড়ে…
আমাদের ভুলে যেও না…”
তখন সন্ধ্যা।
সূর্য ডুবছে।
লাল আকাশ।
সামির দাঁড়িয়ে—
ধ্বংসস্তূপের মাঝে।
তার হাতে কাগজ।
সে চোখ বন্ধ করল।
তার মনে হলো—
কেউ তাকে ডাকছে।
“সামির…”
সে চোখ খুলল।
কেউ নেই।
কিন্তু সে হাসল।
কারণ সে জানে—
এই ডাক কখনো হারায় না।
এই পৃথিবীতে কিছু গল্প আছে—
যা শেষ হয় না।
মানুষ মরে—
কিন্তু গল্প বেঁচে থাকে।
কিছু মা আছে—
যারা অপেক্ষা করতে করতে ইতিহাস হয়ে যায়।
আর কিছু নাম আছে—
যেগুলো মুছে ফেলা যায় না। সেই নাম সৃতি হয়ে থাকে।
শেষ।