পর্ব:-৫
“লুচ্চা”—এই উপাধিটা এখন যেন কুদ্দুছের শরীরের ছায়া হয়ে গেছে।
সে যেদিকেই যায়, মনে হয় শব্দটা তার পিছু নেয়। কেউ সরাসরি ডাকে না, কেউ সামনে বলে না—তবুও কুদ্দুছ অনুভব করে, এই একটি শব্দ তার নামের সঙ্গে কোথাও জড়িয়ে গেছে।
তবুও সে কাউকে কিছু বলে না।
কেউ জানে না—তার ভেতরে কী চলছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, সে আগের মতোই আছে—চুপচাপ, নিরীহ, নিজের মতো করে থাকা একজন ছেলে।
কিন্তু তার ভেতরে এখন এক অদৃশ্য অস্থিরতা কাজ করে।
যাকে সে ভালোবাসে—মেহরিন—তার মুখে এমন কথা!
এই কথাটা সে যতবার মনে করে, তার বুকটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে। মনে হয়, কেউ তার ভেতরে জমে থাকা বিশ্বাসগুলো ভেঙে দিয়েছে।
কারণ, সে ভেবেছিল—মেহরিন হয়তো তাকে বুঝতে পারে না, কিন্তু অন্তত ভুল বুঝবে না।
কিন্তু সে ভুল ছিল।
এই উপলব্ধিটাই তাকে অস্থির করে তোলে।
একদিন দুপুরে কুদ্দুছ একা বসে ছিল কলেজের মাঠের এক কোণে। চারপাশে ছেলেমেয়েরা আড্ডা দিচ্ছে, কেউ হাসছে, কেউ গল্প করছে।
এই কোলাহলের মাঝেও কুদ্দুছ যেন একা।
তার দৃষ্টি দূরে—যেখানে মেহরিন দাঁড়িয়ে তার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে।
মেহরিনের মুখে হাসি।
সেই হাসিটা দেখে কুদ্দুছের বুকের ভেতরটা নরম হয়ে যায়।
“এই মেয়েটাই আমাকে লুচ্চা বলেছে…”—ভাবতেই তার কষ্ট হয়।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—এই কষ্টের মাঝেও তার ভালোবাসা কমে না।
বরং… আরও বেড়ে যায়।
কুদ্দুছ নিজেই একদিন বুঝতে পারে—
সে আগের চেয়ে এখন মেহরিনকে আরও বেশি ভালোবাসে।
এই উপলব্ধিটা তাকে কিছুটা অবাক করে।
“কেন?”—সে নিজেকেই প্রশ্ন করে।
যে মানুষটা তাকে অপমান করেছে, তার প্রতি ভালোবাসা কেন কমে না?
বরং কেন তা আরও গভীর হয়?
কুদ্দুছ উত্তর খুঁজে পায় না।
তবে তার মনে হয়—সম্ভবত সত্যিকারের ভালোবাসা এমনই হয়।
যেখানে সম্মানহানি, অপমান—কিছুই ভালোবাসাকে থামাতে পারে না।
তবুও, সে তার এই অনুভূতি কাউকে জানায় না।
তার বন্ধু রাশেদও এখন আর বেশি প্রশ্ন করে না। সে বুঝে গেছে—কুদ্দুছের ভেতরে কিছু একটা চলছে, কিন্তু সেটা জোর করে জানার চেষ্টা করা ঠিক না।
কুদ্দুছ এই নীরবতাকেই বেছে নিয়েছে।
কারণ, তার কাছে ভালোবাসা প্রকাশ করার মতো কিছু না—এটা অনুভব করার বিষয়।
একদিন ক্লাস শেষে করিডোর দিয়ে হাঁটছিল কুদ্দুছ।
হঠাৎ সামনে মেহরিনের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে যায়।
দুজনেই থেমে যায় এক মুহূর্তের জন্য।
মেহরিন একটু অবাক হয়ে তাকায়, তারপর চোখ সরিয়ে নেয়।
কুদ্দুছের মনে হয়—এই মুহূর্তে সে অনেক কিছু বলতে পারে।
সে বলতে পারে—
“আমি খারাপ না…”
“আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসি…”
কিন্তু সে কিছুই বলে না।
শুধু একপাশ দিয়ে সরে যায়।
এই নীরবতাই এখন তার ভাষা।
কুদ্দুছ চায় না—মেহরিন বুঝুক তার ভেতরের অস্থিরতা।
সে চায় না—মেহরিন কখনও তার জন্য অপরাধবোধে ভুগুক।
কারণ, তার ভালোবাসা কোনো বোঝা না।
এই কারণেই সে নিজের কষ্টটাকে আরও গভীরে লুকিয়ে রাখে।
রাতে সে ডায়েরি খুলে বসে।
আজ তার লেখা অনেকটা স্পষ্ট, কিন্তু তাতে এক ধরনের চাপা যন্ত্রণা আছে।
“আমি এখন বুঝতে পারছি—
আমি তোমাকে আগের চেয়ে বেশি ভালোবাসি।
তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছো,
তবুও আমার ভালোবাসা কমেনি।”
সে একটু থামে।
তারপর আবার লিখে—
“হয়তো এটাই সত্যিকারের ভালোবাসা—
যেখানে আঘাত পেলে তা আরও গভীর হয়।”
তার চোখে জল আসে।
কিন্তু সে হাত দিয়ে মুছে ফেলে।
কুদ্দুছ এখন নিজেকে বদলাতে শুরু করেছে।
সে আগের মতো সহজ নেই। তার ভেতরে একটা গভীরতা এসেছে—যেটা কষ্ট থেকে জন্ম নেয়।
সে এখন মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করে—কে কী ভাবছে।
কিন্তু মেহরিনের চোখের ভাষা সে এখনও বুঝতে পারে না।
একদিন সন্ধ্যায় সে ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।
আকাশে লাল আভা। সূর্য ডুবে যাচ্ছে।
এই সময়টা তার খুব প্রিয়।
সে মনে মনে বলে—
“তুমি আমাকে যাই ভাবো, আমি তোমাকে তেমনই ভালোবাসব।”
এই কথাটার মধ্যে তার সমস্ত দৃঢ়তা।
তবুও, তার অস্থিরতা পুরোপুরি কমে না।
কখনও কখনও সে হঠাৎ করে অকারণে অস্থির হয়ে ওঠে। বুক ধড়ফড় করে, মনে হয় কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছে।
তখন সে চোখ বন্ধ করে শুধু মেহরিনের কথা ভাবে।
অদ্ভুতভাবে—এই ভাবনাটাই তাকে শান্ত করে।
কুদ্দুছ বুঝতে পারে—
তার ভালোবাসা এখন আর স্বাভাবিক নেই।
এটা এখন এক ধরনের অভ্যাস, এক ধরনের অস্তিত্ব।
মেহরিনকে ছাড়া সে নিজেকে কল্পনাই করতে পারে না।
একদিন সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবার নিজের দিকে তাকায়।
“তুই কি সত্যিই লুচ্চা?”—প্রশ্নটা আবার আসে কুদ্দুছের মনে।
কিন্তু এবার সে একটু দৃঢ়ভাবে বলে—
“না… আমি শুধু ভালোবাসি।”
এই উত্তরটা তাকে কিছুটা শক্তি দেয়।
রাতের শেষে সে ডায়েরিতে শেষবারের মতো লিখে—
“আমি কাউকে কিছু বলব না।
আমার ভালোবাসা আমার নিজের।
এটা কেউ বুঝুক বা না বুঝুক—
আমি এটাকে বাঁচিয়ে রাখব।”
এইভাবে কুদ্দুছ তার অস্থিরতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখছে।
সে কষ্ট পায়, তবুও ভাঙে না।
সে ভালোবাসে, তবুও প্রকাশ করে না।
তার ভেতরে এখন এক অদ্ভুত শান্ত অস্থিরতা—যেটা তাকে প্রতিদিন নতুন করে গড়ে তুলছে।
আর তার ভালোবাসা?
সেটা এখন আগের চেয়ে আরও গভীর, আরও নীরব, আরও সত্য।
(চলবে…)