ষষ্ঠ পর্ব
শহরের আকাশটা সেদিন অস্বাভাবিক রকম নীরব ছিল। বৃষ্টি হয়নি, তবু বাতাসে একটা ভারী গন্ধ—যেন কোথাও কিছু পুড়ছে, কিন্তু আগুন দেখা যাচ্ছে না। কুদ্দুস হাঁটছিল সেই পরিচিত রাস্তায়, যেখানে প্রতিদিনই তার দেখা হয় একই মুখগুলোর সঙ্গে—কেউ হাসে, কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়, কেউ ভান করে না দেখার।
কিন্তু আজ তার ভেতরে কোনো তাড়াহুড়া নেই। কোনো প্রতিবাদ নেই। কোনো উত্তেজনাও নেই।
শুধু এক ধরনের গভীর স্থিরতা।
এই স্থিরতা জন্ম নেয় তখনই, যখন মানুষ প্রতিশোধের ইচ্ছা হারিয়ে ফেলে না—বরং সেটাকে ছেড়ে দেয়।
কুদ্দুস প্রতিশোধ নেয় না।
এই শহর তাকে অনেক আগেই শিখিয়েছে—প্রতিশোধ নিলে মানুষ ছোট হয়ে যায়, কিন্তু চুপ থাকলে সময় বড় হয়ে যায়।
সে এখন শুধু দেখে।
দেখে আর বোঝে।
যাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সে একসময় কথা বলেছিল, যাদের লজ্জা ঢাকতে সে অপমান সহ্য করেছিল—তাদের জীবনে এখন অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটছে।
ক্লাবের সেই মানুষগুলো, যারা একসময় সিদ্ধান্ত নিত কে যোগ্য আর কে অযোগ্য, তাদের জীবনে এখন ভাঙন শুরু হয়েছে নিঃশব্দে।
একজন প্রভাবশালী সদস্যের ছেলে এখন শহরের নেশার অন্ধকারে ডুবে গেছে। পরিবার তাকে লুকিয়ে রাখে, যেন নাম প্রকাশ পেলে সম্মান শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সম্মান তো অনেক আগেই শেষ হয়েছিল, শুধু স্বীকার করা বাকি ছিল।
আরেকজন, যিনি নিয়মিত অন্যের যোগ্যতা কেটে নিজের লোক বসাতেন, তার ঘর এখন প্রতিদিন ঝগড়ায় ভরা। সন্তানরা কথা শোনে না, স্ত্রী চুপ করে থাকে, আর তিনি রাতের বেলা একা বসে থাকেন টেলিভিশনের সামনে—যেখানে শব্দ আছে, কিন্তু অর্থ নেই।
একজন সাবেক নেতা, যিনি জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন অন্যকে ঠকিয়ে, এখন মানসিক অস্থিরতায় ভুগছেন। ডাক্তাররা বলেন—চাপ। কিন্তু কুদ্দুস জানে, এটা শুধু চাপ না; এটা নিজের ভেতরের সঞ্চিত অন্যায়ের শব্দ।
এগুলো কোনো নাটকীয় পতন না। কোনো সিনেমার মতো উচ্চ শব্দে ভাঙা না।
এগুলো নিঃশব্দ ভাঙন।
যেমন দেয়াল ভেঙে পড়ে না, বরং ধীরে ধীরে ভেতর থেকে খালি হয়ে যায়।
কুদ্দুস এসব দেখে। কিন্তু কাউকে কিছু বলে না।
কারণ সে বুঝে গেছে—সব কথা বলার জন্য হয় না। কিছু কথা সময়ের জন্য রেখে দিতে হয়।
একদিন বিকেলে সে মসজিদের পাশে বসেছিল। সেখানে মাওলানা হাফেজ করিম বসে ছিলেন। তিনি কুদ্দুসকে দেখেই মৃদু হাসলেন।
—কেমন আছো?
কুদ্দুস ধীরে বলল,
—আছি হুজুর।
মাওলানা তার চোখের দিকে তাকালেন।
—কিছু ভাবতেছো?
কুদ্দুস একটু চুপ থেকে বলল,
—মানুষ কিভাবে নিজের ভুল বুঝতে না বুঝতেই ধ্বংস হয়ে যায়, এটা ভাবতেছিলাম।
মাওলানা মাথা নেড়ে বললেন,
—মানুষ শুধু চোখ দিয়ে দেখে না কুদ্দুস। মানুষ দেখে নিজের স্বার্থ দিয়ে।
কুদ্দুস নিচু স্বরে বলল,
—আমি আগে ভাবতাম, অন্যায় করলে মানুষ একদিন ধরা পড়বেই।
মাওলানা মৃদু হাসলেন।
—ধরা পড়া আর বিচার হওয়া এক জিনিস না।
এই কথাটা কুদ্দুসকে থামিয়ে দিল।
মাওলানা ধীরে বললেন,
—এই দুনিয়ায় অনেক বিচার হয়, কিন্তু সব বিচার দেখা যায় না।
কুদ্দুস তাকিয়ে রইল।
মাওলানা একটু থেমে বললেন,
—কেউ কষ্ট দেয়, কেউ হক মারে, কেউ মানুষকে ছোট করে—তারা সবসময় বাইরে শান্ত থাকে না। ভিতরে ভিতরে হিসাব জমতে থাকে।
বাতাসে আজানের শব্দ ভেসে এলো।
মাওলানা আরও নরম গলায় বললেন,
—কুদ্দুস, তুমি প্রতিশোধ নিও না। কারণ প্রতিশোধ মানুষকে তারই মতো করে ফেলে।
কুদ্দুস চুপ করে শুনছিল।
তার মনে বহুদিনের ক্লান্তি। বহু অপমানের স্মৃতি। বহু রাতের নিঃশব্দ ক্ষোভ।
সে ধীরে বলল,
—তাহলে কি সব অন্যায়ই এভাবে ছেড়ে দিতে হবে?
মাওলানা শান্ত স্বরে বললেন,
—ছাড়ে দেওয়া আর ছেড়ে দেওয়া এক জিনিস না।
তিনি একটু থামলেন।
—তুমি ছেড়ে দাও আল্লাহর হাতে। কারণ মানুষের আদালত সীমিত, কিন্তু আল্লাহর আদালত সীমাহীন।
কুদ্দুসের চোখে হালকা ভেজা ভাব এল।
মাওলানা ধীরে বললেন,
—সৃষ্টি কর্তার আদালতে ফাইল হারায় না।
এই কথাটা বাতাসের মতো চারদিকে ছড়িয়ে গেল।
কুদ্দুস মাথা নিচু করল।
তার মনে হলো, এতদিন সে যেটা খুঁজছিল, সেটা কোনো প্রতিশোধ না—একটা নিশ্চয়তা। যে অন্যায় কখনও হারিয়ে যায় না।
শুধু সময় লাগে প্রকাশ হতে।
সে মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলো। আকাশে সন্ধ্যার আলো।
শহর তখনও আগের মতোই ব্যস্ত। গাড়ি চলছে, মানুষ হাঁটছে, দোকান খোলা, হাসি চলছে।
কিন্তু কুদ্দুসের চোখে এখন অন্য দৃশ্য।
সে দেখতে পাচ্ছে—এই ব্যস্ততার নিচে কত ভাঙা গল্প লুকিয়ে আছে।
প্রেসক্লাবের সেই মানুষগুলো, যারা একসময় নিজেদের শক্তিশালী ভাবত, এখন নিজের ঘরেই অশান্ত। মানুষকে ঠকানোর বিচার শুরু হইছে।
একজনের ছেলে তাকে সম্মান করে না।
আরেকজনের পরিবার তার কথা শোনে না।
আরেকজন নিজের আয়নার সামনে দাঁড়াতেও ভয় পায়।
কুদ্দুস বুঝতে পারে—এটা কোনো কাকতাল না।
এটা সময়ের নীরব হিসাব। সদস্য পদ বিক্রির ফল। কাউকে ব্যাথা দেয়া বড় অন্যায় বলল।।
সে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে।
একটা রিকশা পাশ দিয়ে যায়। রিকশাওয়ালা তাকে দেখে মাথা নেড়ে হাসে।
—কুদ্দুস ভাই, কেমন আছেন?
কুদ্দুস হালকা হাসে।
—আছি ভাই।
রিকশা চলে যায়।
কুদ্দুস তাকিয়ে থাকে।
তার মনে পড়ে, একসময় সে ভাবত—এই শহর বদলাবে কি না।
এখন সে আর সেটা ভাবে না।
সে শুধু বোঝে—শহর বদলায় না, শুধু মুখ বদলায়।
রাত বাড়ে।
দূরে প্রেসক্লাবের আলো দেখা যায়।
সেই ভবনটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে—আগের মতোই গম্ভীর, আগের মতোই অহংকারী।
কিন্তু কুদ্দুস জানে, ভিতরে কিছু না কিছু ভাঙছে।
মানুষ হয়তো তা দেখতে পায় না, কিন্তু সময় ঠিকই দেখে।
সে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে।
তার মনে আর রাগ নেই।
কারণ রাগ এখন আর দরকার নেই।
ন্যায়বিচার মানুষের হাত থেকে ধীরে ধীরে সময়ের হাতে চলে গেছে।
আর সময় কখনও তাড়াহুড়া করে না।
সে শুধু নিশ্চিত করে।
কুদ্দুস আকাশের দিকে তাকায়।
তার ভেতরে একটাই শান্ত উপলব্ধি—
এই দুনিয়ায় কিছু হিসাব দেরিতে আসে, কিন্তু মুছে যায় না।
আর সেই হিসাবই সবচেয়ে ভয়ংকর।
কারণ—
“সৃষ্টি কর্তার আদালতে ফাইল হারায় না।”
চলবে..........