পর্ব–৩
রাত আড়াইটা আবারও ফিরে এসেছে।
এই সময়টা যেন ঐশির জীবনে এক অদৃশ্য মোড়। যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ে, তখনই তার জীবনের সিদ্ধান্তগুলো জেগে ওঠে।
ঐশি আর হ্যারি—দু’জনেই এখন একে অপরকে পছন্দ করে ফেলেছে। দূরত্বের মাঝেও এক অদ্ভুত টান তৈরি হয়েছে। ভিডিও কলে দীর্ঘ আলাপ, হাসি, অভিমান—সব মিলিয়ে সম্পর্কটা যেন ভার্চুয়াল জগত পেরিয়ে বাস্তবের দিকে পা বাড়াচ্ছে।
কিন্তু এই সম্পর্কের ভেতরে আছে এক অস্বস্তিকর স্মৃতি।
ঐশির মনে পড়ে যায় সেই রাত, যখন সে নিজের সীমারেখা অতিক্রম করেছিল। স্ক্রিনের ওপাশে থাকা মানুষটির জন্য নিজেকে উন্মুক্ত করেছিল। তখন সে ভেবেছিল—এটাই হয়তো ভালোবাসার দাবি।
আজ সেই মানুষটাই বলছে, সে বাংলাদেশে আসবে।
এবং শুধু আসবেই না—ঐশিকে বিয়ে করবে।
হ্যারির কণ্ঠে এবার অন্যরকম দৃঢ়তা।
“আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। বাংলাদেশে এসে বিয়ে করবো, তারপর তোমাকে জার্মানিতে নিয়ে যাব।”
কথাটা শুনে ঐশির বুকের ভেতর কেমন যেন শূন্যতা তৈরি হলো। আনন্দ? ভয়? বিস্ময়?
সে বুঝতে পারল না।
“বিয়ে?” সে ধীরে জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ। তুমি তো আমার। আমি তোমাকে হারাতে চাই না।”
এই ‘আমার’ শব্দটা আবারও তাকে কাঁপিয়ে দিল। ভালোবাসার দাবি আর মালিকানার দাবি—দুটোর মাঝে খুব সূক্ষ্ম পার্থক্য। ঐশি সেই পার্থক্যটা বোঝার চেষ্টা করছিল।
তবুও সে আর না করল না।
যেহেতু দু’জন দু’জনকে পছন্দ করে ফেলেছে, যেহেতু এতদূর এগিয়ে এসেছে—এখন পিছিয়ে যাওয়ার জায়গা কোথায়?
হয়তো সে মনে মনে ভাবল—যে মানুষ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে, সে খারাপ হতে পারে না। হয়তো সেই রাতের ভুলটাও একদিন বৈধ সম্পর্কের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাবে।
এক সন্ধ্যায় ঐশি ফোন হাতে নিয়ে বসে রইল। হ্যারি বারবার বলছে,
“তোমার ঠিকানা দাও। পুরো ঠিকানা। আমি টিকিট কনফার্ম করবো।”
ঐশির আঙুল কাঁপছিল।
ঠিকানা মানে শুধু বাড়ির নাম্বার নয়—নিজের নিরাপদ জগতের দরজা খুলে দেওয়া।
সে জানে, ঠিকানা দিলে হ্যারি সত্যিই আসতে পারে।
সে জানে, এই সিদ্ধান্তের পর আর কিছু আগের মতো থাকবে না।
কিন্তু তবুও…
সে লিখে পাঠিয়ে দিল—বাংলাদেশের সম্পূর্ণ ঠিকানা।
মেসেজ পাঠানোর পর তার মনে হলো, যেন নিজের হৃদয়ের মানচিত্রটাই তুলে দিল এক বিদেশি মানুষের হাতে।
হ্যারি আনন্দে ভরে উঠল।
“আমি আসছি, ঐশি। খুব তাড়াতাড়ি। তুমি আমার স্ত্রী হবে।”
স্ত্রী—শব্দটা ঐশির কানে অদ্ভুত লাগল।
সে আয়নায় নিজের মুখ দেখল। তার কি সত্যিই বিয়ের জন্য প্রস্তুত হওয়া উচিত? পরিবার? সমাজ? ধর্ম? এত কিছু কি এত সহজে মিলে যাবে?
সে সাহস করে জিজ্ঞেস করল,
“তোমার পরিবার জানে?”
হ্যারি একটু থামল।
“জানবে। আমি সব সামলে নেব।”
এই ‘সব সামলে নেব’ কথাটা ঐশিকে পুরোপুরি আশ্বস্ত করতে পারল না।
কারণ সে জানে—জীবন সিনেমা নয়।
তারপরও তার মনে একফোঁটা আলো জ্বলে উঠল। হয়তো সত্যিই নতুন জীবন শুরু হতে পারে। হয়তো জার্মানির কোনো শহরে সে নতুন করে নিজেকে গড়ে তুলবে। নতুন আকাশ, নতুন রাস্তা, নতুন স্বপ্ন।
কিন্তু সেই স্বপ্নের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়।
যদি হ্যারি বদলে যায়?
যদি তার ভালোবাসা কেবল আকর্ষণ হয়ে থাকে?
যদি সেই রাত আড়াইটার স্মৃতি একদিন তাকে তাড়া করে?
ঐশি রাতের অন্ধকারে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। দূরে স্ট্রিটলাইটের আলো মাটিতে পড়ে আছে। সে ভাবে—তার জীবনটাও কি এমনই? আলো আছে, কিন্তু তার চারপাশে ঘন ছায়া।
হ্যারি নিয়মিত প্ল্যান করছে।
কোন দিনে আসবে, কোথায় থাকবে, কীভাবে বিয়ের আয়োজন করবে। তার কথায় উত্তেজনা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
ঐশির ভেতরে কিন্তু একধরনের শঙ্কা কাজ করে।
সে কি সত্যিই ভালোবাসার জন্য আসছে?
নাকি সেই আকর্ষণের জন্য, যা এক রাতের ভিডিও কলে জন্মেছিল?
বিয়ের প্রস্তাব তাকে আনন্দ দেয়, কিন্তু অস্বস্তিও দেয়।
কারণ বিয়ে শুধু দু’জন মানুষের মিলন নয়—দু’টি জগতের সংযোগ।
এক রাতে আবার ঘড়ির কাঁটা আড়াইটায় এসে থামল।
ঐশি বিছানায় শুয়ে আছে। ফোনে হ্যারির মেসেজ—
“ড্রিম অফ আওয়ার ফিউচার।”
“ইউ উইল বি মাই ওয়াইফ।”
ঐশি চোখ বন্ধ করল। ভবিষ্যতের ছবি কল্পনা করল।
কিন্তু সেই ছবির মাঝে বারবার ভেসে উঠল তার নিজের প্রশ্ন—
সে কি নিজেকে ভালোবেসেছে কখনো?
নাকি শুধু ভালোবাসা পাওয়ার তাড়নায় নিজেকে সঁপে দিয়েছে?
তার মনে হলো, এই বিয়ের প্রস্তাব হয়তো মুক্তি, হয়তো শিকল।
সবকিছু নির্ভর করছে সেই দিনের ওপর, যেদিন হ্যারি সত্যিই তার দরজায় কড়া নাড়বে।
ঠিকানা পাঠিয়ে সে যেন নিজের জীবনের নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে।
কিন্তু এই অধ্যায় কি সুখের গল্প লিখবে, নাকি আরেকটি দীর্ঘ রাতের?
রাত আড়াইটা আবারও সাক্ষী হয়ে রইল—একটি মেয়ের আশা, ভয় আর অজানা ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাহসের।
হ্যারি আসছে।
বিয়ে করবে বলছে।
জার্মানিতে নিয়ে যাবে বলছে।
কিন্তু ঐশির হৃদয়ের গভীরে একটি প্রশ্ন এখনও অনুত্তরিত—
এই যাত্রা কি ভালোবাসার, নাকি এক অদৃশ্য পরীক্ষার?
পরবর্তী রাতই হয়তো তার উত্তর দেবে।
চলবে...............................