ঢাকা, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ১১:৪০:৫১ PM

সরকার বদলালেও বাড়ছে কারা মৃত্যু

ষ্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
25-01-2026 09:28:27 PM
সরকার বদলালেও বাড়ছে কারা মৃত্যু

ক্ষমতার পালাবদল হলেও বাংলাদেশে কারা হেফাজতে মৃত্যুর ভয়াবহ চিত্রে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেভাবে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বন্দি কারাগারে মারা গেছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও সেই ধারাবাহিকতা থামেনি। বরং কারা অধিদপ্তর ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়েছে। কারা হেফাজতে মৃত্যু দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি স্থায়ী অভিযোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা অবস্থায় কোনো নাগরিকের মৃত্যু মানেই রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। কিন্তু সরকার পরিবর্তন হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও কারা প্রশাসনের কাঠামোগত দায়মুক্তির সংস্কৃতিতে কার্যকর পরিবর্তন আসেনি।

চার বছরে ৬৩২ জনের মৃত্যু

কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী,

  • ২০২২ সালে কারা হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ১৮৫ জনের,

  • ২০২৩ সালে মৃত্যু ১৫৫ জন,

  • ২০২৪ সালে মৃত্যু ১২০ জন,

  • ২০২৫ সালে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭২ জনে

এ হিসাবে চার বছরে কারা হেফাজতে মোট মৃত্যু হয়েছে ৬৩২ জনের। একই সময়ে প্রতি বছর গড়ে ১৩ থেকে ১৫ হাজার বন্দি চিকিৎসা নিয়েছেন।

২০২৫ সালে মৃত ১৭২ জনের মধ্যে ছয়জনের মৃত্যু ‘আত্মহত্যা’ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে তিনজন, ২০২৩ সালে দুজন, ২০২২ সালে চারজন এবং ২০২১ সালে চারজন বন্দির মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, আত্মহত্যার প্রতিটি ঘটনাই স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত ছাড়া বিশ্বাসযোগ্য নয়।

হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মৃত্যু

কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, অধিকাংশ বন্দিই বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছিলেন। অসুস্থ হওয়ার পর কেউ হাসপাতালে নেওয়ার পথে, কেউ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তবে কারা কর্মকর্তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, দেশের অধিকাংশ কারাগারে রাতের বেলায় চিকিৎসক পাওয়া যায় না। অনেক কারাগারে অ্যাম্বুল্যান্স না থাকায় গুরুতর অসুস্থ বন্দিকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না।

বর্তমানে দেশে ৭৫টি কারাগারের জন্য মাত্র ২৭টি অ্যাম্বুল্যান্স রয়েছে। বাকি কারাগারগুলোতে ভাড়া করা গাড়িতে বন্দিদের হাসপাতালে নিতে হয়। একটি সূত্র জানায়, ২০১৯ সাল থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না থাকায় নতুন অ্যাম্বুল্যান্স কেনা বন্ধ রয়েছে

চরম চিকিৎসক সংকট

কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, কারাগারের জন্য অনুমোদিত চিকিৎসকের সংখ্যা ১৪১ জন হলেও বাস্তবে বর্তমানে মাত্র দুজন চিকিৎসক অফিসিয়ালি পোস্টেড আছেন। বাকি কারাগারগুলোতে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে খণ্ডকালীন চিকিৎসকরা দায়িত্ব পালন করেন। মানিকগঞ্জ কারাগার ও রাজশাহী ট্রেনিং সেন্টার ছাড়া আর কোনো কারাগারে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটই কারা হেফাজতে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।

রাজনৈতিক বন্দিদের মৃত্যু ও অভিযোগ

সাম্প্রতিক সময়ে কারা হেফাজতে মারা যাওয়া অনেকেই ছিলেন রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তি।
গত বছরের ডিসেম্বরে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান যুবদল নেতা উজ্জ্বল বিশ্বাস। বিএনপির অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনের পর তার মৃত্যু হয়েছে।

এ ছাড়া টাঙ্গাইল কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতা সুলতান মিয়া, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সাবেক কমিশনার মুরাদ হোসেন, বগুড়ায় আওয়ামী লীগ নেতা শাহাদত আলম ঝুনু এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে সংগীতশিল্পী প্রলয় চাকীর মৃত্যুর ঘটনাও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে।

নিহতদের পরিবারগুলোর অভিযোগ—কারাগারে চিকিৎসায় অবহেলা ও সময়মতো হাসপাতালে না নেওয়ার কারণেই এসব মৃত্যু হয়েছে। তবে কারা কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিয়ম মেনে চিকিৎসা ও তদন্ত হয়েছে।

আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই

১৮৬৪ সালের জেলকোড অনুযায়ী, কোনো বন্দি অসুস্থ হলে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা দেওয়ার এবং প্রয়োজনে হাসপাতালে পাঠানোর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বাস্তবে এসব বিধান মানা হয় না।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আল মামুন রাসেল বলেন, “কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার দুই থেকে তিন গুণ বেশি বন্দি রাখা হচ্ছে। এতে সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার বন্দিরা পাচ্ছেন না। মৃত্যুর ঘটনাগুলোরও সঠিক তদন্ত হয় না।”

বিচারহীনতার সংস্কৃতি

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “কারা হেফাজতে মৃত্যুর সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় এসব ঘটনা চলছেই। বদলি বা বিভাগীয় ব্যবস্থা কোনো সমাধান নয়।”

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, “সরকার বদলালেও বিরোধী মতের মানুষদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার ধারা বদলায়নি। সরকারের প্রকৃত সদিচ্ছা ছাড়া এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।”

রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন নাগরিক একবার রাষ্ট্রের হেফাজতে গেলে তার জীবন রক্ষার পূর্ণ দায় রাষ্ট্রের। বন্দি অপরাধী হোক বা রাজনৈতিক কর্মী—তার মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।

গণঅভ্যুত্থান ক্ষমতার কাঠামো বদলালেও রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙতে পারেনি—কারা হেফাজতে মৃত্যুর এই পরিসংখ্যানই তার প্রমাণ। স্বাধীন তদন্ত, স্বচ্ছতা এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত না হলে সরকার পরিবর্তনের পরও এই মৃত্যুর মিছিল থামবে না—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।