পর্ব–৪
সময় অনেক কিছু বদলে দেয়—মানুষের চেহারা, অভ্যাস, জীবনযাপন, এমনকি সম্পর্কও। কিন্তু কিছু কিছু অনুভূতি আছে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না। বরং বছর যত বাড়ে, সেগুলো তত গভীর হয়ে হৃদয়ের ভেতর শেকড় গেঁথে বসে।
লুসিকে হারানোর পর কুদ্দুছের জীবনটা যেন ঠিক তেমনই হয়ে গিয়েছিল।
কয়েক বছর খোঁজাখুঁজির পর একদিন থানায় ডেকে পাঠানো হলো তাকে।
ঘরের ভেতর কয়েকজন অফিসার বসে ছিল। তাদের মুখে একটা অদ্ভুত গম্ভীরতা।
কুদ্দুছ চুপচাপ তাদের সামনে বসে রইল।
একজন অফিসার ধীরে ধীরে বলল,
“আমরা অনেক দিন ধরে তদন্ত করেছি।”
আরেকজন যোগ করল,
“কিন্তু কোনো নতুন তথ্য পাওয়া যায়নি।”
কুদ্দুছ কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।
অফিসারটা একটু থেমে আবার বলল,
“আপনার স্ত্রী সম্ভবত মারা গেছেন।”
কথাটা শুনে কুদ্দুছের বুকটা কেঁপে উঠল।
অফিসারটা আরও বলল,
“আপনার আর কোনো মিরাকলের জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়। জীবনটা নতুন করে শুরু করার চেষ্টা করুন।”
ঘরের ভেতর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এলো।
কুদ্দুছ ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল।
তার চোখে তখন অদ্ভুত এক শূন্যতা।
সে জানে—পুলিশের কথাটা হয়তো বাস্তব।
কিন্তু তার মন সেই বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারছিল না।
কারণ তার মনে সবসময় একটা প্রশ্ন ঘুরে বেড়াত—
যদি লুসি সত্যিই মারা যায়, তাহলে তার লাশ কোথায়?
কেউ তো তাকে দেখেনি।
কেউ তো জানে না সে কোথায় গেল।
এভাবেই বছর কেটে গেল।
একটা বছর, দুইটা বছর… তারপর দশ বছর।
সময়ের স্রোত কারও জন্য থেমে থাকে না।
শহর বদলে গেল।
পুরোনো দোকানগুলো ভেঙে নতুন দালান উঠল।
রাস্তা বড় হলো।
মানুষের জীবন এগিয়ে গেল।
শুধু কুদ্দুছের জীবনটা যেন সেই রাতেই আটকে রইল।
লুসি হারিয়ে যাওয়ার বিশ বছর হয়ে গেছে।
এই বিশ বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে।
কুদ্দুছের চুলে পাক ধরেছে।
মুখে বয়সের ছাপ পড়েছে।
কিন্তু তার চোখে এখনও সেই অপেক্ষার ছায়া রয়ে গেছে।
কুদ্দুছ এখনও একা।
তার ছোট্ট বাড়িটা এখনও আগের মতোই আছে।
বাড়ির প্রতিটা কোণে লুসির স্মৃতি লুকিয়ে আছে।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ালে এখনও মনে হয়—লুসি হয়তো এখানেই বসে চুল আঁচড়াচ্ছে।
রান্নাঘরে ঢুকলে মনে হয়—লুসি হয়তো এখনই হাসতে হাসতে বলবে,
“আজ তোমার জন্য নতুন একটা রান্না করেছি।”
কিন্তু এসব শুধু স্মৃতি।
বাস্তবে ঘরটা নিঃশব্দ।
নিঃসঙ্গ।
অনেকে কুদ্দুছকে দ্বিতীয় বিয়ে করার কথা বলেছিল।
বন্ধুরা বলেছিল—
“এভাবে একা থাকা ঠিক না।”
আত্মীয়রা বলেছিল—
“জীবন থেমে থাকে না।”
কিন্তু কুদ্দুছ কখনও রাজি হয়নি।
সে শুধু একটা কথাই বলত—
“লুসি এখনও নিখোঁজ। আমি তাকে মৃত বলতে পারি না।”
মানুষজন তখন চুপ হয়ে যেত।
কারণ তারা বুঝতে পারত—এই মানুষটার হৃদয়ে এখনও একটাই নাম আছে।
লুসি।
এই বিশ বছরে কুদ্দুছ আর কোনো সম্পর্ক করেনি।
কাউকে জীবনে জায়গা দেয়নি।
কারণ তার মনে হয়—যদি কোনোদিন লুসি ফিরে আসে?
যদি দরজায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ বলে—
“আমি ফিরে এসেছি।”
তখন সে কীভাবে অন্য কাউকে জীবনে নিয়ে থাকবে?
এই ভাবনাটাই তাকে সবসময় আটকে রেখেছে।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কুদ্দুছ বারান্দায় বসে চা খায়।
সেই সময় তার চোখ প্রায়ই রাস্তার দিকে চলে যায়।
মনে হয়—হয়তো আজ লুসি হঠাৎ করে এসে দাঁড়াবে।
মাঝে মাঝে সে নিজের এই ভাবনায় হাসে।
আবার কখনও চোখ ভিজে ওঠে।
একদিন পুরোনো আলমারি গুছাতে গিয়ে কুদ্দুছ সেই লকেটটার কথা মনে করল।
যেটা সে লুসিকে বিয়ের রাতে দিয়েছিল।
ছোট্ট সোনালি লকেট।
ভেতরে তাদের দুজনের একটা ছবি।
লুসি বলেছিল—
“আমি এটা কোনোদিন খুলব না।”
কুদ্দুছ তখন মজা করে বলেছিল—
“যদি কখনও হারিয়ে ফেলো?”
লুসি হেসে উত্তর দিয়েছিল—
“তাহলে বুঝবে আমি আর বেঁচে নেই।”
সেই কথাটা মনে পড়তেই কুদ্দুছের বুকের ভেতর একটা কাঁপন উঠল।
কারণ মুদি দোকানে যে মহিলাকে সে দেখেছিল—
তার গলায় ঠিক সেই লকেটটাই ছিল।
আজ এত বছর পরও কুদ্দুছের জীবনে লুসি ছাড়া আর কেউ নেই।
এমন একটাও দিন যায়নি যেদিন সে লুসির কথা ভাবেনি।
সকালে, দুপুরে, রাতে—
কোনো না কোনো মুহূর্তে তার মনে পড়ে যায় সেই মুখটা।
সেই হাসিটা।
সেই কণ্ঠস্বর।
রাত গভীর হলে মাঝে মাঝে কুদ্দুছ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায়।
তার মনে হয়—পৃথিবীর কোথাও হয়তো লুসিও একই আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
হয়তো সে-ও ভাবছে—
“কুদ্দুছ এখন কোথায়?”
এই কল্পনাটুকুই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
মুদি দোকানের সেই দিনটা আবার তার জীবনে নতুন একটা প্রশ্ন এনে দিয়েছে।
সেই মহিলাটা কে?
কেন তার গলায় সেই লকেট?
আর কেন তার কণ্ঠস্বর এত পরিচিত লাগল?
কুদ্দুছের মনে হচ্ছে—বিশ বছর আগের সেই রহস্য হয়তো আবার ফিরে এসেছে।
হয়তো এই রহস্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে লুসির গল্প।
কুদ্দুছ ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
মনে মনে বলল—
“যেখানেই থাকো লুসি…
আমি এখনও তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।”
বাতাসে হালকা শীত নেমে এসেছে।
রাতের নীরবতার মধ্যে যেন কোথাও একটা অজানা গল্পের শুরু হচ্ছে।
কুদ্দুছ জানে না সামনে কী আছে।
কিন্তু তার মনে হচ্ছে—
এই অপেক্ষার শেষ হয়তো খুব দূরে নয়।
চলবে…