পর্ব–৬
রান্না শেষ, এখন খাওয়ার সময়।
মিতু তখনও অফিসের ফাইলের দিকে তাকিয়ে বসে আছে, কিন্তু মনটা যেন কোথাও আটকে আছে। সকাল থেকে সবকিছুই যেন অদ্ভুত লাগছে তার কাছে। ঠিক সেই সময় তাজুলের ফোনে একটি মেসেজ এলো।
আফরিন লিখেছে—
“কল দিতে হবে না, আপনি চলে আসেন দুলাভাই।”
মেসেজটা পড়ে তাজুল একটু অবাক হয়েছিল। কারণ আফরিন সাধারণত এমন করে ডাকে না। ফোনেই সব কথা বলে নেয়। তবু বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে সে দ্রুত বাসার দিকে রওনা দিল।
বাসায় পৌঁছাতে তার দশ মিনিটের বেশি লাগেনি। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই তার বুকের ভেতর অকারণ এক অস্বস্তি জমতে লাগলো। যেন কিছু একটা ঠিক নেই।
ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে সে আরও অবাক হয়ে গেল।
দরজা খোলা।
তাজুল আস্তে করে দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো। ঘরের ভেতরে অদ্ভুত এক নীরবতা। যেন এই ঘরে কেউ নেই, অথচ একটু আগেও এখানে মানুষ ছিল।
সে ডাকলো—
“আফরিন!”
কোনো সাড়া নেই।
আরও একটু জোরে ডাকলো—
“আফরিন, কোথায় তুমি?”
তবুও কোনো শব্দ নেই।
দিনের বেলাতেও কেন জানি তাজুলের গা শিউরে উঠলো। এমন তো হওয়ার কথা না। আফরিন যদি বাসায় থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো সাড়া দিতো।
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে ধকধক করতে শুরু করলো।
সে ধীরে ধীরে ড্রয়িংরুম পার হয়ে করিডোরের দিকে এগিয়ে গেল। করিডোরটা আজ যেন আরও লম্বা, আরও অন্ধকার মনে হচ্ছে। প্রতিটা পদক্ষেপে তার মনে হচ্ছিল—ভিতরে কিছু একটা ভয়ঙ্কর অপেক্ষা করছে।
তারপর সে আমাদের রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
দরজাটা অর্ধেক খোলা।
তাজুল কাঁপা হাতে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো।
এরপর যা দেখলো—
তার পুরো পৃথিবী যেন এক মুহূর্তে থেমে গেল।
…
এই পর্যন্ত বলেই তাজুল থেমে গেল।
ওর চোখ মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ঠোঁট কাঁপছে।
আমি ধৈর্য ধরে রাখতে না পেরে বললাম—
“আমাদের রুমের মধ্যে কি হয়েছে?”
তাজুল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর খুব নিচু গলায় বললো—
“আমি বলতে পারবো না… তুমি আমার সঙ্গে চলো এখনই। বাসায় গিয়ে দেখবে।”
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম—
“ন্যাকামি করো না তো। বলো কি হয়েছে।”
তাজুল মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বললো—
“আমাদের বিছানার উপর আফরিনের লাশ পড়ে আছে… ওর ওড়না দিয়েই ওকে ফাঁস দেওয়া হয়েছে। চোখগুলো এখনো খোলা।”
কথাগুলো বলতেই তাজুলের শরীর কাঁপতে লাগলো।
মিতুর শরীরও তখন কাঁপা শুরু করেছে।
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
অস্পষ্ট গলায় আমি বললাম—
“আফরিনের কি হয়েছে… বললা না?”
তাজুল এবার মাথা দু’হাত দিয়ে চেপে ধরলো।
“আমি জানি না… আমি সত্যি জানি না। আমি যখন ঢুকলাম, তখন ওকে এভাবেই দেখেছি।”
ঘরের ভেতর হঠাৎ যেন বাতাস ভারী হয়ে উঠলো।
মিতু সোফায় বসে পড়লো। তার চোখে আতঙ্ক।
আফরিন… সেই হাসিখুশি মেয়েটা…
মাত্র গতকালও যে হাসতে হাসতে বলছিল—
“আপু, তুমি রান্না করলে আমি সব সময় বেশি খাই।”
সেই মেয়েটা আজ…
না, এটা ভাবতেও পারছিল না কেউ।
তাজুল তখনও কাঁপছে।
“আমি কাছে যেতে পারিনি। মনে হচ্ছিল ও যেন আমাকে দেখছে… ওই খোলা চোখে।”
মিতু কাঁপা গলায় বললো—
“তুমি পুলিশে খবর দিয়েছো?”
তাজুল মাথা নাড়লো।
“না… আমি প্রথমে তোমাকে জানাতে চেয়েছি।”
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর কেউ ভারী পাথর চাপা দিয়েছে।
“চলো… এখনই বাসায় যাই।”
আমরা তিনজন দ্রুত বাসার দিকে রওনা দিলাম।
রাস্তার প্রতিটা মুহূর্ত যেন অসহ্য লাগছিল। সময় যেন এগোতেই চাইছিল না।
বাসার সামনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ইতিমধ্যে কয়েকজন প্রতিবেশী জড়ো হয়ে গেছে।
কারণ দরজা খোলা ছিল, কেউ হয়তো খেয়াল করেছে।
আমরা ভিতরে ঢুকতেই সবাই কৌতূহলী চোখে তাকালো।
আমি সোজা আমাদের রুমের দিকে হাঁটলাম।
মিতু পেছন পেছন আসছে।
দরজার সামনে এসে আমার পা যেন থেমে গেল।
ভিতরে তাকানোর সাহস হচ্ছিল না।
তবুও ধীরে ধীরে চোখ তুললাম।
বিছানার উপর…
আফরিন শুয়ে আছে।
তার ওড়নাটা ফ্যানের সঙ্গে বাঁধা ছিল, পরে কেউ হয়তো নামিয়েছে।
চুলগুলো এলোমেলো।
আর সেই চোখ…
সত্যিই খোলা।
মনে হচ্ছিল সে যেন অবাক হয়ে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছে।
মিতু হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো—
“আফরিন!”
তারপর মেঝেতে বসে পড়লো।
আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
এই দৃশ্য বিশ্বাস করা যায় না।
কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটা বেঁচে ছিল…
সে কীভাবে এমন করে চলে যেতে পারে?
ঠিক তখনই আমার চোখ বিছানার পাশে পড়ে থাকা একটা কাগজের দিকে গেল।
একটা ছোট চিরকুট।
আমি ধীরে ধীরে সেটা তুলে নিলাম।
কাগজে কাঁপা হাতে লেখা—
“আমি কাউকে দোষ দিচ্ছি না।
আমার জীবনটা এমনই ছিল।
কিন্তু একটা থাপ্পর…
শুধু একটা থাপ্পর আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে—
আমি এই পৃথিবীতে আর কাউকে দরকারি নই।”
আমার হাত কাঁপতে লাগলো।
মিতু কাঁদতে কাঁদতে বললো—
“কি লেখা আছে?”
আমি উত্তর দিতে পারলাম না।
কারণ তখন আমার মনে হচ্ছিল—
একটা থাপ্পর কখনও কখনও শুধু একটা আঘাত না।
কখনও কখনও সেটা একটা মানুষের পুরো জীবনটাকেই ভেঙে দেয়।
আর আফরিন…
হয়তো সেই ভাঙা জীবনের ভার আর সহ্য করতে পারেনি।
ঘরের ভেতর তখন শুধু কান্নার শব্দ।
আর বিছানার উপর নিথর হয়ে পড়ে আছে আফরিন—
খোলা চোখে যেন এখনো পৃথিবীকে প্রশ্ন করছে…
কেন?
চলবে…