ঢাকা, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৪:৩৭:৫৩ PM

উপন্যাস: লুসি নিখোঁজ

মান্নান মারুফ
09-03-2026 01:34:24 PM
উপন্যাস: লুসি নিখোঁজ

পর্ব–৩

দীর্ঘশ্বাস ফেলল কুদ্দুছ।

রাত গভীর হয়ে এসেছে। ঘরের ভেতর মৃদু আলো জ্বলছে, আর বাইরে নীরবতার চাদর বিছিয়ে আছে। বারান্দায় বসে কুদ্দুছ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার বুকের ভেতর যেন এক অদৃশ্য ব্যথা জমে আছে—যে ব্যথার কোনো ভাষা নেই, কোনো শেষ নেই।

অন্তরে শুধু একটাই নাম ঘুরে ফিরে আসে—লুসি।

কুদ্দুছ ধীরে ধীরে নিজের সঙ্গে কথা বলল,
“আশা করি তুমি একদিন আমাকে ক্ষমা করবে, লুসি।”

কথাটা বলার পর তার চোখ ভিজে উঠল।

সে জানে না ঠিক কী ভুল করেছে। কিন্তু কোথাও যেন মনে হয়—এই নিখোঁজ হওয়ার পেছনে হয়তো তারই কোনো অদৃশ্য দোষ আছে।


সেই রাতের ঘটনাটা এখনও স্পষ্ট মনে আছে তার।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে যখন কুদ্দুছ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল, তখন চারপাশে অদ্ভুত এক নীরবতা ছিল।

পুলিশের গাড়ির আলো ঝলমল করছিল। কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে দূর থেকে তাকিয়ে ছিল।

কিন্তু সেই দৃশ্যের সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়টা ছিল—লুসির অনুপস্থিতি।

একজন পুলিশ অফিসার বিস্মিত হয়ে বলেছিল,
“এটা অসম্ভব।”

আরেকজন বলেছিল,
“মানুষটা গেল কোথায়?”

যখন তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল, গাড়িটা সেখানে ছিল ঠিকই। রাস্তার পাশে উল্টে পড়ে থাকা সেই গাড়ি যেন এক নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

কিন্তু সেখানে কোনো লাশ ছিল না।

কোনো চালক ছিল না।

আশেপাশে আর কেউ ছিল না।

যেন গাড়িটা নিজেই এসে থেমে গেছে।

লুসি যেন বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিল।


কুদ্দুছ তখনও বিশ্বাস করতে পারছিল না।

সে গাড়ির ভেতরে ঢুকে পাগলের মতো খুঁজতে লাগল।

হয়তো কোথাও লুসি আটকে আছে।

হয়তো আহত হয়ে পড়ে আছে।

কিন্তু না।

সিটের ওপর শুধু একটা কাগজ পড়ে ছিল।

কুদ্দুছ হাত কাঁপতে কাঁপতে সেই কাগজটা তুলে নিয়েছিল।

সেখানে লেখা ছিল—

“আমাকে খুঁজো না।”

মাত্র তিনটা শব্দ।

কিন্তু সেই তিনটা শব্দ যেন কুদ্দুছের পুরো পৃথিবী ভেঙে দিয়েছিল।

সে সেই নোটটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল।

মনে হচ্ছিল—এই কাগজটার মধ্যেই লুসির শেষ স্পর্শ লুকিয়ে আছে।


পরের কয়েকটা দিন ছিল দুঃস্বপ্নের মতো।

পুলিশ তদন্ত শুরু করল।

তারা আশেপাশের বন, রাস্তা, নদী—সব জায়গায় খোঁজ করল।

কিন্তু কোথাও লুসির কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না।

একজন অফিসার একদিন কুদ্দুছকে বলেছিল,
“আমরা যতটা সম্ভব খুঁজছি।”

কুদ্দুছ তখন শুধু একটা প্রশ্ন করেছিল—

“সে কি বেঁচে আছে?”

পুলিশ অফিসার কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।

তারপর ধীরে বলেছিল,
“আমরা এখনো কিছু বলতে পারছি না।”


কুদ্দুছ আশা ছাড়েনি।

সে নিজেই খোঁজ শুরু করল।

শহরের প্রতিটা মোড়ে মোড়ে সে পোস্টার লাগিয়েছিল।

পোস্টারে লুসির একটা ছবি ছিল।

নীচে বড় অক্ষরে লেখা—

“নিখোঁজ”

আর পাশে একটি নম্বর।

প্রতিদিন সে শহরের নতুন নতুন জায়গায় গিয়ে পোস্টার লাগাত।

রোদ, বৃষ্টি—কিছুই তাকে থামাতে পারত না।

কারণ তার মনে একটা বিশ্বাস ছিল—

কেউ না কেউ নিশ্চয়ই লুসিকে দেখেছে।


কয়েকদিন পর প্রথম ফোনটা এল।

একজন বলল—
“আমি মনে হয় আপনার স্ত্রীকে দেখেছি।”

কুদ্দুছ এক মুহূর্তও দেরি করেনি।

সে সঙ্গে সঙ্গে সেই ঠিকানায় ছুটে গেল।

কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখল—সেটা অন্য কেউ।

মুখটা একটু মিল ছিল, কিন্তু সে লুসি নয়।

কুদ্দুছ চুপচাপ ফিরে এসেছিল।


তারপর আবার ফোন এল।

আবার আশা জাগল।

আবার ছুটে গেল।

আবার ভুল।

এভাবেই চলতে লাগল।

প্রতিবার ফোন বেজে উঠলে কুদ্দুছের বুক ধক করে উঠত।

মনে হতো—এইবার হয়তো সত্যি খবর।

কিন্তু প্রতিবারই হতাশা।


একদিন রাতে কুদ্দুছ বাড়ি ফিরছিল।

রাস্তার বাতির নিচে হঠাৎ তার চোখে পড়ল—তার লাগানো একটা পোস্টার।

বৃষ্টিতে ভিজে কাগজটা আধাআধি ছিঁড়ে গেছে।

লুসির ছবিটা ঝাপসা হয়ে গেছে।

কুদ্দুছ ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

হাত দিয়ে সেই ছবিটাকে ছুঁয়ে দিল।

তার বুকের ভেতর কেমন একটা ব্যথা উঠল।

সে ফিসফিস করে বলল—

“তুমি কোথায় লুসি?”


পুলিশ কয়েক দিন খুঁজল।

তারপর কয়েক সপ্তাহ।

শেষ পর্যন্ত তদন্ত ধীরে ধীরে থেমে গেল।

একদিন থানায় গিয়ে কুদ্দুছ শুনল—কেসটা আপাতত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

কারণ কোনো প্রমাণ নেই।

কোনো সূত্র নেই।

কোনো দেহ নেই।

কুদ্দুছ যেন ভিতর থেকে ভেঙে পড়ল।

সে থানার বারান্দায় বসে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।

তার মনে হচ্ছিল—পুরো পৃথিবী যেন তাকে একা ফেলে চলে গেছে।


কিন্তু সে হার মানেনি।

বছরের পর বছর সে খুঁজে গেছে।

মাঝে মাঝে সেই নোটটা বের করে পড়ে।

“আমাকে খুঁজো না।”

এই কথাটার মানে কী?

লুসি কি নিজেই চলে গেছে?

নাকি কেউ তাকে যেতে বাধ্য করেছে?

এই প্রশ্নগুলো তাকে প্রতিদিন তাড়া করে বেড়ায়।


আজও কুদ্দুছ সেই নোটটা নিজের কাছে রেখে দিয়েছে।

কাগজটা এখন পুরোনো হয়ে গেছে।

কিন্তু অক্ষরগুলো এখনও স্পষ্ট।

সে মাঝে মাঝে নোটটা হাতে নিয়ে বসে থাকে।

মনে হয়—লুসি যেন খুব কাছে কোথাও আছে।

কিন্তু ধরা দেয় না।


আজ মুদি দোকানের সেই মহিলাকে দেখার পর আবার পুরোনো স্মৃতিগুলো জেগে উঠেছে।

সেই লকেট।

সেই চেনা অনুভূতি।

কুদ্দুছের মনে হচ্ছে—এই রহস্যের শেষ এখনও হয়নি।

সে জানে না সামনে কী আছে।

কিন্তু তার মনে একটা জেদ জন্মেছে।

এইবার সে সত্যিটা জানবেই।

কারণ বিশ বছর ধরে যে প্রশ্নটা তাকে পুড়িয়ে মারছে—
তার উত্তর হয়তো খুব কাছেই লুকিয়ে আছে।

কুদ্দুছ ধীরে ধীরে সেই পুরোনো নোটটা হাতে নিল।

আবার পড়ল—

“আমাকে খুঁজো না।”

তারপর সে মৃদু হেসে বলল—

“না লুসি…
আমি তোমাকে খুঁজবই।”

রাতের বাতাসে তার কণ্ঠস্বর মিলিয়ে গেল।

কিন্তু সেই শব্দের ভেতর ছিল এক অদম্য প্রতিজ্ঞা।

চলবে…