ঢাকা, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০২:২২:২৯ PM

উপন্যাস:একটি প্রশ্ন

মান্নান মারুফ
07-03-2026 12:01:05 PM
উপন্যাস:একটি প্রশ্ন

শেষ পর্ব

খালি কফির কাপটা হাতে নিয়ে সাজু ভাই বসে আছে। কফির শেষ চুমুকটা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে, তবু কাপটা যেন তার হাতেই রয়ে গেছে।

কফি খেতে খেতে মিতুর কাছ থেকে এতক্ষণ ধরে সবকিছু শুনছিলেন তিনি।

ঘরের বাতাস ভারী। চারদিকে শোকের ছাপ স্পষ্ট।

গতকালই এই বাসায় ঘটেছে সেই ভয়ংকর ঘটনা।

প্রথমে সাজু গিয়েছিলেন থানায়। সেখানে গিয়ে ওসি সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারপর গিয়েছিলেন তাজুলের অফিসে। সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সেখান থেকে গিয়েছেন মিতুর অফিসে।

সব জায়গায় ঘুরে অবশেষে তিনি এসেছেন এই বাসায়—যেখানে সবকিছু শুরু হয়েছিল, আর হয়তো এখানেই লুকিয়ে আছে সেই রহস্যের শেষ সূত্র।

মিতু সোফায় বসে আছে। চোখ দুটো ফুলে গেছে কান্নায়।

সাজু ভাই ধীরে ধীরে কাপটা টেবিলের উপর রেখে বললেন—

“সবকিছুই তো বললেন, মিসেস মিতু। কিন্তু একটা জায়গায় এসে গল্পটা থেমে গেল।”

মিতু মাথা তুললো।

সাজু আবার বললেন—

“চার বছরের সংসারে আপনারা নাকি খুব কম ঝগড়া করেছেন। কিন্তু এই চার বছরের মধ্যে প্রথম বড় ঝগড়াটা কেন হয়েছিল সেটা তো বললেন না।”

মিতু একটু থেমে বললো—

“সেরকম বড় কোনো বিষয় না।”

সাজু ভাই হালকা করে মাথা নেড়ে বললেন—

“ছোট বিষয় অনেক সময় বড় পরিণতি ডেকে আনে।”

ঘরের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এলো।

কিছুক্ষণ পরে সাজু আবার বললেন—

“আরেকটা প্রশ্ন আছে।”

মিতু চুপ করে তাকিয়ে রইলো।

সাজু বললেন—

“আপনি বলেছেন অফিস ক্যান্টিনে দুপুরে লাঞ্চ করেছেন। কিন্তু আমি একটু খবর নিয়ে এলাম… সেখানে জানা গেল লাঞ্চের সময় আপনি অফিস থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন।”

মিতুর চোখে এক মুহূর্তের জন্য অস্বস্তির ছায়া দেখা গেল।

সাজু আবার বললেন—

“আর প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে আপনি আবার অফিসে ফিরে এসেছেন।”

মিতু এবার সম্পূর্ণ চুপ।

তার মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝা যাচ্ছে—কিছু একটা সে লুকাচ্ছে।

সাজু ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

তারপর বললেন—

“কোথায় ছিলেন সেটা বলার আগে একটু ভালো করে ভাবুন। আমি বরং ততক্ষণে রান্নাঘরে গিয়ে ঘুরে আসি।”

তিনি একটু হেসে যোগ করলেন—

“আপনার বোন গতকাল কি কি রান্না করেছে সেটা তো দেখা দরকার। রান্না করতে পেরেছিল নাকি তার আগেই খু!ন হয়েছে—সেটাও জানা দরকার।”

মিতু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।

তার চোখে যেন আতঙ্কের ক্ষীণ ছায়া।

সাজু তার সেই চিরচেনা গম্ভীরতার মধ্যে ঠোঁটের আগায় হালকা হাসি নিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।

পুলিশ গতকালই সবকিছু দেখে গেছে।

তবু সাজু খুব মনোযোগ দিয়ে চারপাশ দেখতে লাগলেন।

চুলার পাশে হাঁড়ি রাখা।

একটা পাত্রে রান্না করা ডাল।

আরেকটা পাত্রে তরকারি।

দেখে মনে হচ্ছে সত্যিই রান্না হয়েছিল।

তিনি ধীরে ধীরে চারদিকে তাকালেন।

তারপর এগিয়ে গিয়ে ফ্রিজটা খুললেন।

ফ্রিজের ভেতরে উঁকি দিলেন।

হঠাৎ তার চোখ স্থির হয়ে গেল।

তিনি কিছু একটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছেন।

মিনিটখানেক… দুই মিনিট…

প্রায় পাঁচ মিনিট তিনি একইভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন।

তার চোখে তখন সেই পরিচিত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি—যে দৃষ্টি কোনো রহস্যের গিঁট খুলে ফেলতে পারে।

এরপর ধীরে ধীরে ফ্রিজ বন্ধ করে তিনি আবার ড্রয়িংরুমে ফিরে এলেন।

মিতু তখনও একইভাবে বসে আছে।

তার চোখে অদ্ভুত এক অস্থিরতা।

সাজু সামনে এসে দাঁড়ালেন।

তারপর শান্ত গলায় বললেন—

“আপনার স্বামীকে না নিয়ে পুলিশ আপনাকে ধরে নিয়ে গেলেই বেশি ভালো হতো।”

মিতুর মুখ হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

সে কাঁপা গলায় বললো—

“কি বলছেন আপনি?”

সাজু ধীরে ধীরে সোফায় বসে বললেন—

“আপনার গল্পটা খুব সুন্দর ছিল। কিন্তু একটা জায়গায় এসে সেটা ভেঙে গেল।”

মিতু চুপ।

সাজু বললেন—

“আপনার বোন গতকাল রান্না করেছে—এটা ঠিক। কিন্তু সে রান্না শেষ করেই মারা গেছে—এটা ঠিক না।”

তিনি একটু থেমে আবার বললেন—

“ফ্রিজের ভেতরে যে খাবারগুলো রাখা আছে, সেগুলো অনেক আগে রান্না করা। গতকাল না।”

মিতুর চোখে আতঙ্ক জমতে লাগলো।

সাজু এবার গম্ভীর গলায় বললেন—

“আরও একটা বিষয় আছে। আপনি দুপুরে অফিস থেকে বের হয়েছিলেন। সেই সময়েই আপনি বাসায় এসেছিলেন।”

মিতুর ঠোঁট কাঁপছে।

সাজু ধীরে ধীরে বললেন—

“কারণ আপনি জানতেন আপনার বোন তখন বাসায় একা।”

ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা।

তারপর সাজু নিচু গলায় বললেন—

“সেদিন যে ঝগড়াটা হয়েছিল… সেটা শুধু একটা থাপ্পর না।”

মিতুর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো।

সাজু বললেন—

“আপনি আপনার বোনকে সন্দেহ করতেন। মনে করতেন সে আপনার স্বামীর খুব কাছাকাছি চলে যাচ্ছে।”

মিতু হঠাৎ ভেঙে পড়লো।

সে কাঁদতে কাঁদতে বললো—

“আমি ওদের একসঙ্গে দেখেছিলাম…”

সাজু শান্ত গলায় বললেন—

“হয়তো সেটা ভুল বোঝাবুঝি ছিল। কিন্তু সেই রাগেই আপনি দুপুরে বাসায় এসে আপনার বোনের সঙ্গে ঝগড়া করেন।”

মিতু মাথা নিচু করে কাঁদছে।

সাজু বললেন—

“ঝগড়ার এক পর্যায়ে আপনি তাকে থাপ্পর মারেন। আর সেই রাগ, সেই অপমান… আর আপনার হাতের চাপেই তার মৃত্যু হয়।”

মিতু হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।

“আমি ইচ্ছা করে করিনি…”

সাজু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“কিন্তু সত্যিটা পাল্টায় না।”

ঘরের বাতাস তখন আরও ভারী হয়ে উঠেছে।

একটা থাপ্পর…

শুধু একটা থাপ্পর…

সেই এক মুহূর্তের রাগই ধ্বংস করে দিল তিনটা জীবন।

আফরিনের জীবন।

তাজুলের জীবন।

আর মিতুর নিজের জীবন।

জানালার বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে।

অন্ধকার ধীরে ধীরে শহরটাকে ঢেকে ফেলছে।

আর সেই অন্ধকারের মাঝেই যেন ভেসে আসছে এক নীরব শিক্ষা—

রাগের এক মুহূর্ত কখনও কখনও এমন এক ট্র্যাজেডি তৈরি করে…

যার মূল্য দিতে হয় জীবন দিয়ে। শেষ।।