পর্ব–৮
বাড়িওয়ালা তখন তাজুলের কাছে কী কী হয়েছে সব শুনতে শুনতে পুলিশের কাছে কল করলেন। তার কণ্ঠে উদ্বেগ ছিল, কিন্তু সেই উদ্বেগের ভেতরেও একটা দায়িত্ববোধ স্পষ্ট ছিল। এমন ঘটনা কোনোভাবেই চাপা রাখা যায় না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্ল্যাটের নিচে পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনা গেল।
সেই শব্দ যেন পুরো ভবনটাকে কাঁপিয়ে দিল।
এরই মধ্যে ধানমন্ডিতে মা-বাবার কাছেও খবর দেওয়া হলো। ফোনের ওপাশে প্রথমে কেউ বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
মা বারবার বলছিলেন—
“না, এটা হতে পারে না… আফরিন এমন মেয়ে না।”
কিন্তু বাস্তব কখনো কখনো মানুষের বিশ্বাসের চেয়েও নির্মম হয়।
আমি তখনও মেঝেতে বসে আছি। সামনে আমার ছোট বোনের নিথর দেহ।
আমার চোখ দিয়ে পানি ঝরছে, কিন্তু মনে হচ্ছে আমি যেন ঠিকভাবে কাঁদতেও পারছি না।
মনে হচ্ছিল—এটা একটা দুঃস্বপ্ন।
হয়তো একটু পরেই আফরিন উঠে বসবে, হাসতে হাসতে বলবে—
“আপু, ভয় পেয়ে গেছো?”
কিন্তু সে আর উঠলো না।
পুলিশ ঘরের মধ্যে ঢুকে চারপাশ খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো। কেউ ছবি তুলছে, কেউ নোট নিচ্ছে।
এইসব দৃশ্যের মাঝেই আমার মাথা হঠাৎ করে ঘুরে উঠলো।
বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে গেল।
তারপর সবকিছু ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে গেল।
আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই অজ্ঞান হয়ে গেলাম।
…
যখন জ্ঞান ফিরলো, তখন মনে হলো আমি যেন অন্য এক পৃথিবীতে আছি।
চোখ খুলতেই দেখলাম আমার চারদিকে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিবেশীরা, পুলিশ, বাড়িওয়ালা—সবাই কেমন উদ্বিগ্ন মুখে তাকিয়ে আছে।
আমি ধীরে ধীরে উঠে বসার চেষ্টা করলাম।
ঠিক তখনই আমার চোখ গিয়ে থামলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের উপর।
তাজুল।
কিন্তু তাকে দেখে আমার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠলো।
তার দুই হাতে হ্যান্ডকাফ পরানো।
এই দৃশ্যটা যেন আমার মস্তিষ্ক মানতে পারছিল না।
তাজুল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে ক্লান্তি আর ভয় মিশে আছে।
ঠিক তখন একজন পুলিশ কর্মকর্তা আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
তিনি শান্ত গলায় বললেন—
“আপনি কি এখন ঠিক আছেন?”
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম, কিন্তু কোনো উত্তর দিলাম না।
আমার গলা যেন শুকিয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পর তিনি আবার বললেন—
“আমরা ঘটনার প্রাথমিক কিছু কথাবার্তা শুনেছি। বাসার দারোয়ানের বর্ণনা আর ফ্ল্যাটের পরিস্থিতি দেখে আপাতত আপনার স্বামীকে আমরা সন্দেহ করছি।”
আমার বুকের ভেতরটা যেন ধপ করে উঠলো।
তিনি আবার বললেন—
“আপনার বোনের লাশ পোস্টমর্টেম করতে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট এলে আমরা আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবো আসলে কি হয়েছে।”
আমি তখনও নিশ্চুপ।
ওসি সাহেব একটু থেমে আবার প্রশ্ন করলেন—
“আপনার স্বামীর সঙ্গে কখন দেখা হয়েছে? আর সে আপনার কাছে কি কি বলেছে সেগুলো একটু বলবেন?”
তারপর তিনি আরও বললেন—
“আর আপনার সন্দেহের তালিকায় আর কেউ আছে নাকি? থাকলে বলেন।”
আমি ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাজুলের দিকে তাকালাম।
সে অসহায় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
সেই চোখে আমি এমন এক ভয়ের ছাপ দেখলাম—যেটা আগে কখনো দেখিনি।
মনে হলো সে যেন নীরবে বলছে—
“বিশ্বাস করো… আমি কিছু করিনি।”
আমার বুকের ভেতর তখন ঝড় বইছে।
একদিকে আমার বোনের নিথর দেহ।
অন্যদিকে আমার স্বামী—যার সঙ্গে এতদিনের সংসার।
আমি কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে রইলাম।
তারপর ধীরে ধীরে পুলিশের কাছে সব বলতে শুরু করলাম।
কিভাবে তাজুল অফিসে এসে আমাকে বলেছিল…
কিভাবে আমরা একসঙ্গে সিএনজি নিয়ে বাসায় এসেছিলাম…
কিভাবে আমি প্রথম আফরিনকে সেই অবস্থায় দেখেছিলাম…
সবকিছু একে একে বললাম।
আমার কথা শেষ হলে ঘরের মধ্যে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো।
ওসি সাহেব মাথা নেড়ে বললেন—
“ঠিক আছে। আপাতত আমাদের তদন্ত চালাতে হবে।”
তারপর তিনি তাজুলের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন।
দুইজন কনস্টেবল তাজুলকে ধরে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেল।
তাজুল একবার আমার দিকে তাকালো।
সেই দৃষ্টিতে অসহায়ত্ব, ভয় আর এক অদ্ভুত নিরব অনুরোধ ছিল।
কিন্তু আমি কিছু বলতে পারলাম না।
শুধু তাকিয়ে রইলাম।
পুলিশ তাকে নিয়ে দরজার বাইরে চলে গেল।
ঘরের মধ্যে তখন আবার নীরবতা।
ঠিক সেই সময় খবর এলো—আফরিনের বাবা থানায় গিয়ে মামলা করে এসেছেন।
খবরটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা আবার কেঁপে উঠলো।
সবকিছু যেন মুহূর্তের মধ্যে জট পাকিয়ে গেল।
একটা মৃত্যু।
একটা অভিযোগ।
একটা সংসার।
আর অসংখ্য সন্দেহ।
আমি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
আকাশে হালকা অন্ধকার।
আমার মনে হচ্ছিল—এই অন্ধকার যেন শুধু আকাশেই না, আমার জীবনেও নেমে এসেছে।
একটা থাপ্পর…
শুধু একটা থাপ্পর…
কিভাবে যেন পুরো জীবনটাকে উল্টে দিল।
কিন্তু সত্যটা কি?
তাজুল কি সত্যিই খুনি?
নাকি এই ঘটনার পেছনে লুকিয়ে আছে আরও ভয়ংকর কোনো সত্য—
যেটা এখনো কেউ জানে না?
সেই প্রশ্নের উত্তর তখনও অন্ধকারেই রয়ে গেল।
আর আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু একটাই কথা ভাবছিলাম—
কখনো কখনো একটা ছোট ঘটনা থেকেই শুরু হয় এমন এক ট্র্যাজেডি…
যার শেষ কোথায়, কেউ জানে না।
চলবে…