ঢাকা, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ১১:৫১:২০ PM

দেশজুড়ে গ্যাস সংকট: এলপিজির দামে আগুন

ষ্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
12-01-2026 09:10:09 PM
দেশজুড়ে গ্যাস সংকট: এলপিজির দামে আগুন

দেশজুড়ে চরম আকার ধারণ করেছে গ্যাস সংকট। বাসাবাড়ির লাইনের গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার পাশাপাশি এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সিলিন্ডার এখন অনেক এলাকায় পাওয়া যাচ্ছে না। যেখানে পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ মূল্য গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। সংকট সাময়িক দাবি করে সরকার বলছে, বাজারে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি আমদানিকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দায় চাপাচ্ছে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, জাহাজ সংকট ও এলসি (ঋণপত্র) জটিলতার ওপর। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা অতিরিক্ত দাম হাঁকাচ্ছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। এলপিজি সংকটে বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষ বর্তমানে রান্নার জন্য দেশের একটি বড় অংশই এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে যেসব এলাকায় বাসাবাড়ির গ্যাস সংযোগ নেই বা চাপ অত্যন্ত কম, সেখানে এলপিজিই একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেই এলপিজিই এখন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের জন্য সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩০৬ টাকার পরিবর্তে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। তাতেও মিলছে না সিলিন্ডার। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, চা দোকানসহ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরম সংকটে পড়েছেন। চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়ি এলাকার চা দোকানি আলাউদ্দিন বলেন, “গত সপ্তাহে ১২ কেজির সিলিন্ডার নিতে হয়েছে ১৮শ টাকায়। রোববার একই সিলিন্ডার কিনেছি ২২শ টাকায়। বেশি দাম দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না।” খুচরা বিক্রেতাদের অনেকেই আবার খালি সিলিন্ডার নিয়ে দোকানে বসে থাকছেন। তাদের ভাষ্য, ডিলাররা সরবরাহ দিচ্ছেন না বা অতিরিক্ত দাম না দিলে সিলিন্ডার ছাড়ছেন না। সংকটের পেছনে কী কারণ? এলপিজি সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক ও এলপিজি ব্যবসায়ী মাহফুজুল হক বলেন, “এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশে এলপিজির সংকট চলছে। আমাদের বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্য। সম্প্রতি আমেরিকার ট্রেজারি বিভাগের দেওয়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে যেসব জাহাজ মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলপিজি বহন করতো, তার কয়েকটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে।” তিনি জানান, নিষেধাজ্ঞার কারণে জাহাজ সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে এলসি খোলা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে এলপিজি দেশে আনতে পারেননি আমদানিকারকরা। পাশাপাশি বড় বড় এলপিজি কোম্পানি ব্যাংকিং জটিলতার কারণে এলসি খুলতে পারেনি। বিশেষ করে বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, ইউনিগ্যাসের মতো বড় আমদানিকারকরা এলসি জটিলতায় এলপিজি আমদানি করতে পারেনি বলে জানান তিনি। এতে বাজারে সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আমদানিকারকদের বক্তব্য এলপিজি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারাও সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। সান গ্যাস লিমিটেডের এরিয়া হেড একরামুল হক জুয়েল বলেন, “শীতপ্রধান দেশগুলোতে শীত মৌসুমে এলপিজির চাহিদা বেড়ে যায়। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি তেলের উৎপাদন কিছুটা কমে যায়, যার প্রভাব পড়ে এলপিজি উৎপাদনেও। ফলে প্রতি বছর শীতকালে কিছুটা সংকট তৈরি হয়। তবে এবছর পরিস্থিতি ভিন্ন।” লোয়াবের (LOAB) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের এলপিজি আমদানির অনুমতি থাকলেও গত ডিসেম্বর মাসে মাত্র ১০টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করেছে। ব্যাংকিং জটিলতায় বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, ইউনিগ্যাস, ওরিয়ন, জি-গ্যাস ও নাভানা এলসি খুলতে পারেনি। চাহিদার তুলনায় কম আমদানি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ২০২৫ সালে এলপিজি আমদানি কমেছে। ২০২৪ সালে যেখানে মোট আমদানি হয়েছিল ১৬ লাখ ১০ হাজার ৪৭০ টন, সেখানে ২০২৫ সালে আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭০৫ টন। একইভাবে ডিসেম্বর মাসে আমদানির পরিমাণেও বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৬৫ টন, যা আগের বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় ১৮ হাজার ৮৬৬ টন কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আমদানি ঘাটতিই সরবরাহ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। দামের লাগামহীন বৃদ্ধি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জানুয়ারি মাসের জন্য ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। আগের মাসে এই দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা। অর্থাৎ এক মাসেই দাম বেড়েছে ৫৩ টাকা। কিন্তু বাস্তব বাজারে এই দরের কোনো প্রতিফলন নেই। অভিযোগ রয়েছে, সংকটের সুযোগ নিয়ে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা অতিরিক্ত মুনাফা করছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুহূর্তেই কেউ কেউ কোটিপতি হয়ে গেছেন—এমন অভিযোগ থাকলেও ভয়ে নাম প্রকাশ করে কেউ মুখ খুলতে রাজি নন। ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, গ্যাসের দাম নির্ধারণ করলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে বিইআরসি। তাদের মতে, নজরদারি দুর্বল থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছে। সরকার ও বিইআরসির অবস্থান তবে সরকার ও বিইআরসি সংকটকে সাময়িক বলে দাবি করছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান বলেন, “শীত মৌসুমে স্বাভাবিকভাবেই এলপিজির চাহিদা বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে জাহাজ সংকট। তবে এটি সাময়িক সমস্যা।” তিনি দাবি করেন, বর্তমানে বাজারে প্রয়োজনীয় এলপিজি রয়েছে এবং যারা অতিরিক্ত দাম নিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, “এলপিজির ৯৮ শতাংশই বেসরকারি খাতে। আমদানি, সংরক্ষণ ও বিপণনের সবকিছুই তারা নিয়ন্ত্রণ করে। সরকারের হাতে আছে মাত্র দুই শতাংশ, যা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রক্রিয়াজাত হয়। সেটিও বর্তমানে মেইনটেন্যান্সের কারণে বন্ধ।” তিনি জানান, সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত এলপিজি আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যেই বাজারে নতুন চালান আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এলসি খোলা কম হওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে কি না—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমাদের কাছে অপারেটররা যে তথ্য দিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে গত মাসের তুলনায় এ মাসে বেশি এলসি খোলা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে।” উপসংহার সব মিলিয়ে দেশে এলপিজি সংকট এখন বহুমাত্রিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, এলসি জটিলতা, আমদানি ঘাটতি ও দুর্বল বাজার নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু মিলিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। সরকার সংকট সাময়িক বললেও মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। দ্রুত কার্যকর নজরদারি ও সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এ সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।