পর্ব–২
২০২১ সাল যেন তার সবকিছু বদলাতে শুরু করল।
স্বামী মানে কুদ্দুছ কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল।
প্রায় রাতেই দেরি করে বাসায় ফিরত,
আর রিয়া ততক্ষণ একা বাসার চার দেয়ালের ভেতর অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ত।
কেন আসছে না কুদ্দুছ? অফিস তো অনেক আগেই শেষ হয়েছে—
এসব চিন্তাই ঘুরপাক খেত তার মাথার ভেতর।
দুই বছর আগের সেই নরম শীতের বিকেল এখন অনেক দূরের স্মৃতি। সংসার নামের ঘরটা আছে, মানুষটাও আছে—কিন্তু সম্পর্কের ভেতরের উষ্ণতা যেন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে গেছে।
কুদ্দুছ এখন আগের মতো কথা বলে না। অফিসের ব্যস্ততা তার গলায় কাঁটার মতো লেগে থাকে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে কখনও দশটা, কখনও এগারোটা। দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে, ক্লান্ত মুখ, চোখে বিরক্তির ছাপ।
—“খাবার দাও।”
এই পর্যন্তই।
রিয়া খাবার গরম করতে করতে তাকিয়ে থাকে ঘড়ির দিকে। সন্ধ্যা ছয়টা থেকে শুরু হওয়া অপেক্ষা তখন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। রান্নাঘরের চুলার আগুন যেমন ধীরে ধীরে কমে আসে, তেমনি তার মনেও আলো কমতে থাকে।
প্রথম প্রথম সে নিজেকে বোঝাত—কাজের চাপ। সংসার চালাতে হলে তো কষ্ট করতেই হয়। কিন্তু প্রতিদিন একই অজুহাত, একই দেরি, একই নীরবতা—এসব মিলিয়ে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করল।
একদিন সে সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিল,
—“তুমি এত দেরি করো কেন? চিন্তা হয়।”
কুদ্দুছ বিরক্ত হয়ে বলেছিল,
—“অফিসে কাজ আছে। সবাই কি পাঁচটায় বেরিয়ে আসে?”
—“আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম…”
—“তোমার সন্দেহ করার কিছু নেই।”
‘সন্দেহ’ শব্দটা শুনে রিয়া চুপ হয়ে গিয়েছিল। সে তো শুধু অপেক্ষা করে। অপেক্ষা কি সন্দেহের সমান?
ঘরের দেয়ালগুলো যেন কথা বলতে শুরু করেছিল। বিকেলে একা বসে থাকতে থাকতে রিয়া টের পেত—সময় আর নড়ে না। টিভি চালালে শব্দ লাগে, বই খুললে অক্ষর ঝাপসা হয়। বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচের রাস্তায় মানুষের যাওয়া-আসা দেখে। মনে হয়, সবার জীবনে গতি আছে, শুধু তার জীবনটাই আটকে আছে।
মাঝে মাঝে সে নিজের পুরনো ডায়েরি খুলে পড়ে। সেখানে লেখা—“আমি ঠিক আছি।” এখন সে লিখতে পারে না এই বাক্যটা। কারণ সত্যি বললে, সে ঠিক নেই।
কুদ্দুছের ফোনে এখন প্রায়ই নোটিফিকেশন আসে। খাওয়ার সময়েও সে ফোনে চোখ রাখে। রিয়া একদিন হালকা করে বলেছিল,
—“তুমি এখন খুব ব্যস্ত হয়ে গেছ।”
কুদ্দুছ হেসে বলেছিল,
—“সময় বদলায়, দায়িত্ব বাড়ে।”
রিয়া মনে মনে ভাবল—সময় বদলায়, মানুষও কি বদলায়?
এক রাতে কুদ্দুছ আরও দেরি করে ফিরল। ঘড়িতে তখন বারোটা। রিয়া দরজার পাশে বসে ছিল। ফোনে কল দিয়েছিল তিনবার, রিসিভ হয়নি। দরজা খুলতেই সে বলল,
—“এত দেরি?”
—“মিটিং ছিল।”
—“এত রাত পর্যন্ত?”
—“তুমি কি আমাকে জেরা করছ?”
কথাটা শুনে রিয়ার বুকের ভেতর কেমন যেন ধসে গেল। সে তো শুধু ভয় পেয়েছিল। অজানা আশঙ্কা তাকে গ্রাস করেছিল—কোথাও কিছু হয়েছে নাকি?
সেই রাতে খাওয়ার টেবিলে আর কোনো কথা হয়নি। শুধু চামচের শব্দ, আর নীরবতার ভার।
ধীরে ধীরে রিয়া টের পেল, তার ভিতরে একটা অদৃশ্য ক্লান্তি জমছে। এই অপেক্ষা, এই না বলা কথা, এই অবহেলার হালকা খোঁচা—সব মিলিয়ে তার আত্মবিশ্বাস ক্ষয়ে যাচ্ছে।
একদিন দুপুরে সে হঠাৎ আয়নায় নিজেকে দেখল। চোখের নিচে কালি আরও গাঢ়। মুখে সেই আগের হাসি নেই। সে নিজেকে জিজ্ঞেস করল—
আমি কি শুধুই অপেক্ষা করার জন্য বেঁচে আছি?
সেদিন বিকেলে সে মাকে ফোন করল। অনেকদিন পর দীর্ঘ কথা। মা জিজ্ঞেস করলেন,
—“সব ঠিক তো?”
রিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“হ্যাঁ, সব ঠিক।”
কিন্তু তার গলার ভাঙা স্বর মায়ের কানে নিশ্চয়ই ধরা পড়েছিল। মা বললেন,
—“সংসারে সব সময় সব একরকম থাকে না মা। তবে নিজের মনটা মেরে ফেলিস না।”
‘নিজের মনটা মেরে ফেলিস না’—কথাটা কানে লেগে রইল।
সেই রাতে কুদ্দুছ আবার দেরি করল। কিন্তু এবার রিয়া দরজার পাশে বসে থাকল না। সে নিজের ঘরে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াল। বাইরে অন্ধকার। দূরের লাইটপোস্টের আলোয় পোকামাকড় উড়ছে। মনে হলো, আলো থাকলেও কিছু প্রাণী শুধু ঘুরতেই থাকে—কোথাও পৌঁছায় না।
কুদ্দুছ ঢুকে বলল,
—“খাবার দাও।”
রিয়া শান্ত গলায় বলল,
—“টেবিলে রাখা আছে। গরম করে নিও।”
কুদ্দুছ অবাক হয়ে তাকাল।
—“তুমি খাওনি?”
—“খেয়ে নিয়েছি।”
আসলে সে খায়নি। কিন্তু সে আর অপেক্ষা করতে চায়নি।
পরের দিন সকালে কুদ্দুছ বলল,
—“তোমার আচরণ বদলে গেছে।”
রিয়া উত্তর দিল,
—“সময় বদলায়, মানুষও বদলায়—তুমিই তো বলেছিলে।”
কথাটা শুনে কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
রিয়া এখন নিজের ভেতরে নতুন এক প্রশ্ন খুঁজে পেয়েছে। এই সংসার কি শুধুই দায়িত্বের? এখানে কি তার নিজের অস্তিত্বের কোনো জায়গা আছে? সে কি শুধুই রান্না, ঘর গোছানো আর অপেক্ষার নাম?
একদিন আলমারির ড্রয়ার গোছাতে গিয়ে সে তার সার্টিফিকেটগুলো পেল। ধুলো জমেছে। হাত বুলিয়ে পরিষ্কার করল। তার চোখে এক ঝলক আগের রিয়া ফিরে এলো—যে স্বপ্ন দেখত, যে নিজের একটা পরিচয় চাইত।
সেই দিনই সে সিদ্ধান্ত নিল—সে আবার পড়াশোনা শুরু করবে। অনলাইনে কোর্স খুঁজতে লাগল। আবেদনপত্র পূরণ করল চুপচাপ।
কুদ্দুছকে সে তখনও কিছু বলেনি।
রাতে কুদ্দুছ যখন দেরি করে ফিরল, রিয়া তখন ল্যাপটপে বসে। দরজা খুলে ভেতরে এসে কুদ্দুছ বলল,
—“কী করছ?”
—“একটা কোর্সে ভর্তি হচ্ছি।”
—“কেন?”
—“নিজের জন্য।”
দুইজনের চোখে চোখ পড়ল। সেই দৃষ্টিতে অজস্র না বলা কথা।
কুদ্দুছ হয়তো ভাবেনি, রিয়া এভাবে বদলাবে। এতদিন যে মেয়েটি শুধু অপেক্ষা করত, সে আজ নিজের সময়কে নিজের মতো ব্যবহার করতে চাইছে।
কিন্তু এই বদল কি সহজ হবে?
২০২১ সালের এই পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে রিয়া বুঝতে পারল—ভালবাসা শুধু অপেক্ষা নয়, আত্মসম্মানও। সম্পর্ক যদি একপাক্ষিক হয়ে যায়, তবে সেখানে ধীরে ধীরে ফাঁক তৈরি হয়।
সে এখনো কুদ্দুছকে ভালবাসে। কিন্তু সেই ভালবাসার সাথে যুক্ত হয়েছে নিজের প্রতি দায়বদ্ধতা।
রাতের নীরবতায় সে ভাবল—
আমি কি এই সম্পর্ককে নতুনভাবে গড়তে পারব?
নাকি আমাকে একদিন নিজের পথ আলাদা করে নিতে হবে?
ঘড়ির কাঁটা তখন বারোটা ছুঁয়েছে। কুদ্দুছ পাশের ঘরে ফোনে কথা বলছে—হালকা হাসির শব্দ ভেসে আসছে। রিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। আকাশে চাঁদ নেই, তবুও অন্ধকার পুরোপুরি গ্রাস করতে পারেনি আলোকে।
তার মনে হলো—অন্ধকার যতই ঘন হোক, ভোর একদিন আসবেই।
এই ভোর কি তাদের সম্পর্কের জন্য?
নাকি শুধু রিয়ার নিজের জীবনের জন্য?
চলবে............