পর্ব–৩
কুদ্দুছের মা-বাবা—রিয়ার শ্বশুর-শাশুড়ি—এখন থাকেন গ্রামে। শহরের চার দেয়ালে ঘেরা বাড়ি তাদের ভাল লাগে না। কংক্রিটের ভিড়ে তারা হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। তাই ফিরে গেছেন নিজেদের চেনা উঠান, শিউলি গাছ, পুকুরপাড় আর মসজিদের আজানের কাছে।
এই শহরের ফ্ল্যাটে এখন শুধু দু’জন মানুষ—কুদ্দুছ আর রিয়া।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে, মানুষ দুইজন হলেও একাকীত্ব যেন একজনের।
বাসায় আমি একা—ভাবত রিয়া।
মন খারাপ, অভিমান, একাকীত্ব—
এসব মিলিয়ে রিয়া ও কুদ্দুছের সম্পর্কের মধ্যে
নীরব দূরত্ব তৈরি হতে লাগছিল।
মাঝে মধ্যে ঝগড়াও হতো,
কথা কাটাকাটি হতো,
তবুও একটা সত্য ছিল—
তারা এখনও এক ছাদের নিচে থাকে।
আর হয়তো এখনও একে অপরকে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে পারেনি।
শ্বশুর-শাশুড়ি গ্রামে চলে যাওয়ার পর প্রথম কয়েকদিন রিয়ার একটু ভালই লেগেছিল। অন্তত সারাদিন কারো নজরদারি নেই। নিজের মতো করে ঘর গুছাতে পারে, রান্নার মেনু ঠিক করতে পারে, বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চা খেতে পারে নির্ভয়ে।
কিন্তু স্বাধীনতার এই হালকা স্বাদ খুব দ্রুত এক ধরনের শূন্যতায় বদলে গেল। সারাদিন কথা বলার মতো কেউ নেই। কুদ্দুছ সকালে বেরিয়ে যায়, ফেরে গভীর রাতে। মাঝের দীর্ঘ সময়টুকু যেন এক অনন্ত অপেক্ষা।
ঘরের দেয়ালে ঘড়ির কাঁটা টিকটিক শব্দ করে চলে, আর রিয়ার মনে হয় সময় তাকে ব্যঙ্গ করছে। সে এখন অনলাইনের কোর্সে নিয়মিত। লেকচার শোনে, নোট নেয়। কিন্তু পড়ার মাঝেও মন হঠাৎ থেমে যায়—কুদ্দুছ কি আজও দেরি করবে?
একদিন সন্ধ্যায় হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। বারান্দার গ্রিলে হাত রেখে রিয়া দেখছিল ভেজা রাস্তায় মানুষের ছুটোছুটি। তার মনে হচ্ছিল, বৃষ্টির মতোই তার ভেতরেও কিছু জমে আছে—ঝরে পড়তে চায়, কিন্তু পারে না।
সেই রাতে কুদ্দুছ তুলনামূলক একটু আগে ফিরল। ঘড়িতে সাড়ে আটটা। রিয়া অবাক হলো।
—“আজ এত তাড়াতাড়ি?”
—“কাজ কম ছিল।”
কথা শেষ। আর কিছু নয়।
রিয়া সাহস করে বলল,
—“আমরা কি কোথাও ঘুরতে যেতে পারি? অনেকদিন কোথাও যাই না।”
কুদ্দুছ জবাব দিল,
—“এখন সময় নেই। পরে দেখা যাবে।”
এই ‘পরে’ শব্দটা যেন তাদের সম্পর্কের চিরন্তন প্রতিশ্রুতি—যা কখনো পূরণ হয় না।
মাঝে মাঝে ঝগড়া বাধে খুব ছোট বিষয় নিয়ে। একদিন রিয়া বলেছিল,
—“তুমি আগের মতো কথা বলো না।”
কুদ্দুছ বিরক্ত হয়ে বলেছিল,
—“সবসময় কি রোমান্টিক থাকা যায়? সংসার মানে দায়িত্ব।”
—“দায়িত্বের ভেতর কি একটু অনুভূতি থাকতে পারে না?”
—“তুমি অত ভাবো।”
কথা কাটাকাটি সেখানেই শেষ হয়নি। কণ্ঠস্বর উঁচু হয়েছে, দরজা জোরে বন্ধ হয়েছে। তারপর নীরবতা। এই নীরবতাই যেন সবচেয়ে বড় শাস্তি।
তবুও একটা সত্য ছিল—ঝগড়ার পরেও তারা একে অপরের জন্যই চিন্তা করত।
সেদিন রাতে রিয়া ইচ্ছে করে খায়নি। অভিমান জমে ছিল। কুদ্দুছ খেয়াল করেনি প্রথমে। পরে ফ্রিজ খুলে দেখে খাবার যেমন ছিল তেমনই আছে।
—“তুমি খাওনি?”
—“ইচ্ছে করেনি।”
—“অভিমান করেছ?”
রিয়া চুপ।
কুদ্দুছ একটু থেমে বলল,
—“এভাবে না খেয়ে থেকো না।”
কথাটা খুব সাধারণ। কিন্তু এই সাধারণ বাক্যের ভেতরে লুকিয়ে ছিল একফোঁটা যত্ন। রিয়া বুঝল—সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি এখনও।
তাদের সম্পর্ক এখন অদ্ভুত এক জায়গায় দাঁড়িয়ে। ভালবাসা আছে কি নেই—তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু সম্পূর্ণ উদাসীনতাও নেই। আছে অভিমান, আছে অপূর্ণতা, আছে প্রত্যাশা।
রিয়া এখন নিজের ভেতর বদল টের পায়। সে আর শুধু অপেক্ষা করে না। নিজের পড়াশোনা, নিজের সময়, নিজের চিন্তাগুলোকে গুরুত্ব দিতে শিখছে। কখনও কখনও কুদ্দুছ বাড়ি ফিরলেও সে বই নিয়ে বসে থাকে।
কুদ্দুছ জিজ্ঞেস করে,
—“আমার সাথে বসবে না?”
—“পড়াটা শেষ করি।”
এই ছোট ছোট বদলগুলো কুদ্দুছও অনুভব করছে। হয়তো সে বুঝতে পারছে—রিয়া আগের মতো নেই।
একদিন গভীর রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। ঘর অন্ধকার। জানালার বাইরে দূরের আলো। কুদ্দুছ চুপচাপ এসে রিয়ার পাশে দাঁড়াল।
—“ভয় পাচ্ছ?”
—“না।”
—“আমরা কি খুব দূরে চলে গেছি?”
প্রশ্নটা অপ্রত্যাশিত ছিল। রিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“দূরত্ব কখনো হঠাৎ হয় না। ধীরে ধীরে হয়।”
—“ফিরে আসা যায়?”
—“চেষ্টা করলে যায়।”
কুদ্দুছ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“আমি হয়তো কাজের চাপে তোমাকে সময় দিতে পারিনি।”
রিয়া নরম গলায় বলল,
—“সময় শুধু ঘড়ির কাঁটা না। মনটাও দিতে হয়।”
অন্ধকারে দু’জনের মুখ দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু কথাগুলো স্পষ্ট ছিল।
তবুও, পরদিন সকাল আবার একই নিয়মে শুরু হলো। কুদ্দুছ অফিসে গেল, রিয়া একা রইল। জীবনের বাস্তবতা এত সহজে বদলায় না।
কখনও কখনও রিয়া ভাবে—যদি তারা দু’জন আবার নতুন করে শুরু করতে পারত! যদি সেই প্রথম দিনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখার মুহূর্তগুলো ফিরে আসত!
কিন্তু জীবন কি পিছিয়ে যায়?
একদিন গ্রামের বাড়ি থেকে শাশুড়ি ফোন করলেন।
—“তোমরা ভাল আছ তো?”
রিয়া বলল,
—“হ্যাঁ, ভাল।”
শাশুড়ি বললেন,
—“সংসারে ঝগড়া হতেই পারে, তবে সম্পর্ক ভাঙার মতো কিছু করো না।”
কথাটা শুনে রিয়া চুপ হয়ে গেল। গ্রামে বসে থেকেও মানুষগুলো বুঝতে পারে—দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।
সেদিন রাতে রিয়া ডায়েরিতে লিখল—
“আমরা এখনও একসাথে। কিন্তু একসাথে থাকা আর এক হয়ে থাকা এক জিনিস নয়।”
তবুও একটা সত্য ছিল—
তারা এখনও একে অপরকে হারাতে চায় না।
ভালবাসা হয়তো আগের মতো উজ্জ্বল নয়, কিন্তু একেবারে নিভেও যায়নি। আগুনের নিচে যেমন ছাই জমে, তবুও ভেতরে ভেতরে উষ্ণতা লুকিয়ে থাকে—তাদের সম্পর্কও ঠিক তেমন।
প্রশ্ন শুধু একটাই—
সে উষ্ণতাকে কি তারা আবার জ্বালাতে পারবে?
রাত বাড়ে। কুদ্দুছ পাশ ফিরে ঘুমায়। রিয়া ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয়—এই চার দেয়ালের ভেতর শুধু ইট-সিমেন্ট নয়, জমে আছে না বলা অসংখ্য কথা।
শহরের এই ফ্ল্যাটে দু’জন মানুষ পাশাপাশি থাকে, অথচ মাঝখানে যেন অদৃশ্য এক দেয়াল।
সে দেয়াল কি ভাঙবে?
নাকি একদিন এতটাই উঁচু হবে যে আর পার হওয়া যাবে না?
চলবে............