২০১৯ সালের ক্যাসিনোকাণ্ডের সময় গুলিস্তানে অবস্থিত বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল নামের ক্লাবটি সিলগালা করা হয়। তখন থেকে ক্লাবটি বন্ধ অবস্থায় ছিল। কিন্তু সম্প্রতি সেখানে দখল নেওয়া হয়ে মার্কেট নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের খবর, হাসেম ওরফে হাসমত, সাইফুল ও মোরশেদ নামের তিনজন ব্যক্তি এই মার্কেট নির্মাণ করছেন। তারা স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।তাদের দাবি, তারা আগামী দুই বছরের জন্য এই জায়গাটি লিজ নিয়েছেন। লিজ শর্ত অনুযায়ী তারা মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে প্রতি মাসে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা ভাড়া দিচ্ছেন, যা নভেম্বর মাস থেকে শুরু হয়েছে। তবে স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সূত্র জানায়, লিজ শর্তের পরিপন্থী কাজ হওয়ায় তা ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি:
সোমবার (৫ জানুয়ারি) গুলিস্তানে গিয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, ক্লাবটির প্রধান গেট বন্ধ। তবে দক্ষিণ পাশের দেয়াল ভেঙে একটি প্রবেশপথ তৈরি করা হয়েছে। গেট ও সামনের দেয়ালে বড় বড় ব্যানার লাগানো হয়েছে। তিনটি ব্যানারে লেখা আছে: ‘শীগ্রই শুভ উদ্বোধন – ১লা ফেব্রুয়ারি ২০২৬’ এবং ‘বাংলাদেশের বৃহত্তম স্পোর্টস মার্কেট’। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণ কাজ চলছে।
মার্কেটটি লিজ নেওয়া তিনজনের একজন হাসেম নিজেকে বিএনপির নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি মূলত মার্কেট নির্মাণের যাবতীয় কাজ দেখভাল করছেন। তিনি বলেন, “আমরা দুই বছরের জন্য জায়গাটি লিজ নিয়েছি। যেহেতু এটি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল, ভেতরে মাদক সেবন ও জুয়ার আসর চলত। ক্লাবটি তখন কোনোভাবে লাভের উৎস ছিল না। তাই মার্কেট করলে মাসে অন্তত ভাড়া পাওয়া যাবে। এই কারণেই আমরা লিজ নিয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, লিজের জন্য তারা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। নভেম্বর মাস থেকে মাসিক ভাড়া পরিশোধ শুরু হয়েছে। তবে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপের সময় তিনি লিজ বাতিল হওয়ার তথ্যটি প্রকাশ করেননি।
নির্মাণ ও অবকাঠামো:
মার্কেট নির্মাণের কাজ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে। বর্তমানে সেখানে অর্ধশতাধিক ইটের খুপড়ি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। কিছু দোকানে ছাদ ঢালাইয়ের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। সবকিছুই লিজ শর্তের পরিপন্থী। স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই দোকানগুলো ভাড়া দেওয়া হবে।
মৌখিক অভিযোগ অনুযায়ী, বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও শাহবাগ থানা বিএনপির কয়েকজন স্থানীয় নেতা এই নির্মাণ প্রকল্পে জড়িত। স্থানীয়রা জানিয়েছে, শাহবাগ থানা বিএনপির আহ্বায়ক জাকির হোসেন মিন্টু, যুগ্ম আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম স্বপন, যুগ্ম আহ্বায়ক তৌহিদুল ইসলাম বাবু, ২০নং ওয়ার্ড বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক টিটু, যুগ্ম আহ্বায়ক সুফিয়ান, যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল হাদি হক, যুগ্ম আহ্বায়ক আমজাদ হোসেন, বঙ্গবাজার ইউনিট বিএনপির সহ-সভাপতি হাজী জাহাঙ্গীর সক্রিয়ভাবে জড়িত।
সূত্র জানায়, শাহবাগের বিএনপি নেতা আমজাদ হোসেন লিজ নেওয়ার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তারা মন্ত্রণালয়ে জামানত হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা প্রদান করেছেন এবং লিজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থাপনা নির্মাণ শুরু করেছেন।
ক্লাবের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট:
২০১৯ সালে ক্যাসিনোকাণ্ডের সময় ক্লাবটি সিলগালা করা হয়। তখন সেখানে নিয়মিত জুয়ার আসর চলত। জানা গেছে, ক্লাবের জুয়ার ব্যবসা চালাতেন যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট। তার লোকজন সারাক্ষণ ক্লাব পর্যবেক্ষণ করত। ঢাকা ছাড়াও ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, পটুয়াখালী ও নড়াইল থেকে লোকজন বাস ভরে জুয়ার আসরে অংশ নিত। প্রতিদিন কোটি টাকা হাতবদল হতো, যা গভীর রাতে হিসাব করা হতো। পরবর্তী সময়ে এই অর্থ যুবলীগ নেতা সম্রাটসহ সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করা হতো।
তবে আলোচিত ক্যাসিনোকাণ্ডের সময় ক্লাবটি সিলগালা করা হয়। তারপর থেকে সব কার্যক্রম বন্ধ ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর হাসেম, মোরশেদ ও সাইফুল তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর তারা নিজস্বভাবে ইট, সিমেন্ট, বাঁশ ও কাঠ নিয়ে মার্কেট নির্মাণ শুরু করেন।
মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য:
কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সেক্রেটারি বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক আহমেদ খান বলেন, “তারা প্রথমে অস্থায়ী ভিত্তিতে আবেদন করেছিল। কিন্তু লিজ পাওয়ার পর স্থায়ী ও ভারী স্থাপনা নির্মাণ করেছে। এই কারণে তাদের লিজ বাতিল করা হয়েছে। জানুয়ারির ১ তারিখের মধ্যে জায়গাটি খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
স্থানীয়দের উদ্বেগ:
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মার্কেট নির্মাণের প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক তদারকি যথাযথভাবে করা হয়নি। লিজের শর্ত অনুযায়ী, স্থায়ী নির্মাণ বা ভাড়া প্রদান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ, নির্মাণকাজ ও দোকান ভাড়া দেওয়ার পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। এতে মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবের অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এবং আইন-শৃঙ্খলা সুরক্ষার প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়রা আরও জানান, এই মার্কেট নির্মাণ প্রকল্পে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে। এটি শুধু ক্লাবের ইতিহাস ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ ও আইন মেনে চলার নীতিরও অবহেলা করছে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি:
বর্তমানে মার্কেট নির্মাণ চলছে। অর্ধশতাধিক দোকান নির্মিত হয়েছে, ছাদ ঢালাইয়ের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। স্থানীয়রা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, বাজারের ভাড়া শুরু হলে আরও সমস্যার সৃষ্টি হবে। লিজ শর্ত অনুযায়ী, এমন স্থায়ী ও ভারী নির্মাণ করা উচিত ছিল না।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরকে জানিয়ে দিয়েছে যে, লিজ বাতিল এবং স্থানটি জানুয়ারির ১ তারিখের মধ্যে খালি করতে হবে। যদিও এই নির্দেশ কার্যকর হচ্ছে কিনা, তা নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রশাসনের দায়িত্ব।
মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব দখল ও লিজের নামে মার্কেট নির্মাণের ঘটনা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে নজর কাড়ছে। ২০১৯ সালের ক্যাসিনোকাণ্ডের পর বন্ধ থাকা ক্লাবটি নতুনভাবে পুনর্গঠিত হওয়ার কথা থাকলেও এটি রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণে বিকৃত হচ্ছে। স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সদস্যরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, এই ধরনের ঘটনা যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা হয়, তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস ও অধিকার রক্ষার জন্য আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।