রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সমালোচনার ভাষা ক্রমেই অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ হয়ে উঠছে—এমন অভিযোগ উঠছে সাধারণ মানুষের মধ্যেই। একসময় রাজনৈতিক অঙ্গনে নীতিনির্ভর বিতর্ক, আদর্শিক বিরোধিতা এবং শালীন ভাষায় সমালোচনার সংস্কৃতি থাকলেও বর্তমানে সেই চর্চা অনেকটাই হারিয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের নাম জড়িয়ে প্রকাশ্যে অশ্লীল বক্তব্য, স্লোগান ও মন্তব্য রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই প্রবণতা শুধু রাজনৈতিক শিষ্টাচার ভাঙছে না, বরং আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে সহিংস পরিস্থিতির আশঙ্কাও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিতর্কের সূত্রপাত ও সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে নারীদের নিয়ে একটি আপত্তিকর স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ ঘিরেই নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগটি সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন প্রতিবাদ জানায় এবং কয়েকটি স্থানে সভা-সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়।
তবে অভিযোগের পরপরই জামায়াত আমির শফিকুর রহমান তা অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছিল এবং ওই স্ট্যাটাসটি তিনি নিজে দেননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াতে হ্যাকাররা এ কাজ করেছে।
কিন্তু জামায়াত আমিরের এই ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষ ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বড় একটি অংশ বিশ্বাস করতে চাইছে না। অনেকের মতে, রাজনৈতিক দায় এড়াতে ‘হ্যাকিং’ অজুহাত দেওয়া হচ্ছে—যা আগেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা গেছে।
দায় কার—পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
এই বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ার পেছনে পরোক্ষভাবে বিএনপিকে দায়ী করছেন জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি, বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলার পেছনে বিএনপির একটি অংশ জড়িত। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
তবে এর জেরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের কিছু নেতাকর্মী বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে লক্ষ্য করে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দিতে শুরু করেন। বিভিন্ন স্থানে মিছিল ও সমাবেশে এমন স্লোগান শোনা গেছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি দোষারোপ ও অশালীন ভাষার ব্যবহার দলীয় দ্বন্দ্বকে আরও গভীর করছে এবং পারস্পরিক শত্রুতা বাড়িয়ে তুলছে।
রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অবক্ষয়
একসময় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সিনিয়র নেতা কিংবা দলপ্রধানদের বিষয়ে সম্মান বজায় রেখে কথা বলার একটি অলিখিত নিয়ম ছিল। সমালোচনা থাকলেও তা থাকত সীমার মধ্যে। কিন্তু বর্তমানে সেই সীমারেখা ভেঙে পড়েছে বলে মনে করছেন অনেক প্রবীণ রাজনীতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
দুই প্রধান রাজনৈতিক ধারার কিছু নেতাকর্মীর বেফাঁস মন্তব্য, সামাজিক মাধ্যমে দায়িত্বহীন বক্তব্য এবং প্রকাশ্য মিছিলে অশ্লীল স্লোগান রাজনৈতিক শিষ্টাচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে বিরক্তি ও অনাস্থা বাড়ছে।
ঢাকার এক প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন,
“রাজনীতিতে মতভেদ থাকবেই। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ, কুরুচিপূর্ণ ভাষা আর অশ্লীল স্লোগান গণতান্ত্রিক চর্চাকে দুর্বল করে। এতে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাষ্ট্র।”
নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতার আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তাহলে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের সংঘর্ষের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক উত্তেজনা একবার সহিংসতায় রূপ নিলে তা শুধু একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ না থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়বে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, রাজনৈতিক সংঘর্ষের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় সাধারণ মানুষ।
সরকারের অবস্থান ও উদ্যোগ
এই প্রেক্ষাপটে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছে সরকার এবং সহনশীল আচরণের আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে, যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
সরকারের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,“রাজনৈতিক মতভেদ গণতন্ত্রের অংশ। তবে সহিংসতা বা অশালীন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুত আছি।”
সমাধানের পথ কী?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকেই আগে দায়িত্বশীল হতে হবে। নেতাদের বক্তব্য ও কর্মীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিতে হবে দলীয় নেতৃত্বকে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, শুরুতেই যদি এই উত্তেজনা থামানো না যায়, তাহলে তা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে—যার প্রভাব শুধু নির্বাচনেই নয়, সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়বে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান অশ্লীলতা ও পারস্পরিক বিদ্বেষ দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। সময় থাকতে সংযম ও দায়িত্বশীলতার পথে না ফিরলে এর মূল্য দিতে হতে পারে পুরো জাতিকেই।