ঢাকা, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:৪১:৪৪ PM

কারাফটক, পর্ব–৮

মান্নান মারুফ
28-01-2026 03:01:22 PM
কারাফটক, পর্ব–৮

পর্ব–৭ ,ভাঙা দরজার ওপারে

সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। রাস্তায় চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছিল, পাড়ার মোড়ে কেউ খবরের কাগজ উল্টাচ্ছিল। কিন্তু সুর্বনার ঘরের সামনে এসে সকাল থমকে দাঁড়ায়।
কেউ একজন তাকে খুঁজতে এসেছিল—হয়তো কোনো পরিচিত, হয়তো কেবল খোঁজখবর নিতে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাক দিল।

কোনো সাড়া নেই।

আবার ডাকল।
এই ঘরটা সাধারণত নীরব থাকত না। শিশুর কান্না, পাতলা কণ্ঠে সুর্বনার কথা—সব মিলিয়ে ঘরটা চিনিয়ে দিত নিজের অস্তিত্ব। আজ সেই পরিচিত শব্দগুলো নেই।

দরজায় নক করা হলো।

নিঃশব্দ।

সময় গড়াল। রোদ একটু চড়া হলো। অপেক্ষা দীর্ঘ হলো। তবু ভেতর থেকে কোনো শব্দ এলো না।
মানুষের মনে তখনই সন্দেহ জন্মায়—যখন নীরবতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ধরে থাকে।

পাড়ার আরও দু-একজন এসে জড়ো হলো। কেউ বলল, “হয়তো ঘুমাচ্ছে।”
আরেকজন চাপা গলায় বলল, “এতক্ষণে তো শিশুর শব্দ শোনা যাওয়ার কথা।”

কুদ্দুছ তখন জেলে।
এই ঘরের একমাত্র পুরুষ অনুপস্থিত। দায়িত্ব, প্রশ্ন—সবই যেন বাতাসে ঝুলে আছে।

আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর নীরবতা ভয় হয়ে দাঁড়াল।

শেষমেশ সিদ্ধান্ত হলো—দরজা ভাঙতে হবে।

দরজাটা ভাঙা মাত্রই বোঝা গেল, ঘরের ভেতর সময় থেমে আছে।
কোনো হাঁটাচলা নেই, নেই নিঃশ্বাসের শব্দ।
ঘরটা এমনভাবে স্থির, যেন বহুক্ষণ আগেই তার গল্প শেষ হয়ে গেছে।

ভেতরে পড়ে আছে দুটি নিথর দেহ।

সুর্বনা।
আর শিশু নাফিজ।

এক মুহূর্তে কেউ কথা বলতে পারল না।
কারও মুখ থেকে শব্দ বেরোয় না।
তারপর হঠাৎ যেন শব্দের বিস্ফোরণ—কেউ চিৎকার করল, কেউ দৌড়ে বাইরে গেল, কেউ আবার নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

“সবই হইচৈ—কী হলো, কিভাবে হলো”—প্রশ্নের বন্যা নামল।
কিন্তু কোনো প্রশ্নের উত্তর নেই।

সবই শেষ।

খবর ছড়িয়ে পড়ল পাড়ায়।
মানুষ এল—কেউ কৌতূহল নিয়ে, কেউ সহানুভূতি নিয়ে, কেউ আবার নিছক দেখার জন্য।

কেউ কাঁদছিল।
কেউ অন্যের কান্না দেখে মুখ টিপে হাসছিল।

এই দৃশ্যটা যেন বাস্তব নয়—মনে হচ্ছিল কোনো নাটকের মঞ্চ।
যেখানে কিছু মানুষ অভিনয় করছে, আর কিছু মানুষ দর্শক হয়ে উপভোগ করছে।

তিনজনের সংসার ছিল।

একজন—কুদ্দুছ—জেলে।
বাকি দুজন—স্বইচ্ছায় পরপারে।

কেউ কেউ ফিসফিস করে বলল, “এমনই তো হওয়ার কথা ছিল।”
আরেকজন বলল, “মেয়েটা একা, টাকার কষ্ট, সমাজের চাপ—সব মিলিয়ে…”

সমাজ তখন বিশ্লেষক হয়ে ওঠে।
যখন কিছু করার সময় ছিল, তখন সে চুপ ছিল।
আর সব শেষ হলে—সে বিচার করে, মন্তব্য করে, গল্প বানায়।

পুলিশ এলো। তদন্ত শুরু হলো।
কাগজে-কলমে সব লেখা হলো—সময়, অবস্থা, পরিস্থিতি।
কিন্তু তদন্তের খাতায় যে প্রশ্নটা লেখা হয় না, সেটাই সবচেয়ে বড়—

এই মৃত্যুর দায় কার?

রাষ্ট্রের?
সমাজের?
নাকি সেই অদৃশ্য কারাফটকের—যার ভেতর দিয়ে সুর্বনা কোনোদিন বেরোতে পারেনি?

কারাফটক আসলে কোনো লোহার দরজা নয়।
এটা এক অদৃশ্য সীমানা—যেখানে মানুষ আটকে পড়ে।

সুর্বনার কারাফটক ছিল দারিদ্র্য।
ছিল স্বামীর অনুপস্থিতি।
ছিল সমাজের দৃষ্টি—যেখানে সহানুভূতির চেয়ে কৌতূহল বেশি।

সে দরজাটা প্রতিদিন ঠেলে দেখেছে।
কিন্তু দরজার ওপাশে কোনো আলো ছিল না।

তদন্ত শেষ হয় নিয়ম মেনে।
কিন্তু কুদ্দুছের জীবনে তদন্ত শুরু হয় অন্যভাবে।

জেলের ভেতর সে কিছুই জানে না।
জানে না, তার সংসার আর নেই।
জানে না, তার অপেক্ষার মানুষগুলো আর অপেক্ষা করছে না।

কারাফটক বন্ধ হয়ে গেছে।

কিন্তু কোনো এক পর্বে কুদ্দুছ জানবে।
সেই জানা হবে তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত।

এই বাড়িটা এখন খালি।
দিনের আলো ঢোকে, কিন্তু উষ্ণতা ঢোকে না।
রাতে অন্ধকার নামে, কিন্তু ভয় নেই—কারণ ভয় পাওয়ার কেউ নেই।

কারাফটক শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়।
এটা সেই সব মানুষের গল্প—যারা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও বেরোতে পারে না।

চলবে.................