ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ১০:০৫:১৪ PM

উপন্যাস: ”অসমাপ্ত “ পর্ব–১

মান্নান মারুফ
29-01-2026 07:46:58 PM
উপন্যাস: ”অসমাপ্ত “ পর্ব–১

পর্ব–১ : সমাপ্তিকে কখনো ভালোবাসা যায় না

সমাপ্তিকে কখনো ভালোবাসতে চায়নি কুদ্দুছ।
সমাপ্তি মানেই শেষ—আর শেষ মানেই শূন্যতা। শূন্যতাকে সে ভয় পেত না ঠিকই, কিন্তু তাকে আপন করে নেওয়ার মতো মনও তার ছিল না। তাই ‘সমাপ্তি’ নামটা শুনলেই কেমন যেন বিরক্তি জন্মাত তার ভেতরে। অদ্ভুত এক অস্বস্তি। নামটা তার কাছে একটু শয়তান শয়তান মনে হতো। কেন মনে হতো—সেই প্রশ্নের উত্তর কোনো দিন খুঁজে দেখেনি সে।

জীবন চলছিল নিজের মতো করেই। অফিস, ব্যস্ততা, দায়িত্ব, আর একরাশ না বলা কথা। এই কথাগুলোই ছিল তার সবচেয়ে আপন সঙ্গী। কুদ্দুছের জীবনে ভালোবাসা নতুন কিছু নয়, তবে তা ছিল একান্ত, নীরব আর কঠিন। মুক্তাকে সে ভালোবাসত—ভালোবাসে এখনো। মুক্তা তার বোন নয়, অথচ সম্পর্কটা বোনের মতোই পবিত্র, আবার প্রেমিকার মতোই গভীর। মানুষ এমন সম্পর্ক বোঝে না। বোঝার দরকারও নেই।

মুক্তা ছিল তার জীবনের একমাত্র আশ্রয়। একে অপরকে ছাড়া তারা থাকতে পারত না। সম্পর্কটা কখন শুরু হয়েছিল, কেউ জানে না। হয়তো কোনো এক বিকেলে, কিংবা কোনো এক অসময়ে—যখন চোখে চোখ পড়েছিল, আর দুজনেই বুঝে গিয়েছিল, এই দেখা শুধু দেখা নয়।

তাদের ভালোবাসা ছিল কঠিন। কারণ সমাজ সহজ কিছু পছন্দ করে না। তাদের পথও সহজ ছিল না। তবু তারা লড়াই করেছিল—নীরবে, ধৈর্য নিয়ে। কুদ্দুছ জানত, এই ভালোবাসা যদি কখনো শেষ হয়, তবে তার জীবনের সব আলো নিভে যাবে।

ঠিক তখনই সমাপ্তির সঙ্গে তার প্রথম পরিচয়।

সমাপ্তি এসেছিল হঠাৎ করেই। কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই। অফিসের এক বৈঠকে। নতুন প্রজেক্ট, নতুন টিম—আর সেই টিমেই সমাপ্তি। বয়সে অনেক ছোট। চোখে অদ্ভুত এক জেদ, আবার কোথাও একরাশ ক্লান্তি লুকানো। প্রথম দেখায় কুদ্দুছ তার দিকে বিশেষ মনোযোগ দেয়নি। তার কাছে সমাপ্তি ছিল আর দশজন সহকর্মীর মতোই।

সে গুরুত্ব দেয়নি। দেওয়ার কারণও ছিল না।

কিন্তু সম্পর্কগুলো সব সময় কারণ মেনে চলে না।

দিন গড়াতে লাগল। কাজের সূত্রে কথা বাড়ল। প্রথমে শুধু কাজের কথা, তারপর হালকা হাসি, তারপর নীরবতা ভাগাভাগি করা। কুদ্দুছ টের পেল—সে কথা বলার সময় সমাপ্তি মন দিয়ে শোনে। এমন মনোযোগ দিয়ে, যেন তার প্রতিটি শব্দ গুরুত্বপূর্ণ।

এই অনুভূতিটা কুদ্দুছের কাছে নতুন ছিল।

সমাপ্তি খুব বেশি কথা বলত না। তবে যখন বলত, তখন কথাগুলো হালকা হলেও গভীর হতো। সে কুদ্দুছকে প্রশ্ন করত না, বরং তাকে বুঝতে চাইত। এই চাওয়াটা ধীরে ধীরে কুদ্দুছের ভেতরে এক অজানা অস্বস্তি তৈরি করল।

সে নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করল—এটা কিছুই না। এটা প্রেম না, ভালোবাসাও না। বয়সের পার্থক্য আছে। তার জীবন অন্যদিকে বাঁধা। মুক্তা আছে।

তবু কেন যেন মনে হতো, সমাপ্তির উপস্থিতিতে সময় একটু ধীর হয়ে যায়।

একদিন বৃষ্টিতে ভিজে অফিস থেকে বের হচ্ছিল কুদ্দুছ। হঠাৎ দেখল, সমাপ্তি দাঁড়িয়ে আছে ছাতাহীন। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার চুল ভিজিয়ে দিয়েছে। চোখে বিরক্তি নেই, আছে একরাশ শান্ত গ্রহণ।

“ছাতা নেই?”—প্রশ্নটা নিজের অজান্তেই বেরিয়ে গেল।

সমাপ্তি মাথা নাড়ল।
“বৃষ্টি ভালো লাগে,” হালকা হাসি তার ঠোঁটে।

সেই হাসিটা কুদ্দুছকে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকতে বাধ্য করল। সে বুঝল না কেন, কিন্তু সেই মুহূর্তে তার মনে হলো—কিছু মানুষ থাকে, যাদের কাছে ভিজে যাওয়াও সুন্দর।

এরপর থেকে সম্পর্কটা বদলাতে শুরু করল। খুব ধীরে। এত ধীরে যে কেউ টের পেত না। কুদ্দুছ নিজেও না।

মুক্তা এই পরিবর্তনটা প্রথম লক্ষ করল।

“তুমি আগের মতো নেই,” একদিন বলল সে।
“কেমন নেই?”
“মনটা কোথাও আটকে আছে,” মুক্তার চোখে ছিল গভীরতা।

কুদ্দুছ উত্তর দিতে পারল না। কারণ সে নিজেই জানত না, মনটা কোথায় আটকে আছে।

সে মুক্তাকে ভালোবাসে। এই সত্য অস্বীকার করার মতো মানুষ সে নয়। কিন্তু সমাপ্তির সঙ্গে তার সম্পর্কটা কী? প্রেম নয়। আকর্ষণ? সেটাও না। তাহলে কী?

এক সন্ধ্যায় সমাপ্তি হঠাৎ বলল,
“আপনি জানেন, আপনার চোখে একটা না বলা গল্প আছে।”

কুদ্দুছ চমকে তাকাল।
“সব মানুষের চোখেই থাকে,” সে বলল।

সমাপ্তি মাথা নেড়ে বলল,
“কিন্তু সব গল্প সবাইকে বলা হয় না।”

এই কথাটা কুদ্দুছকে কেমন যেন নড়িয়ে দিল। সে বুঝল—এই মেয়েটা তাকে পড়তে জানে। আর পড়তে পারা মানুষটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।

তবু সে নিজেকে শক্ত রাখল। কারণ সে জানত—যদি সে দুর্বল হয়, তবে অনেক কিছু ভেঙে যাবে।

রাতের বেলা মুক্তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে কুদ্দুছ হঠাৎ থেমে গেল। মনে হলো, সে মুক্তার সঙ্গে থেকেও কোথাও অনুপস্থিত।

এটা তাকে ভয় পাইয়ে দিল।

ভালোবাসা কখন আসে, কেউ জানে না। কিন্তু যখন আসে, সে আসে নিঃশব্দে। ঠিক যেমন সমাপ্তি এসেছিল কুদ্দুছের জীবনে—শেষের নাম নিয়ে, অথচ শুরু হয়ে ওঠার মতো এক অনুভব হয়ে।

একদিকে পুরোনো, কঠিন, পরীক্ষিত ভালোবাসা।
আর অন্যদিকে নাম না দেওয়া এক অনুভূতি—যার নামই যেন সমাপ্তি।

কুদ্দুছ জানত না, সামনে কী অপেক্ষা করছে। শুধু এটুকু জানত—এই পথে হাঁটা সহজ হবে না। কিন্তু কিছু পথ মানুষ ইচ্ছে করে বেছে নেয় না। পথই মানুষকে বেছে নেয়।

আর এই পথের শুরু হয়ে গেছে।
নিঃশব্দে।
অজান্তেই।

চলবে............