ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০২:২৯:০৫ PM

কারাফটক - পর্ব – ৪

মান্নান মারুফ
27-01-2026 11:58:15 AM
কারাফটক - পর্ব – ৪

পর্ব–৪ : অসহায় মায়ের কোল

কারাফটকের ভেতরে যে সময় থমকে থাকে, তার বাইরেও জীবন থেমে থাকে না—এ কথা সুবর্ণা বুঝেছিল সন্তান জন্মের পরপরই। কারাগারের লোহার দরজার ওপারে বন্দি স্বামী, আর এই ওপারে জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব—একটি নবজাতক শিশু। কোলজুড়ে আসা সন্তান যেন একদিকে আশীর্বাদ, অন্যদিকে গভীর আতঙ্কের নাম।

সন্তান জন্মের দিন ভোরবেলা আকাশটা ছিল অদ্ভুত রকমের নির্লিপ্ত। না বৃষ্টি, না রোদ—কেমন একটা ফ্যাকাসে আলো। সেই আলোতেই জন্ম নিল তার ছেলে। ধাত্রীর কণ্ঠে যখন বলা হলো, “ছেলে হয়েছে,” তখন সুবর্ণার চোখ বেয়ে নেমে এলো অশ্রু। আনন্দের অশ্রু, না দুঃখের—তা সে নিজেও জানত না। শুধু জানত, এই শিশুটির পেছনে তার একা দাঁড়িয়ে থাকার যুদ্ধ শুরু হলো।

ছেলের নাম রাখল নাফিজ—যেন নামের মধ্যেই থাকে পবিত্রতা, আশ্রয় আর আলোর প্রতিশ্রুতি। স্বামী বলেছিল একদিন, “আমার ছেলে হলে নাম রাখব নাফিজ।” সেই কথা আজও তার কানে বাজে। অথচ যিনি নামটি ভেবেছিলেন, তিনি আজ বন্দি—কারাফটকের ভেতর।

দিন কাটতে লাগল সুবর্ণার। কিন্তু দিন মানে আর স্বাভাবিক সময় নয়—দিন মানে হিসাব, দুশ্চিন্তা আর না বলা কান্না। স্বামী ছাড়া জীবন যে এতটা অসহায় হতে পারে, তা সে কখনো ভাবেনি। স্বামী আদৌ মুক্তি পাবে কিনা—এই প্রশ্নটা প্রতিদিন তার বুকের ভেতর বিষের মতো জমে থাকে। আশার আলো আছে, কিন্তু সেই আলো এতটাই ক্ষীণ যে ধরতে গেলে হাত পুড়ে যায়।

হাতে টাকা-পয়সা নেই। বাড়তি কোনো অর্থও রেখে যাননি তার স্বামী। মামলার খরচ, আইনজীবীর ফি—সবকিছু যেন অদৃশ্য এক দেয়াল হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সংসারের আসবাব একে একে বিক্রি হয়েছে। প্রথমে স্বর্ণের কানের দুল, তারপর বিয়ের শাড়ি, শেষে রান্নার বাসন পর্যন্ত।

নাফিজের বয়স যখন আট মাস, তখন সুবর্ণার জীবনের অন্ধকারটা আরও ঘন হয়ে এলো। শিশুর খাবার জোগাড় করাই হয়ে উঠল তার জন্য দুঃসাধ্য। দুধ, সেমাই, নরম ভাত—সবকিছুই যেন স্বপ্নের মতো দূরে। কোনো দিন জোটে, কোনো দিন জোটে না। নাফিজ ক্ষুধায় কাঁদে, আর সেই কান্না সুবর্ণার বুকের ভেতর শিরশির করে ওঠে।

দুর্দিনে কেউ পাশে আসে না—এই কথাটা সে বইয়ে পড়েছিল। আজ বুঝছে, বইয়ের কথাও কখনো কখনো ভয়ংকর রকম সত্য হয়। আত্মীয়রা প্রথমে দু’চার দিন খোঁজ নিয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে তাদের আসা কমেছে, ফোন ধরাও অনিয়মিত হয়েছে। কেউ খোঁজ নেয় না, কেউ জানতে চায় না—তুমি বেঁচে আছো তো?

কখনো কখনো সে ভাবত, মানুষ কি কেবল সুখের সময়েই মানুষ? দুঃখ এলেই কি সবাই অচেনা হয়ে যায়?

শিশু সন্তানকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটায় সুবর্ণা। কোনো দিন নিজে না খেয়ে নাফিজকে খাওয়ায়। নিজের ক্ষুধা সে মুঠো করে গিলে রাখে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকেই চিনতে পারে না—চোখের নিচে কালো ছাপ, মুখে ক্লান্তির রেখা। অথচ নাফিজের মুখের দিকে তাকালেই সে আবার শক্ত হয়ে দাঁড়ায়।

রাতে নাফিজ ঘুমিয়ে পড়লে, সে চুপচাপ জানালার পাশে বসে থাকে। আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হয়—ওই আকাশের নিচেই কোথাও তার স্বামী আছে। একই চাঁদ দেখছে কি না, সে জানে না। কিন্তু প্রতিদিন চাঁদের দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে বলে, “দেখো, তোমার ছেলেটা বড় হচ্ছে।”

কারাফটকের কথা মনে পড়লেই বুকটা হু হু করে ওঠে। স্বামীকে শেষ কবে দেখেছে—তার হিসাব মিলাতে পারে না। শুধু মনে থাকে লোহার গেট, রুক্ষ পাহারার চোখ, আর বিদায়ের সময় বলা একটি বাক্য—
“সাবধানে থেকো। আমার ছেলেটাকে আগলে রেখো।”

এই বাক্যটাই এখন তার জীবনের একমাত্র শক্তি।

একদিন পাশের বাড়ির এক নারী এসে বলেছিল, “এভাবে চলবে না। কিছু একটা করতেই হবে।”
কিন্তু কী করবে—এই প্রশ্নের কোনো উত্তর সুবর্ণার কাছে নেই। কাজ খুঁজেছে, কিন্তু শিশুকে রেখে যাওয়ার জায়গা নেই। সমাজের চোখে সে ‘বন্দির স্ত্রী’—এই পরিচয়টাই যেন তার সব দরজা বন্ধ করে দেয়।

তবু, প্রতিটি সকালে নাফিজের মুখে হাসি দেখলে সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে—হাল ছাড়বে না। যত কঠিনই হোক, সে লড়বে। এই লড়াই শুধু নিজের জন্য নয়, নাফিজের ভবিষ্যতের জন্য। কারাফটকের ওপারে যে মানুষটি আজ বন্দি, তার বিশ্বাস যেন ভেঙে না যায়।

রাতের শেষ প্রহরে নাফিজ যখন ঘুমের মধ্যে হাত বাড়িয়ে মায়ের শাড়ি ধরে, তখন সুবর্ণা বুঝতে পারে—এই ছোট্ট হাতটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। কারাফটকের ভেতরে হয়তো স্বামী বন্দি, কিন্তু এই শিশুর হাত ধরে সে এখনো মুক্ত থাকার স্বপ্ন দেখে।

আর সেই স্বপ্ন নিয়েই, পরের দিনের অজানা যুদ্ধের জন্য সে নিজেকে প্রস্তুত করে।