পর্ব – ৩ : মানুষের নীরবতা
কুদ্দুছের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা দাঁড়াল এগারো। সংখ্যাটা শুধু কাগজে লেখা কোনো হিসাব ছিল না—এটা ছিল তার জীবনের ওপর ঝুলে থাকা এগারোটা পাথর। একটার ভার সামলাতে সামলাতে আরেকটা এসে পড়ত বুকে। কোনোটা নাশকতার, কোনোটা উসকানির, কোনোটা রাষ্ট্রবিরোধী তকমা লাগানো অভিযোগ। সব মিলিয়ে তার জীবনটা হয়ে উঠেছিল অস্পষ্ট ধারার এক দীর্ঘ বিচার।
ভাই কয়েকবার চেষ্টা করেছে। দৌড়েছে আইনজীবীর চেম্বার থেকে কোর্টের বারান্দায়। এক মামলায় জামিন হলে সেদিন রাতে সুর্বনার ঘরে আলো জ্বলত। সে হিসাব করত—কুদ্দুছ ফিরলে প্রথম কী রান্না করবে। কিন্তু সেই আলো নিভে যেত দ্রুতই। অন্য মামলায় আবার গ্রেপ্তার দেখানো হতো। কাগজের এক স্বাক্ষরেই কুদ্দুছ ফিরে যেত সেই চেনা অন্ধকারে।
মামলাগুলো কবে শেষ হবে—কেউ বলতে পারত না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করেছিল পঁচিশ সালের এপ্রিল মাসে। সেই দিনটার কথা সুর্বনার মনে গেঁথে ছিল ক্যালেন্ডারের লাল দাগের মতো। সময় এগোলেও দিনটা যেন এগোয়নি।
কারাগারের ভেতর কুদ্দুছ ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। আগের সেই দৃপ্ত কণ্ঠ, চোখে চোখ রেখে কথা বলার মানুষটা নীরব হয়ে উঠছিল। সে এখন হিসাব করত—আজ কয়দিন হলো সূর্যটাকে ঠিকমতো দেখা হয়নি। সহবন্দিদের গল্প শুনত, কিন্তু নিজের গল্প বলতে ইচ্ছে করত না। কারণ তার গল্পের শেষ কোথায়—তা সে নিজেও জানত না।
রাতে শুয়ে শুয়ে সে ভাবত সুর্বনার কথা। পেটভরা সেই সন্তান, সমাজের চোখ, অভাবের চাপ—সবকিছু একসঙ্গে ভেসে উঠত। কখনো নিজের ওপর রাগ হতো, কখনো ভাগ্যের ওপর। কিন্তু সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিত এই বোধটা—সে কিছুই করতে পারছে না।
আর সমাজের কারাগারে বন্দি সুর্বনা প্রতিদিন নতুন নতুন দেয়াল খুঁজে পেত। প্রতিবেশিরা এখন আর ফিসফিস করত না, সরাসরি প্রশ্ন করত—“কিছু খবর আছে?” এই প্রশ্নের ভেতর লুকিয়ে থাকত কৌতূহল, সহানুভূতি নয়। আত্মীয়দের দূরত্ব আরও ইস্পাতের মতো শক্ত হয়ে উঠেছিল। কেউ হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলত না, কেউ খোঁজ নিত না প্রসবের প্রস্তুতি আছে কিনা।
সুর্বনার শরীর ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছিল। ডাক্তার বিশ্রামের কথা বলেছিলেন, কিন্তু বিশ্রামের জায়গা কোথায়? মাথার ভেতর সবসময় ঘুরত হিসাব—ভাড়া, ওষুধ, হাসপাতাল। সে রাতে কুদ্দুছকে চিঠি লিখত, কিন্তু সব কথা লিখতে পারত না। কাগজে শুধু থাকত সাহসী কিছু বাক্য, বাস্তবে ছিল গভীর ভাঙন।
একদিন সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনতে পারল না। এই কি সে-ই, যে একদিন স্বপ্ন দেখেছিল ছোট্ট সংসারের? তার চোখে এখন শুধু ক্লান্তি, মুখে ভয়। পেটের ভেতরের শিশুটি নড়ে উঠলে সে যেন চমকে উঠত—এই নতুন প্রাণটা কোন পৃথিবীতে আসছে?
কুদ্দুছ জেলের ভেতর খবর পেল—আরেকটা মামলার শুনানি পিছিয়েছে। তার মনে হলো, সময়টা যেন ইচ্ছা করেই তাকে ক্ষয় করছে। সে বুঝতে পারছিল, এই কারাফটক শুধু লোহার নয়—এটা সমাজ, রাষ্ট্র আর মানুষের নির্লিপ্ততার তৈরি।
একজন বন্দি কারাগারের ভেতর, একজন বন্দি সমাজের কারাগারে। দুজনের মাঝখানে শুধু দূরত্ব নয়—অসহায়তা। ভালোবাসা তখন আর আশ্রয় নয়, হয়ে উঠছিল বোঝা। তবু সেই ভালোবাসাই ছিল তাদের শেষ সুতো।
এমন এক নীরব মুহূর্ত, যেখানে ভবিষ্যৎ আর ভয় একসঙ্গে মুখোমুখি। সামনে অপেক্ষা করছে এমন এক পথ, যেখানে ভালোবাসা, নিষ্ঠুরতা আর নীরব আর্তনাদ একসঙ্গে হাঁটে। চলবে............