ঢাকা, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ১১:২৬:০৭ PM

ঢাকা-৮ আসন ঘিরে উত্তেজনা চরমে

মান্নান মারুফ
28-01-2026 09:47:01 PM
ঢাকা-৮ আসন ঘিরে উত্তেজনা চরমে

 আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে ছোটখাটো সংঘর্ষ, উত্তেজনা ও রাজনৈতিক বাক্‌বিতণ্ডনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এমন ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়; প্রায় প্রতিটি নির্বাচনকালেই কমবেশি উত্তেজনা দেখা যায়। তবে চলমান নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় রাজধানীর ঢাকা-৮ সংসদীয় আসন ঘিরে যে মাত্রার উত্তেজনা, সহিংস বক্তব্য এবং পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেখা যাচ্ছে, তা অন্যান্য আসনের তুলনায় আলাদা করে নজর কাড়ছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা মতিঝিল, কাকরাইল, শান্তিনগরসহ আশপাশের অঞ্চল নিয়ে গঠিত ঢাকা-৮ আসন এমনিতেই রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় রাজনৈতিক কর্মসূচি মানেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়া। এবারের নির্বাচনে সেই প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

নির্বাচন শুরুর আগেই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড

নির্বাচনের প্রাথমিক পর্যায়েই ঢাকা-৮ আসনে ঘটে যায় একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা। জুলাই অভ্যুত্থানের নায়ক হিসেবে পরিচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী ওসমান বিন হাদি গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ড পুরো নির্বাচনি পরিবেশে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে। স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয় নানা আলোচনা ও জল্পনা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন প্রার্থীর এমনভাবে নিহত হওয়া শুধু একটি অপরাধমূলক ঘটনা নয়; বরং এটি নির্বাচনি পরিবেশকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। ঢাকা-৮ আসনের রাজনীতি এই ঘটনার পর থেকেই আরও সংবেদনশীল ও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর প্রার্থিতা ও বিতর্ক

ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর পর ঢাকা-৮ আসনে প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আসেন ১০ দলীয় জোটভুক্ত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী। প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই তার বক্তব্য ও রাজনৈতিক ভাষা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ ওঠে, তার আক্রমণাত্মক কথাবার্তা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য এলাকায় উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলছে।

এই সময়ের মধ্যেই শুরু হয় ডিম নিক্ষেপের মতো অপ্রীতিকর ঘটনা, যা নির্বাচনি প্রচারণাকে আরও বিতর্কিত করে তোলে।

একের পর এক ডিম নিক্ষেপের ঘটনা

প্রথমে মতিঝিল কলোনি এলাকায় ওসমান বিন হাদির ওপর পচা পানি ও ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। এরপর ভোট চাইতে গিয়ে মতিঝিল এলাকায় ডিমের হামলার শিকার হন এনসিপি প্রার্থী নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী। তার সমর্থকদের দাবি, এটি ছিল পরিকল্পিত হামলা।

এরপর মঙ্গলবার নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময়ের জন্য গেলে সেখানেও ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে বলে তার পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। বিষয়টি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়।

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজের শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করেন। তারা বলেন, ডিম নিক্ষেপের ঘটনায় শিক্ষার্থীরা জড়িত নন। বরং তাদের দাবি, এনসিপির কিছু কর্মীই এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। শিক্ষার্থীদের এই বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে এবং ঘটনাটিকে ঘিরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।

পাল্টাপাল্টি মিছিল ও জনজীবনে প্রভাব

ডিম নিক্ষেপের এসব ঘটনার পর ঢাকা-৮ আসনসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা আরও বাড়তে থাকে। মঙ্গলবার বিকেল ও সন্ধ্যার দিকে কাকরাইল, শান্তিনগরসহ আশপাশের এলাকায় মিছিল ও পাল্টা মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে পুরো এলাকা কিছু সময়ের জন্য কার্যত প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হঠাৎ মিছিল, স্লোগান ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হননি। রাস্তায় যান চলাচলও স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যায়। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তাদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এনসিপির অভিযোগ ও বিএনপির পাল্টা প্রতিক্রিয়া

এই পরিস্থিতিতে এনসিপির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে ডিম নিক্ষেপ ও সাম্প্রতিক উত্তেজনার জন্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দায়ী করে বক্তব্য দেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন, পরিকল্পিতভাবে তাদের প্রার্থীকে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং নির্বাচনি মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমাদের প্রার্থীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও রাজনৈতিকভাবে দমন করার জন্য একটি মহল ধারাবাহিকভাবে হামলা ও অপপ্রচার চালাচ্ছে।”

এনসিপির এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানায় বিএনপি। বুধবার মির্জা আব্বাসের সমর্থক ও বিএনপির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। তারা এনসিপির অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও রাজনৈতিক নাটক’ বলে আখ্যা দেন।

বিএনপির পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগ করে বলা হয়, মঙ্গলবারের উত্তেজনাকর ঘটনার জন্য নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী নিজেই দায়ী। তাদের দাবি, তার উসকানিমূলক বক্তব্য ও আচরণ পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে এবং সেটিই সংঘাতের মূল কারণ।

সাধারণ মানুষের উদ্বেগ

ঢাকা-৮ আসনের সাধারণ বাসিন্দারা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও দোষারোপে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন তারা। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমরা রাজনীতি বুঝি বা না বুঝি, কিন্তু রাস্তায় বের হতে ভয় লাগে—এটাই বাস্তবতা।”

অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এ ধরনের উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে নির্বাচনের দিন ভোটার উপস্থিতি কমে যেতে পারে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতামত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা-৮ আসনের ঘটনাপ্রবাহ শুধু একটি আসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সার্বিক নির্বাচনি পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে যদি উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে তার প্রভাব অন্য এলাকাতেও পড়তে পারে।

তারা মনে করেন, পরিস্থিতি শান্ত রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সংযম, দায়িত্বশীল বক্তব্য এবং সহনশীল আচরণ অত্যন্ত জরুরি। 

সব মিলিয়ে ঢাকা-৮ আসনকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা, ডিম নিক্ষেপের ঘটনা, পাল্টাপাল্টি মিছিল এবং রাজনৈতিক দোষারোপ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য ইতিবাচক নয়।

এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও রাজনৈতিক দলগুলো কতটা দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখে এবং শেষ পর্যন্ত ঢাকা-৮ আসনে একটি শান্তিপূর্ণ, সহিংসতামুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা যায় কি না। ভোটাররাও প্রত্যাশা করছেন—সব উত্তেজনার ঊর্ধ্বে উঠে তারা যেন নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পান।