ঢাকা, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ১১:২৫:১২ PM

ঢাকা-১২”তে ‘তিন সাইফুলের’ লড়াই,বিভ্রান্ত ভোটার

মান্নান মারুফ
28-01-2026 09:42:30 PM
ঢাকা-১২”তে ‘তিন সাইফুলের’ লড়াই,বিভ্রান্ত ভোটার

রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, হাতিরঝিল, শেরে বাংলানগর ও রমনা থানার একাধিক এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১২ সংসদীয় আসন। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয় এই আসনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় রাজনৈতিকভাবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কারওয়ান বাজারও এই আসনের অংশ। ফলে রাজধানীর এই গুরুত্বপূর্ণ আসনের দিকে বাড়তি নজর রয়েছে দেশবাসীর।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশের মতো ঢাকা-১২ আসনেও জমে উঠেছে প্রচার-প্রচারণা। তবে অন্যান্য আসনের তুলনায় ভিন্ন এক কারণে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে এই আসন। এখানে প্রধান তিন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নামই ‘সাইফুল’। এ কারণে স্থানীয়দের মধ্যে যেমন কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তেমনি দেখা দিয়েছে বিভ্রান্তিও। কেউ কেউ রসিকতা করে বলছেন—এই আসনের ফলাফল তো আগেই নির্ধারিত, ‘সাইফুলই’ হচ্ছেন পরবর্তী সংসদ সদস্য।

এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ২৮ হাজার ৮৩০ জন। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ভোটারের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি এখানে উল্লেখযোগ্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যে প্রার্থী ভোটারদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হবেন, তিনিই এগিয়ে থাকবেন।

কে কোন প্রতীকে লড়ছেন

ঢাকা-১২ আসনে সবচেয়ে আলোচিত তিন প্রার্থী হলেন—স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব, বিএনপি জোট সমর্থিত বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. সাইফুল আলম।

বিএনপির ঢাকা উত্তর শাখার আহ্বায়ক থাকা সাইফুল আলম নীরব দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন। তবে দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও স্থানীয় বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মী তার পক্ষেই মাঠে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তিনি ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন।

অন্যদিকে, বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক কোদাল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি উন্নয়ন ও ধারাবাহিকতার কথা তুলে ধরে ভোটারদের সমর্থন চাইছেন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. সাইফুল আলম দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির কথা তুলে ধরে তিনি পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছেন।

এই তিনজন ছাড়াও মাঠে রয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন প্রার্থী। কমিউনিস্ট পার্টির কল্লোল বণিক (কাস্তে), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মোহাম্মাদ শাহজালাল (মোমবাতি), জাতীয় পার্টির সরকার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাহমুদুল হাসান (হাতপাখা), গণঅধিকার পরিষদের আবুল বাশার চৌধুরী (ট্রাক)সহ মোট সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রার্থী এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সারাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী লড়ছেন বলেও পরিচিতি পেয়েছে আসনটি।

ভোটারদের বিভ্রান্তি ও প্রত্যাশা

তেজগাঁও তেজতুরী পাড়া এলাকার বাসিন্দা আহমেদ আলী বলেন, “গত কয়েকদিন ধরে প্রার্থীদের মাইকিং ও মিছিলের কারণে আমরা বিভ্রান্ত হচ্ছি। যখন বলা হয় ‘সাইফুল ভাইকে ভোট দিন’, তখন বুঝতে পারি না কোন সাইফুলকে বলা হচ্ছে। মার্কার কথা বলা হলেও সব সময় মনে রাখা সম্ভব হয় না।”

একই অভিযোগ করেন রহমান উদ্দিন নামের আরেক ভোটার। তিনি বলেন, “তিনজন প্রার্থীর নাম একই হওয়ায় কে কোন প্রতীক নিয়ে দাঁড়িয়েছেন, তা মনে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এতে অনেক ভোটার বিভ্রান্তিতে পড়ছেন।”

আগারগাঁও শেরে বাংলানগর এলাকার বাসিন্দা সবুর মিয়া জানান, তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরবের পক্ষেই রয়েছেন। তার ভাষায়, “তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বিএনপির রাজনীতি টিকিয়ে রেখেছেন। সুখে-দুঃখে পাশে ছিলেন। আমরা তাকেই ভোট দেব।”

হাতিরঝিল এলাকার বাসিন্দা গফুর মিয়া বলেন, “ধানের শীষ না থাকায় বিএনপির প্রকৃত প্রার্থী কে, তা বোঝা কঠিন। আমরা চাই একজন ভালো মানুষ নির্বাচিত হোক, যিনি আমাদের পাশে থাকবেন।”

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জোটপ্রার্থী সাইফুল হক এলাকায় তেমন পরিচিত নন। স্থানীয় বিএনপির বড় অংশ তার সঙ্গে নেই। পাশাপাশি তার দলের প্রতীকও তুলনামূলকভাবে অপরিচিত হওয়ায় তিনি প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছেন না। ফলে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব ও জামায়াত প্রার্থী মো. সাইফুল আলমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।

প্রার্থীদের বক্তব্য

ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা সাইফুল আলম নীরব বলেন, “আমি শতভাগ আশাবাদী বিপুল ভোটে জয়লাভ করব ইনশাআল্লাহ। মাঠে গিয়ে ভোটারদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি। নির্বাচিত হলে চাঁদাবাজি বন্ধ করব, মাদক নির্মূলে কাজ করব এবং শিক্ষার হার বাড়াতে উদ্যোগ নেব।”

জামায়াত প্রার্থী মো. সাইফুল আলম বলেন, “এবার একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে। ভোটাররা দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিয়ে আমাকে জয়ী করবেন। চাঁদাবাজি ও মাদক পুরোপুরি নির্মূল করে ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়তে চাই।”

বিএনপি জোটের প্রার্থী সাইফুল হক বলেন, “এটি একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন। আমি শতভাগ বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। নির্বাচিত হলে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানসহ শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করব।”

সব মিলিয়ে রাজধানীর এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে ‘তিন সাইফুলের’ লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।

 

শেষ পৃষ্টায় তিন কলামে ছবিসহ

 

ধৈর্য ধরুন,চক্রান্তে পা দেবেন না: নেতাকর্মীদের মির্জা আব্বাস

 
স্টাফ রিপোটার।। ঢাকা-৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস নির্বাচনের সময় নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, উসকানিমূলক পরিস্থিতিতে শান্ত থাকবেন। বিজয় আমাদের দ্বারপ্রান্তে, ইনশাআল্লাহ। কয়েক দিন ধৈর্য ধরুন এবং কোনো চক্রান্তের ফাঁদে পা দেবেন না।

বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানীর ব্রাদার্স ক্লাব মাঠে ধানের শীষের পক্ষে গণ মিছিলপূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। গণমিছিলটি ব্রাদার্স ক্লাব মাঠের সামনে থেকে শুরু হয়ে ঢাকা ৮ আসনের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসে শেষ হয়। রাতে তিনি মগবাজার সেঞ্চুরী আর্কেড এভিনিউ সোসাইটির ভোটারদের সাথে নির্বাচনী আলোচনা, মতবিনিময় সভা ও গণসংযোগ করবেন।মির্জা আব্বাস বলেন, “নির্বাচন আদায়ের জন্য বাংলাদেশের জনগণ গত ১৭ বছর লড়াই করেছে। বিএনপির বহু নেতাকর্মী আত্মাহুতি দিয়েছে, সিনিয়র নেতারাও শাহাদাত বরণ করেছেন। দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ভুক্তভোগী হয়েছে। গণতান্ত্রিক অধিকার ছিল না। এটি আমরা আন্দোলন করে অর্জন করেছি। অনেকেই বলেন সাত দিন আন্দোলন করে শেখ হাসিনাকে পরাস্ত করা হয়েছে। কিন্তু ভুলবেন না, এই ১৭ বছরে দেশের জনগণ যে ত্যাগ করেছেন, যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার বিনিময়ে আজকের গণতন্ত্রের অধিকার আমরা অর্জন করেছি।

তিনি দেশের মানুষের জন্য বেগম খালেদা জিয়ার সংগ্রাম স্মরণ করে বলেন, আপনাদের স্মরণ রাখতে হবে, বেগম খালেদা জিয়া সংগ্রাম করেছেন এবং জীবন দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের জন্য লড়াই করেছেন। সেই কথা স্মরণ করে আমাদের আগামী দিনের পথ চলতে হবে। আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

মির্জা আব্বাস সতর্ক করে বলেন, আজকের নির্বাচন বানচাল করার জন্য কিছু চক্রান্ত চলছে। নির্বাচন থেকে জনগণকে অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিএনপি বহু নির্বাচনে অংশ নিয়েও কোনো প্রতিপক্ষের ওপর হামলা ঘটায়নি। আমরা সবসময় উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন করেছি। আজও আমাদের নেতাকর্মীরা অত্যন্ত শান্ত এবং নীরব ভূমিকা পালন করছে।

তিনি আরও বলেন, যে দলটির কোনো নির্বাচনের অভিজ্ঞতা নেই, যারা জীবনে দেশের জনগণের জন্য কাজ করেনি, তারা বিএনপিকে অপদস্ত করার চেষ্টা করছে। তাদের কাছে নিজেদের বলার কিছু নেই। তারা শুধু বিএনপির বিরুদ্ধে কথা বলাই তাদের কাজ মনে করে। তাদের উদ্দেশ্য হলো দেশের জনগণকে চিরতরে উপেক্ষিত রাখা। তবে দেশের স্বার্থ রক্ষায় একমাত্র দল হলো বিএনপি। মির্জা আব্বাস নেতাকর্মীদের অনুরোধ জানিয়ে বলেন, কোনো উসকানিমূলক কথাবার্তা বা কাজে জড়াবেন না। বিজয় আমাদের, ইনশাআল্লাহ। কয়েক দিন ধৈর্য ধরুন। নির্বাচনের পরে দেশের শান্তি বজায় রাখতে আমাদের এবং জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে। নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি দেশের শান্তি বজায় রাখতে চায়। আমাদের লক্ষ্য দেশের মানুষকে শান্তি এবং হাসি ফিরিয়ে দেওয়া।

তিনি বলেন, বিএনপি কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে ঝগড়া বা ফ্যাসাদ করতে চায় না। আমরা দেশের মানুষকে শান্তি দিতে চাই। যারা চক্রান্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আমরা রুখে দাঁড়াতে পারি। তবে, এখন প্রমাণ দেখানোর সময় নয়। নির্বাচনের পরে দেশকে শান্ত রাখতে আমরা সকল চেষ্টা করব।

তিনি শেখ সাদীর কবিতার লাইন ‘বে-আদব বে-নসিব, বা-আদব বা-নসিব’ স্মরণ করিয়ে দেন এবং বলেন, আজকের প্রজন্মকেও শ্রদ্ধা এবং আদব শিখতে হবে। আমি আমার সন্তান তুল্য যারা আজকে আমার সঙ্গে কথা বলেন, তাদের উদ্দেশ্যেই এই উপদেশমূলক কবিতার লাইন পাঠালাম।

তিনি বলেন, ছোট বেলায় আমি সব দলকে সম্মান করেছি। আজও চাই, নেতাকর্মীরা শান্তি বজায় রাখুক। বিএনপির কর্মীরা সুশৃঙ্খল এবং চক্রান্তবাদী নয়। দেশের মানুষকে শান্তি দিতে হলে আমাদের সতর্ক থাকা দরকার।