প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই সংবেদনশীল সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক।সোমবার (২৬ জানুয়ারি) রাজধানীর সেনাসদরের হেলমেট অডিটোরিয়ামে তিন বাহিনীর প্রধানসহ সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। সভা শেষে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এ তথ্য জানান।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী অতীতের মতো এবারও পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে—এ বিষয়ে সরকার আশাবাদী। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা জাতির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। জনগণের জানমাল রক্ষা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সশস্ত্র বাহিনী যে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে, তা দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথকে সুগম করেছে।
তিনি বলেন, গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘদিন ভোটাধিকারবঞ্চিত একটি জাতি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে নিজের দেশের দায়িত্ব গ্রহণের যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, এই নির্বাচনে ভোটদান হবে তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যেমন ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণে মতামত দেবে, তেমনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সেই মতামত বাস্তবায়নের জন্য যোগ্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবে।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, এবারের নির্বাচনে তরুণদের একটি বড় অংশ প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছে। পাশাপাশি বহু নাগরিক দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এ ধরনের বাস্তবতায় প্রতিটি ভোটারের জন্য শঙ্কামুক্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে এই দায়িত্ব পালনে সশস্ত্র বাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, মাঠপর্যায়ে গৃহীত প্রতিটি সিদ্ধান্ত হতে হবে আইনসম্মত, সংযত ও দায়িত্বশীল। সামান্য কোনো বিচ্যুতিও যেন জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন না করে—সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, প্রতিটি নাগরিক যেন ভয়মুক্ত পরিবেশে, কোনো প্রকার প্রভাব বা চাপ ছাড়াই নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহায়তা দিতে হবে। তরুণ এবং দীর্ঘদিন ভোটাধিকারবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণে এবারের নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনামলে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা ও পেশাদার উন্নয়ন উপেক্ষিত ছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যেই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই অবস্থার পরিবর্তন সূচনা করেছে। সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যে কোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় যুগোপযোগী বাহিনী গড়ে তোলা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
তিনি জানান, সশস্ত্র বাহিনীর স্বনির্ভরতা বাড়াতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম উৎপাদনের জন্য কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি নেদারল্যান্ডস ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ইতালি, জাপান, থাইল্যান্ডসহ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে অনুরূপ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা ও আভিযানিক দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এর আগে সেনাসদরের হেলমেট অডিটোরিয়ামে আয়োজিত সভাস্থলে পৌঁছালে প্রধান উপদেষ্টাকে অভ্যর্থনা জানান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসান। মতবিনিময় সভায় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।