ঢাকা, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:০৬:৫৬ AM

গল্প"'নিঃশব্দ চিৎকার"

মান্নান মারুফ
10-06-2026 12:06:56 AM
গল্প"'নিঃশব্দ চিৎকার"

পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে অর্ধেক আছে পুরুষ। কিন্তু তাদের মধ্যে সত্যিকার অর্থে জীবিত পুরুষ একজনও নেই। দুঃখ, কষ্ট, একাকীত্ব আর অবহেলায় তারা এমনভাবে আক্রান্ত, যেন গলাকাটা মুরগির মতো নিঃশব্দে চিৎকার করে। হয়তো তাদের প্রাণ আছে, শ্বাসও চলে। কিন্তু এইভাবে বেঁচে থাকাকে আসলে জীবিত থাকা বলে না।
এ কথাগুলো একদিন ডায়েরির পাতায় লিখেছিল রায়হান। গভীর রাত ছিল। জানালার ওপারে বৃষ্টি পড়ছিল টুপটাপ শব্দে। শহরের বাতিগুলো কুয়াশা আর জলের পর্দার আড়ালে ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। চারদিকে এত মানুষ, এত শব্দ, এত জীবন—তবু তার কাছে পৃথিবীটা ছিল এক বিশাল নির্জন দ্বীপ।
রায়হানের বয়স চল্লিশ ছুঁইছুঁই। ছোটবেলায় তার অনেক স্বপ্ন ছিল। সে ভাবত বড় হয়ে একজন ভালো মানুষ হবে, নিজের পরিবারকে সুখে রাখবে, মায়ের মুখে হাসি ফোটাবে, স্ত্রীকে ভালোবাসবে, সন্তানদের জন্য পৃথিবীটাকে সুন্দর করে তুলবে। কিন্তু জীবন তার জন্য অন্য এক গল্প লিখে রেখেছিল।
বাবা মারা যান যখন তার বয়স মাত্র ষোলো। সেদিনের পর থেকে সে আর কিশোর থাকেনি। এক মুহূর্তেই বড় হয়ে যেতে হয়েছিল তাকে। কলেজের বইয়ের বদলে হাতে তুলে নিতে হয়েছিল দায়িত্বের ভার। সকালে পড়াশোনা, বিকেলে দোকানে কাজ, রাতে টিউশনি—এই ছিল তার জীবন।
মা মাঝে মাঝে বলতেন, “বাবা, তুই একটু বিশ্রাম নে।”
রায়হান হেসে উত্তর দিত, “বিশ্রাম করার সময় কোথায়, মা?”
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকত ক্লান্তির পাহাড়।
বছরের পর বছর কেটে গেল। সে সংসারকে আগলে রাখল, ছোট ভাইবোনদের পড়াশোনা করাল, তাদের বিয়ে দিল। সবাই একসময় নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। কিন্তু রায়হানের জীবনে যেন কোনো নতুন সকাল এল না।
একদিন তার বিয়ে হলো। সে ভেবেছিল এবার হয়তো জীবনের শূন্যতা কিছুটা কমবে। মানুষ তো ভালোবাসার জন্যই বাঁচে। কারও কাছে নিজের কষ্টের কথা বলতে পারা, দিনের শেষে কারও কাঁধে মাথা রাখা—এসবই তো জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
কিন্তু আশ্রয় সব সময় আশ্রয় হয়ে ওঠে না।
তার স্ত্রী ভালো মানুষ ছিলেন, কিন্তু কখনোই রায়হানের মনের গভীরে পৌঁছাতে পারেননি। সংসারের হিসাব, বাজারের তালিকা, সন্তানের স্কুল—সবকিছুর ভিড়ে রায়হানের ভাঙাচোরা মনটা কোথাও হারিয়ে গেল।
ধীরে ধীরে সে শিখে গেল নিজের কষ্ট নিজের ভেতর লুকিয়ে রাখতে।
পুরুষদের কাঁদতে নেই—সমাজ তাকে এই শিক্ষাই দিয়েছিল।
তাই যখন খুব কষ্ট হতো, সে রাত জেগে ছাদের কোণে বসে থাকত। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবত, একজন মানুষ কতটা একা হতে পারে?
একবার অফিস থেকে ফেরার পথে তার দুর্ঘটনা হয়েছিল। মাথায় আঘাত লেগে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। সেদিন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সে প্রথমবার অনুভব করেছিল, মানুষ আসলে কতটা অসহায়।
অনেকেই দেখতে এসেছিল। কেউ ফল নিয়ে এসেছে, কেউ ফুল। সবাই বলেছে, “শিগগির সুস্থ হয়ে উঠবেন।”
কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করেনি, “তোমার মন কেমন আছে?”
সেই প্রশ্নটাই সে সারাজীবন শুনতে চেয়েছিল।
সুস্থ হয়ে আবার কাজে ফিরল। দিন চলতে লাগল আগের মতোই। অফিস, সংসার, দায়িত্ব, হিসাব—সবকিছু ঠিকঠাক। বাইরে থেকে তাকে দেখে মনে হতো সে খুব স্বাভাবিক একজন মানুষ।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছিল।
তার ছেলে একদিন বলেছিল, “বাবা, তুমি এত চুপচাপ কেন?”
রায়হান উত্তর দিতে পারেনি।
কারণ সে নিজেও জানত না, কখন তার ভেতরের শব্দগুলো হারিয়ে গেছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার চারপাশের মানুষ বেড়েছে, কিন্তু আপন মানুষ কমেছে। বন্ধুরা নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। ভাইবোনদের সঙ্গে যোগাযোগ উৎসবের শুভেচ্ছায় সীমাবদ্ধ। স্ত্রী সংসারের কাজে ক্লান্ত। সন্তানরা বড় হয়ে নিজেদের পৃথিবী বানিয়ে নিয়েছে।
রায়হান প্রায়ই অনুভব করত, সে যেন একটা পুরোনো দরজার মতো—যার প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু ভেঙে ফেলাও হয়নি।
এক শীতের রাতে সে গ্রামের বাড়িতে গেল। বহু বছর পর। উঠোনে দাঁড়িয়ে সে সেই আমগাছটার দিকে তাকিয়ে রইল, যার নিচে বসে একসময় স্বপ্ন দেখত।
মায়ের কবরের পাশে বসে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর ফিসফিস করে বলল,
“মা, আমি খুব ক্লান্ত।”
বাতাস ছাড়া আর কেউ উত্তর দিল না।
সেদিন তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়েছিল। হয়তো বহু বছরের জমে থাকা কান্না একসঙ্গে বেরিয়ে এসেছিল।
মানুষ ভাবে পুরুষেরা শক্ত।
কিন্তু শক্ত মানুষদেরও তো ব্যথা লাগে।
তাদেরও স্বপ্ন ভাঙে।
তাদেরও বুকের ভেতর শূন্যতা জন্মায়।
তাদেরও একা লাগে।
পার্থক্য শুধু এই যে, তাদের কান্নার শব্দ কেউ শুনতে পায় না।
রায়হানের জীবনও এমনই এক নিঃশব্দ কান্নার গল্প।
একদিন অফিস থেকে ফিরে সে পুরোনো ডায়েরিগুলো বের করল। পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে। সেখানে ছড়িয়ে আছে তার তরুণ বয়সের স্বপ্ন, ভালোবাসা, আশা আর বিশ্বাস।
একটি পাতায় লেখা ছিল—
“একদিন আমি খুব সুখী হব।”
লেখাটা পড়ে সে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর মৃদু হাসল।
কত অদ্ভুত! মানুষ ভবিষ্যৎকে কত সহজভাবে কল্পনা করে।
কিন্তু জীবন কখনো কখনো সেই কল্পনার বিপরীত পথে হাঁটে।
রাত বাড়ছিল।
জানালার বাইরে চাঁদের আলো পড়েছিল।
রায়হান অনুভব করল, তার জীবনটা যেন এক দীর্ঘ নদী। নদীটি অনেক পথ পেরিয়েছে—ঝড়, বন্যা, খরা, ভাঙন সবকিছু সহ্য করেছে। কিন্তু কোথাও গিয়ে আর সমুদ্র খুঁজে পায়নি।
তবু সে জানত, পরদিন আবার সূর্য উঠবে।
আবার তাকে অফিসে যেতে হবে।
আবার সংসারের খরচ মেটাতে হবে।
আবার সবার সামনে হাসতে হবে।
কারণ সমাজ ভাঙা পুরুষকে দেখতে চায় না।
সমাজ শুধু তার দায়িত্ব দেখতে চায়।
তার ক্লান্তি নয়।
তার চোখের জল নয়।
তার একাকীত্ব নয়।
সেদিন গভীর রাতে ডায়েরির শেষ পাতায় সে লিখল—
“আমি জানি, আমার গল্প পৃথিবীর লাখো পুরুষের গল্প। আমরা বেঁচে আছি, কিন্তু আমাদের ভেতরের অনেক কিছুই বহু আগেই মরে গেছে। আমরা প্রতিদিন হাসি, কাজ করি, দায়িত্ব পালন করি। কিন্তু কেউ জানে না, আমাদের বুকের ভেতর কত অন্ধকার জমে আছে। আমরা গলাকাটা মুরগির মতো নিঃশব্দে চিৎকার করি। আমাদের কান্নার কোনো শব্দ নেই, আমাদের কষ্টের কোনো ভাষা নেই। তবু আমরা বেঁচে থাকি—কারণ আমাদের বেঁচে থাকাটা আমাদের নিজের জন্য নয়, অন্যদের জন্য।”
লেখা শেষ করে সে কলম নামিয়ে রাখল।
জানালার বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম আভা দেখা যাচ্ছে।
রায়হান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার জীবনের দুঃখ শেষ হয়নি, কষ্টও কমেনি। একাকীত্ব এখনও তার নিত্যসঙ্গী। তবু সে জানত, জীবন থেমে থাকে না।
কিছু মানুষ সুখ নিয়ে বাঁচে।
কিছু মানুষ স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে।
আর কিছু মানুষ শুধু দায়িত্ব নিয়ে বাঁচে।
রায়হান ছিল সেই শেষ দলের একজন।
যে মানুষটি সারাজীবন অন্যদের জন্য আলো জ্বালাতে জ্বালাতে নিজের ভেতরের প্রদীপ নিভে যেতে দেখেছে।
যে মানুষটি শত মানুষের ভিড়ে থেকেও একা ছিল।
যে মানুষটি প্রতিদিন বেঁচে থেকেও আসলে একটু একটু করে মরে গেছে।
আর পৃথিবীর অসংখ্য নিঃশব্দ পুরুষের মতো সেও শেষ পর্যন্ত নিজের কষ্টকে বুকে চাপা দিয়ে হেঁটে গেছে জীবনের দীর্ঘ, নির্জন, কুয়াশায় ঢাকা পথে—যেখানে কান্নার কোনো শব্দ নেই, অভিযোগের কোনো ভাষা নেই, আছে শুধু এক গভীর নীরবতা; এমন এক নীরবতা, যা মানুষের হৃদয় ভেঙে দেয়, অথচ বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যায় না। 

সমাপ্ত।।