প্রত্যাখ্যানের দেয়াল
জামিনের দিনটা সুর্বনার কাছে উৎসবের মতো ছিল না, ছিল মৃত্যুদণ্ড স্থগিত থাকার শেষ আশাটুকু। ভোর থেকেই তার বুকের ভেতর ধকধক করছিল। পেটের ভেতর অনাগত শিশুটাও যেন অস্থির হয়ে উঠেছিল—বারবার নড়ে উঠছিল, যেন সে-ও বুঝে গেছে কিছু একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ঘটতে যাচ্ছে।
কোর্টের করিডোরে দাঁড়িয়ে সুর্বনা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ছিল। দেয়ালে টাঙানো পুরোনো ঘড়িটার কাঁটা এগোচ্ছিল, কিন্তু সময় যেন এগোচ্ছিল না। আইনজীবী এসে শুধু বললেন, “দোয়া করেন।” এই দোয়াই তখন তার শেষ সম্বল।
ভেতরে বসে কুদ্দুছও অপেক্ষা করছিল। লোহার শিকের ফাঁক দিয়ে আলো পড়ছিল তার মুখে। কতবার যে সে এই মুহূর্তটা কল্পনা করেছে—একটা জামিন, একটা নিঃশ্বাসের ছাড়। কিন্তু ভাগ্য যেন প্রতিবারই নতুন কাগজ বের করে।
রায় এলো সংক্ষিপ্ত ভাষায়—জামিন নামঞ্জুর।
শব্দটা সুর্বনার কানে ঢুকে মাথার ভেতর আছড়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, মেঝে থেকে আকাশ—সব একসঙ্গে ঘুরে গেল। আইনজীবী ফিসফিস করে বললেন, “আরেকটা মামলা দিয়েছে।”
আরেকটা মামলা।
একটায় জামিন পেলে আরেকটা। যেন ইচ্ছা করেই কেউ ফটকের সামনে নতুন দেয়াল তুলে দিচ্ছে। কুদ্দুছ আর বের হতে পারবে কিনা—এই প্রশ্নটা আর প্রশ্ন রইল না, রূপ নিল প্রায় অসম্ভব এক বাস্তবতায়।
জেলে ফিরে কুদ্দুছ চুপ করে বসে রইল। সহবন্দিরা কেউ কেউ সান্ত্বনা দিল, কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রাজনীতির পথটা যে কতটা নিষ্ঠুর, তা সে জানত। তবু নিজের জীবনে এই নিষ্ঠুরতা এমন করে গিলে ধরবে—তা সে ভাবেনি। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সুর্বনার মুখ, তার গোল হয়ে ওঠা পেট, অনাগত সন্তানের অচেনা ভবিষ্যৎ।
আর সুর্বনা?
সে ফিরল বাসায়—একাই। দরজা খুলতেই মনে হলো, ঘরটা আরও ছোট হয়ে গেছে। বাতাস ভারী। প্রতিবেশির এক নারী ফিসফিস করে আরেকজনকে বলল, “ওই যে বন্দি নেতার বউ।” শব্দটা কানে এল, বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে রইল।
আত্মীয়রা ফোন ধরতে শুরু করল কম। কেউ কেউ সরাসরি বলেই দিল, “এত ঝামেলায় আমরা জড়াতে পারবো না।” ভাইয়েরা আলাদা থাকে—তাদের সংসারে জায়গা নেই, ধৈর্যও নেই। সুর্বনা বুঝে গেল, রক্তের সম্পর্কও পরিস্থিতির কাছে হেরে যায়।
দিনের পর দিন তার নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হয়ে এল। পেটের দায়ে দু’মুঠো ভাত খেত, কিন্তু গলায় নামত না। মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন—আমি কী করবো?
সন্তান জন্ম দেওয়ার তারিখ এগিয়ে আসছে। হাসপাতাল, ওষুধ, খরচ—সব হিসাব একেকটা পাহাড়। কুদ্দুছকে চিঠি লিখতে বসে সে বারবার কলম থামিয়ে দিত। কী লিখবে? নিজের অসহায়তার কথা? নাকি সমাজের নির্মম মন্তব্যগুলো?
শেষ পর্যন্ত সে লিখত—“আমি ঠিক আছি।”
এই মিথ্যেটুকুই যেন তাদের দুজনকে বাঁচিয়ে রাখছিল।
রাতে সুর্বনা ঘুমোতে পারত না। পেটের ওপর হাত রেখে শিশুর সঙ্গে কথা বলত। বলত, “তোর বাবা ভালো মানুষ।” কিন্তু তার নিজের কণ্ঠই তাকে বিশ্বাস করাতে পারত না।
জেলের ভেতর কুদ্দুছ দিন গুনত। প্রতিটা দিন যেন একটা করে অপরাধের শাস্তি। জামিনের কাগজের বদলে হাতে আসত নতুন মামলার খবর। সে বুঝতে পারছিল—এই কারাফটক তার সামনে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আর সেই বন্ধ দরজার আঘাত গিয়ে পড়ছে সুর্বনার জীবনে।
সমাজ তখন নিজের রায় দিয়ে ফেলেছে। কারও কাছে কুদ্দুছ অপরাধী, কারও কাছে ঝামেলার নাম। আর সুর্বনা—সে যেন সেই অপরাধের জীবন্ত প্রমাণ।
একজন কারাগারের ভেতর, একজন সমাজের কারাগারে। সামনে অপেক্ষা করছে এমন এক পথ, যেখানে ভালোবাসা, নিষ্ঠুরতা আর নীরব আর্তনাদ একসঙ্গে হাঁটে। চলবে............