ঢাকা, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:৪৫:১৭ PM

কারাফটক, পর্ব–৯

মান্নান মারুফ
28-01-2026 03:14:05 PM
কারাফটক, পর্ব–৯

পর্ব–৯

কারাগারের ফটকে থেমে যাওয়া সময়

কুদ্দুছ কিছুই জানে না।

এই না–জানাটাই তার সবচেয়ে বড় অপরাধ নয়, কিন্তু সবচেয়ে বড় শাস্তি।
কারাগারের ভেতর সময় অন্যভাবে চলে। এখানে দিন আসে, যায়—কিন্তু খবর আসে না। বাইরের পৃথিবী যেন এক অদৃশ্য দেয়ালের ওপারে।

সুর্বনা আর নাফিজ—তারা কুদ্দুছকে ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছে।
এই বিদায়ের জন্য আয়োজন হয়েছে।
মানুষ বসেছে—আত্মীয়, প্রতিবেশী, পরিচিত-অপরিচিত।
সরকারি অনুমতি নেওয়া হয়েছে। নিয়ম মেনেই সবকিছু সম্পন্ন হয়েছে।

শুধু একজন নেই।

কুদ্দুছ।

যে মানুষটার জন্য এই সংসার ছিল, সেই মানুষটাই জানে না—তার সংসার আর নেই।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে, সুর্বনা ও শিশু নাফিজকে নেওয়া হয় কারাগারের ফটকের দিকে। নিয়ম আছে—বন্দি যদি চায়, শেষ দেখা দেওয়া যায়। ভেতরে খবর পাঠানো হয়।

খবরটা যখন কুদ্দুছের কাছে পৌঁছায়, তখনও সে কিছু জানে না।

শুধু জানে—
“তোমাকে গেটে ডাকা হয়েছে।”

এই একটা বাক্যেই কুদ্দুছের বুকের ভেতর আলো জ্বলে ওঠে।
এতদিন পর—হয়তো সুর্বনা এসেছে।
হয়তো সেই শিশুটাকেও কোলে নিয়ে এসেছে, যাকে সে জন্মের পর একবারও দেখতে পারেনি।

কষ্টের ভেতরেও আনন্দ হয়।
মানুষটা ভুলে যায়—জেলের খবর কখনো সুখের হয় না। তবু সে ভুলতে চায়। কারণ আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

নিরাপত্তার জালে ঘেরা কুদ্দুছকে ধীরে ধীরে নেওয়া হয় কারাগারের ফটকের দিকে। প্রতিটি পদক্ষেপে তার হৃদয় দ্রুত ধুকপুক করে। মনে মনে সে কী বলবে ভাবছে—

সুর্বনাকে দেখেই বলবে,
“তুমি কেমন আছো?”

শিশুটাকে কোলে নিয়ে বলবে,
“বাবা এসেছে।”

কারাগারের ফটক যত কাছে আসে, মানুষের শব্দ তত স্পষ্ট হয়।
একটা অদ্ভুত ভিড়।
স্বাভাবিক সাক্ষাতে এমন ভিড় হয় না।

কুদ্দুছ তখনও বোঝে না।

সে ফটকে এসে দাঁড়ায়।

আর ঠিক তখনই—

সময়ের চাকা থেমে যায়।

তার চোখের সামনে যা দাঁড়িয়ে থাকে, তা বোঝার জন্য শব্দ লাগে না।
কাপড়ে মোড়ানো দুটি নিথর অবয়ব।
একটা বড়—একটা খুব ছোট।

কুদ্দুছের মাথার ভেতর কিছু ভেঙে পড়ে।
কিন্তু কোনো শব্দ হয় না।

কেউ কিছু বলার আগেই সে বুঝে যায়।

এটা সাক্ষাৎ নয়।
এটা বিদায়।

কুদ্দুছ কাঁদে না।

এই মুহূর্তে কান্না তার নাগালের বাইরে।
সে পাথর হয়ে যায়।
চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ে—কিন্তু সেই পানিতে শব্দ নেই, আকুতি নেই।

সে তাকিয়ে থাকে।

যে নারীর জন্য সে প্রতিদিন এই কারাগারের দেয়ালে দিন গুনেছে—সে এখন শব্দহীন।
যে সন্তানের মুখ দেখার স্বপ্ন সে বুকের ভেতর আগলে রেখেছিল—সে এখন ঘুমন্ত।

চিরঘুম।

মানুষ চারপাশে দাঁড়িয়ে।
কেউ চোখ মুছছে।
কেউ নিচু স্বরে কথা বলছে।
কেউ আবার কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছে—যেন এটা কোনো দৃশ্য, কোনো প্রদর্শনী।

কুদ্দুছ কিছু শোনে না।

তার ভেতরে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা।
এই নীরবতা কান্নার চেয়েও ভারী।

কারাফটক—এই শব্দটা তার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে।

সে বুঝতে পারে—এই কারাফটক শুধু লোহার ফটক নয়।
এটা সেই দরজা, যেখান থেকে মানুষ আর ফিরে আসে না।
যেখান থেকে জীবনের একাংশ বাইরে থেকে ভেতরে ঢোকে, আর ভেতর থেকে কিছুই বেরোয় না।

কুদ্দুছ আজ সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে—
একদিকে কারাগার,
আরেকদিকে শূন্যতা।

সে হাত বাড়াতে চায়।
কিন্তু হাত থেমে যায়।
কিছু স্পর্শ করার অধিকারও যেন তার নেই।

এই দৃশ্য বেশিক্ষণ চলতে পারে না। নিয়ম আছে।
বন্দিকে ফিরিয়ে নিতে হয়।

কুদ্দুছকে ধীরে ধীরে সরিয়ে নেওয়া হয়।
সে পেছনে তাকায় না।
কারণ পেছনে তাকালে, সে ভেঙে পড়বে।

তার চোখ এখন পাথরের মতো স্থির।
এই পাথরত্বই তাকে বাঁচিয়ে রাখে—ভেঙে পড়া থেকে।

কারাগারের ভেতরে ফিরে আসে কুদ্দুছ।
সবকিছু আগের মতোই—দেয়াল, শিক, আলো।
কিন্তু কিছুই আগের মতো নেই।

এখন তার অপেক্ষা করার কেউ নেই।
কথা বলার কেউ নেই।
স্বপ্ন দেখার কেউ নেই।

কারাফটক বন্ধ হয়ে গেছে।

কিন্তু কোনো একদিন কুদ্দুছ ভাঙবে।
আজ সে পাথর।
কারণ সব পাথরের ভেতরেই আগুন থাকে।

আর এই আগুন একদিন প্রশ্ন করবে—
এই মৃত্যুর দায় কার?

চলবে............