পর্ব–৬ : অন্ধকারের কিনারায়
সুবর্ণা সেদিন অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ বসে ছিল।
ঘরের ভেতর অদ্ভুত এক নীরবতা—যেন বাতাসও কথা বলা ভুলে গেছে। কোলে নয় মাসের নাফিজ। শিশুটার নিঃশ্বাস উঠানামা করছে ধীরে ধীরে। এই ছোট্ট বুকের ওঠানামার শব্দই যেন পুরো ঘরটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
সুবর্ণার চোখ দুটো স্থির। কোথাও তাকিয়ে নেই, আবার সবকিছু দেখছে।
তার মনে হয়, পৃথিবীটা ভীষণ নিষ্ঠুর। এখানে কেউ কারও নয়—এই সত্যটা সে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। স্বামী জেলে যাওয়ার পর থেকে মানুষগুলো একে একে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আত্মীয়স্বজনের ভালোবাসা ছিল শর্তসাপেক্ষ, প্রতিবেশীদের সহানুভূতি ছিল সাময়িক।
অপবাদ—এই শব্দটা তার বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে আছে।
কেউ সরাসরি কিছু বলে না, কিন্তু চোখের ভাষা সব বলে দেয়। ফিসফাস, চাপা কথা, মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া—এসবই তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে দিচ্ছে।
সে ভাবে—এই কষ্ট কি কোনো দিন শেষ হবে?
এই দুশ্চিন্তা, এই অপমান, এই একা হয়ে যাওয়া—সবকিছু থেকে কি মুক্তি নেই?
নাফিজ ঘুমের মধ্যে হালকা করে নড়ে ওঠে। সুবর্ণা তাকে আরও শক্ত করে বুকে টেনে নেয়। এই শিশুটাই তার জীবনের একমাত্র সত্য। অথচ এই শিশুটার জন্যই তার ভয় সবচেয়ে বেশি।
“আমি যদি না থাকি, ওকে কে দেখবে?”
এই প্রশ্নটা আবার সঙ্গে সঙ্গেই আরেক প্রশ্নকে ডেকে আনে—
“আমি থাকলেই বা কী বদলাচ্ছে?”
এই দুই প্রশ্নের মাঝখানে সে আটকে যায়।
তার মনে হয়, সে যেন সারাক্ষণ মানুষের কাছে অপরাধী। স্বামীর অপরাধ, সমাজের চোখে তার অপরাধ। কেউ বোঝে না, সে নিজে কতটা ভেঙে পড়েছে। কেউ জানতে চায় না, সে কীভাবে দিন কাটাচ্ছে।
সুবর্ণা ভাবে—সব কষ্ট দূর করতে পারলে কেমন হতো।
মানুষের অপবাদ থেকে বাঁচতে পারলে কেমন হতো।
দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেলে কেমন হতো।
এই ভাবনাগুলোই তাকে এক ভয়ংকর সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়—একটা সিদ্ধান্ত, যেটা নিলে আর কাউকে কিছু প্রমাণ করতে হবে না। তখন আর কষ্ট থাকবে না। তখন আর আপনজনদের মুখ ফিরিয়ে নিতে হবে না। সব শেষ হয়ে যাবে—সহজ, নীরব, চিরস্থায়ী।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
নাফিজের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়।
ঠিক তখনই শিশুটার হাতটা হঠাৎ করে তার আঙুল আঁকড়ে ধরে। খুব শক্ত করে না—তবু এমনভাবে, যেন বলছে, থেকো।
এই ছোট্ট স্পর্শে সুবর্ণার বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ে। সে বুঝতে পারে, সে একা নয়—অন্তত এই শিশুটার কাছে নয়। এই পৃথিবী নিষ্ঠুর হতে পারে, মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে, কিন্তু এই ছোট্ট হাতটা তাকে ছাড়তে চায় না।
তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। এবার আর চেপে রাখে না।
সে কাঁদে—খুব কাঁদে।
এই কান্না দুর্বলতার নয়। এই কান্না জমে থাকা যন্ত্রণার, দীর্ঘদিনের চাপা আর্তনাদের। কাঁদতে কাঁদতে সে নিজেকেই প্রশ্ন করে—
“আমি যদি হাল ছেড়ে দিই, নাফিজ কী শিখবে?”
“আমি যদি চলে যাই, ও কি একদিন আমাকে খুঁজবে না?”
কারাফটকের কথা মনে পড়ে। লোহার গেট, বন্দি স্বামী, অপেক্ষার বছরগুলো। স্বামী হয়তো কোনো দিন ফিরবে না—এই আশঙ্কা তাকে ভয় দেখায়। কিন্তু এই আশঙ্কাই কি তার শেষ কথা?
সে ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে—জীবন ছেড়ে দেওয়া সহজ মনে হলেও, বেঁচে থাকাটাই আসলে সবচেয়ে কঠিন সাহসের কাজ।
সুবর্ণা সিদ্ধান্ত নেয়—সে আর পালাবে না।
এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর মুখোমুখি হবে। অপবাদ থাকলেও থাকবে, কষ্ট থাকলেও থাকবে—তবু সে বাঁচবে। নাফিজের জন্য, নিজের অস্তিত্বের জন্য।
সে জানে, পথটা কঠিন। একা মা হয়ে বাঁচা সহজ নয়। সমাজ তাকে সহজে গ্রহণ করবে না। তবু সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে—একদিন এই একই সমাজ তার দিকে তাকিয়ে মাথা নত করবে।
নাফিজকে বুকে নিয়ে সে ফিসফিস করে বলে,
“আমি থাকব। তোমার জন্যই থাকব।”
এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার নতুন জন্ম।
কারাফটক এখনও বন্ধ, সত্যি।
কিন্তু সুবর্ণার ভেতরে আজ একটু আলো ঢুকেছে—অল্প, খুব অল্প—তবু আলো।
আর সেই আলো নিয়েই সে আবার দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।
চলবে.......