ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০২:২৫:১০ PM

কারাফটক - পর্ব – ৫

মান্নান মারুফ
27-01-2026 12:25:40 PM
কারাফটক - পর্ব – ৫

পর্ব–৫ : নতজানু জীবন

ভালোবাসা সব সময় সুখ দেয় না—কখনো কখনো সে ভালোবাসাই মানুষের বুকের ভেতর ভারী পাথরের মতো চেপে বসে। সুবর্ণার জীবনে এখন ঠিক সেটাই ঘটছে। স্বামীর প্রতি ভালোবাসা তাকে বাঁচিয়ে রাখে, আবার সেই ভালোবাসাই তাকে প্রতিদিন নতুন করে ভেঙে দেয়।

রাত গভীর হলে সুবর্ণা নাফিজকে বুকে জড়িয়ে ধরে। শিশুটার নিঃশ্বাস তার বুকের ভেতর ধুকধুক করে ওঠে। এই নিঃশ্বাসে সে স্বামীর গন্ধ খোঁজে। মনে হয়, নাফিজের শরীরের উষ্ণতার ভেতর দিয়েই তার স্বামী তাকে ছুঁয়ে আছে। এই ভাবনাটুকুই তাকে কিছুক্ষণের জন্য শান্তি দেয়—খুব অল্প সময়ের জন্য।

স্বামীর মুখখানা সে মনে মনে এঁকে নেয়। সেই হাসি, সেই কণ্ঠ, কারাগারে যাওয়ার আগের শেষ চাহনি। কত কথা বলা হয়নি সেদিন! কত ভালোবাসা আটকে ছিল বুকের ভেতর! এখন সেই কথাগুলো সে বাতাসের সাথে বলে বেড়ায়—কখনো দেয়ালের সাথে, কখনো জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া আলোকে ধরে।

“তুমি কি আর কোনো দিন ফিরবে না?”
এই প্রশ্নটা সারাক্ষণ তার মাথার ভেতর ঘুরে বেড়ায়।

একটা ভয় তাকে গ্রাস করে ফেলেছে—স্বামী আর কোনো দিন মুক্তি পাবে না। এই চিন্তাটা যেন বিষাক্ত সাপের মতো তার মস্তিষ্কে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে। যতই সে ভাবনাটা ঝেড়ে ফেলতে চায়, ততই সেটা আরও শক্ত হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে।

সে কথা বলে—অনবরত কথা বলে। নাফিজের সাথে, নিজের সাথে, কখনো অদৃশ্য কারো সাথে। মানুষ ভাবে, সে হয়তো অস্থির হয়ে পড়েছে। কিন্তু কেউ বোঝে না, এই কথাগুলো না বললে সে বাঁচতে পারবে না।

শান্তি বলে কিছু নেই তার জীবনে। ঘুম এলেও সেটা ভেঙে যায় স্বপ্নে। স্বপ্নে সে দেখে—কারাফটকের লোহার গেট খুলছে, স্বামী বেরিয়ে আসছে। কিন্তু ঠিক তখনই গেট আবার বন্ধ হয়ে যায়, আর স্বামী ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায় অন্ধকারে। ঘুম ভেঙে গেলে তার বালিশ ভিজে যায় চোখের জলে।

সে ভাবে—কী করবে?
স্বামী ছাড়া, এই শিশু সন্তানকে নিয়ে সে কীভাবে দিন কাটাবে?

এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। উত্তরহীন প্রশ্নই যেন তার নিত্যসঙ্গী।

স্বামী জেলে যাওয়ার পর পাড়া-প্রতিবেশীদের মুখগুলো বদলে গেছে। যারা একসময় হাসিমুখে কথা বলত, তারা এখন চোখ ফিরিয়ে নেয়। কেউ খোঁজ নেয় না। কেউ দরজায় কড়া নাড়ে না। যেন সে হঠাৎ অদৃশ্য এক কলঙ্ক হয়ে গেছে।

আপন লোকগুলোও আস্তে আস্তে দূরে সরে গেছে। প্রথমে তারা বলেছিল, “কিছু লাগলে জানাবে।”
আজ সেই “কিছু লাগলে”-এর মানুষগুলো আর ফোন ধরে না। তাকে দেখলে আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরা মুখ ফিরিয়ে নেয়। কেউ কেউ পথ বদলে চলে যায়।

এই অবহেলা সুবর্ণার আত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করে। সে বুঝতে পারে—সমাজ ভালোবাসে না অসহায় মানুষকে। সমাজ পাশে দাঁড়ায় শক্ত মানুষের, সফল মানুষের।

তবু, তার ভালোবাসা অটুট। স্বামীর জন্য ভালোবাসা। সেই ভালোবাসায় রোমান্টিক স্মৃতি ভেসে ওঠে। প্রথম দেখা, প্রথম কথা, প্রথম স্পর্শ। একদিন বৃষ্টিতে ভিজে দুজন একসাথে দাঁড়িয়েছিল। সেদিন স্বামী বলেছিল,
“যত ঝড়ই আসুক, আমি তোমার ছায়া হয়ে থাকব।”

আজ সেই ছায়া লোহার দেয়ালের ভেতর বন্দি।

সুবর্ণা মাঝে মাঝে নাফিজকে কোলে নিয়ে স্বামীর পুরোনো শার্টটা বুকে চেপে ধরে। মনে হয়, এই কাপড়ে তার ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। সে চোখ বন্ধ করে ভাবে—যদি স্বামী ফিরে আসত, তাহলে কী হতো? নাফিজকে কোলে তুলে দিত, বলত—“এই তো আমাদের ছেলে।”

এই কল্পনাই তার একমাত্র রোমান্টিক আশ্রয়।

কিন্তু বাস্তব বড় নির্মম। বাস্তব তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—স্বামী নেই, টাকা নেই, সাহায্য নেই। সমাজ নেই। শুধু আছে এক শিশু আর অসহায় এক মা।

এই চিন্তায় ভেঙে পড়ে সুবর্ণা। কখনো কখনো সে কাঁদে নিঃশব্দে—কারণ নাফিজ যেন না দেখে। সে চায় না, তার সন্তানের শৈশব কান্নার শব্দে ভরে উঠুক।

তার মনে হয়, সে যেন একটা বন্ধ কারাফটকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—এক পাশে ভালোবাসা, অন্য পাশে বাস্তবতা। মাঝখানে সে নিজেই বন্দি।

তবু ভালোবাসা তাকে ছাড়ে না। স্বামীর জন্য তার বুকের ভেতর আগুন জ্বলে। সেই আগুনে সে পুড়ে যায়, কিন্তু নিভে যায় না। ভালোবাসা তাকে দুর্বল করে না—ভালোবাসাই তাকে টিকিয়ে রাখে।

শেষ রাতে, নাফিজ ঘুমিয়ে পড়লে, সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে—
“তুমি যদি কোনো দিন না-ও ফেরো, আমি তোমাকে ভালোবেসেই যাব।”

এই কথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে তার জীবনের সব রোমান্টিকতা, সব আবেগ, আর সীমাহীন অসহায়তা।

কারাফটক হয়তো এখনও বন্ধ।
কিন্তু সুবর্ণার হৃদয়ের দরজাটা আজও খোলা—ভালোবাসার জন্য, অপেক্ষার জন্য, আর এক অসম্ভব আশার জন্য।

চলবে............