প্রথম পর্ব: অনিশ্চিত দরজার ওপাশে
জেলের লোহার দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দ কুদ্দুছের বুকের ভেতরেও একটা দরজা বন্ধ করে দিল। শব্দটা খুব বড় ছিল না, তবু তার কানে লেগে রইল—ধাতুর সঙ্গে ধাতুর ঠকঠকানি, আর তার ফাঁকে মানুষের ভবিষ্যৎ আটকে যাওয়ার আর্তনাদ। সে জানত না, এই দরজার ওপাশে আবার কবে আলো দেখবে। আদৌ দেখবে কিনা—সেটাও নিশ্চিত ছিল না।
কুদ্দুছ ছিল একটি ছাত্র সংগঠনের পরিচিত নেতা। ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে তার নাম লেখা ছিল—কখনো সমর্থনের স্লোগানে, কখনো অভিযোগের লাল কালিতে। তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা সে নিজেও ঠিকঠাক গুনে রাখতে পারেনি। মিছিল, পোস্টার, বক্তব্য—সবকিছুর হিসাব রাখা যায়; কিন্তু রাষ্ট্রের খাতায় জমা হওয়া অভিযোগের হিসাব আলাদা। এই আলাদা হিসাবই একদিন তাকে কারাগারের ভেতর এনে দাঁড় করিয়েছে।
বাইরে তার একটা সংসার ছিল—ছোট, নড়বড়ে, কিন্তু স্বপ্নে ভরা। সে মধ্যবিত্ত নয়, বলা ভালো মধ্যেবর্তী পরিবারের সন্তান—যেখানে বড় ভাইয়েরা আলাদা হয়ে গেছে আগেই, যার নিজের বলে কিছু নেই, আছে শুধু দায়িত্ব। বাবা-মা নেই। আত্মীয়স্বজন আছে, কিন্তু প্রত্যেকেরই নিজস্ব হিসাব, নিজস্ব সংসার। পাড়া-প্রতিবেশি আছে, কিন্তু কারও চোখে চোখ রেখে দীর্ঘদিন দাঁড়ানোর মতো সম্পর্ক নেই।
তার স্ত্রী—সুবর্না—ছিল সেই সংসারের একমাত্র স্থিরতা। কুদ্দুছের ঝাঁপিয়ে পড়া জীবনের পাশে সুর্বনার জীবনটা ছিল ধীর, মেপে হাঁটা। সে জানত কুদ্দুছ রাজনীতি করে, জানত ঝুঁকি আছে। তবু ভালোবেসে পাশে দাঁড়িয়েছিল। বিয়ের পরপরই কুদ্দুছের মামলা বাড়তে শুরু করে, আর্থিক অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। যে সামান্য আয় হতো, তা দিয়েই কোনোভাবে মাসের দিন গোনা যেত।
জেলে যাওয়ার আগেই সুর্বনা জানতে পারে—সে সন্তানসম্ভবা। খবরটা কুদ্দুছকে বলার সময় তার চোখে ভয় আর আনন্দ একসঙ্গে ছিল। কুদ্দুছ প্রথমে চুপ করে ছিল। তারপর ধীরে বলেছিল, “সব ঠিক হয়ে যাবে।” কথাটা সে নিজেও বিশ্বাস করছিল না, তবু বিশ্বাস করার ভান করেছিল—কারণ তখন ভানটাই ছিল একমাত্র সাহস।
গ্রেপ্তারের দিনটা হঠাৎ আসেনি। সবাই জানত, যেকোনো দিন আসতে পারে। তবু যখন পুলিশ দরজায় কড়া নাড়ল, রীমার হাত থেকে পানির গ্লাস পড়ে ভেঙে গেল। কুদ্দুছ তখন ঘরের এক কোণে বসে ফাইল গুছাচ্ছিল—মামলার কাগজ, জামিনের কপি, কিছু অসমাপ্ত চিঠি।
পুলিশের সামনে সে শান্ত ছিল। শুধু বেরোনোর সময় সুর্বনার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “ভয় পেও না।” এই তিনটা শব্দের ভেতর সে নিজের সব অসহায়তা ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
কুদ্দুছ জেলে যাওয়ার পর সুর্বনা একা হয়ে গেল। ভাইয়েরা আলাদা থাকে—তাদের সংসারে জায়গা সংকীর্ণ। আত্মীয়রা প্রথম প্রথম খোঁজ নিল, পরে ধীরে ধীরে খোঁজ নেওয়ার ফাঁক বড় হতে লাগল। পাড়া প্রতিবেশিরা সহানুভূতি দেখাল, কিন্তু সহানুভূতিরও একটা সময়সীমা আছে।
সুর্বনার দিন কাটত অপেক্ষায়। কখনো স্বামীর চিঠির, কখনো জামিনের খবরের, কখনো অজানা ভবিষ্যতের। পেটে অনাগত সন্তানের নড়াচড়া তাকে মনে করিয়ে দিত—সে একা নয়। তবু গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে মনে হতো, এই চার দেয়ালের ভেতর সে একেবারে একা।
অর্থের অভাব ধীরে ধীরে ঘরের প্রতিটি কোণে ছাপ ফেলল। বাজারের থলে হালকা হয়ে এল, ওষুধের তালিকা ছোট হলো, আর সুর্বনার নিজের প্রয়োজনগুলো অদৃশ্য হয়ে গেল। সে কাউকে কিছু বলত না। বলার মানুষ ছিল, কিন্তু বলার মতো ভরসা ছিল না।
কুদ্দুছ জেলের ভেতর বসে বাইরে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেছিল। সপ্তাহের দিনগুলো গুলিয়ে যেত। শুধু চিঠির দিনটা সে মনে রাখত। সুবর্নার হাতের লেখা দেখলেই তার বুকটা হালকা হতো। চিঠিতে সুর্বনা খুব কমই কষ্টের কথা লিখত। লিখত—“আমি ভালো আছি।” এই ভালো থাকা যে কতখানি মিথ্যে, কুদ্দুছ তা বুঝত, তবু কিছু করার ছিল না।
সুর্বনার শরীরের পরিবর্তন চোখে পড়তে লাগল। পাড়া-মহল্লার কিছু মানুষ সাহায্যের হাত বাড়াল, কেউ কেউ কটাক্ষও করল। একজন বন্দি নেতার স্ত্রী হওয়া যেন অপরাধেরই আরেক রূপ। সুর্বনা সব সহ্য করত নীরবে। তার নীরবতাই ছিল তার একমাত্র ঢাল।
রাতের বেলা সে কুদ্দুছের কথা ভাবত। ভাবত—সে কি জানে, তার অনুপস্থিতিতে সংসারটা কতটা ভারী হয়ে উঠেছে? ভাবত—এই সন্তানের মুখ কি সে কোনোদিন দেখতে পাবে? প্রশ্নগুলো উত্তরহীন থেকে যেত।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই সুর্বনা একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকাল। চোখের নিচে কালি, মুখে ক্লান্তির রেখা। সে হাত বুলিয়ে পেটের ওপর রাখল। সন্তানের নড়াচড়া আবার অনুভব করল। সেই মুহূর্তে তার মনে হলো—এই শিশুটাই তার শেষ ভরসা।
কিন্তু সমাজের নিষ্ঠুর বাস্তবতা ধীরে ধীরে তার চারপাশের বাতাস ভারী করে তুলছিল। প্রতিটি দিন যেন নতুন এক পরীক্ষার নাম। প্রতিটি রাত যেন আরও গভীর এক অন্ধকার।
জেলের ভেতর কুদ্দুছ জানত না—বাইরের পৃথিবী তার স্ত্রীকে কতটা কোণঠাসা করে ফেলেছে। সে শুধু বিশ্বাস করত—সময় বদলাবে। সেই বিশ্বাসই তাকে বাঁচিয়ে রাখত।
এই বিশ্বাস আর বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল এক অদৃশ্য ফটক—কারাফটক। যার এক পাশে ছিল কুদ্দুছের বন্দি জীবন, আরেক পাশে সুর্বনার নীরব লড়াই। এই ফটক পেরোনোর পর কী অপেক্ষা করছে—তা কেউই জানত না।
সামনে অপেক্ষা করছে এমন এক পথ, যেখানে ভালোবাসা, নিষ্ঠুরতা আর নীরব আর্তনাদ একসঙ্গে হাঁটে।
চলবে.............