ঢাকা, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:৪০:৪৮ PM

কারাফটক, পর্ব–৭

মান্নান মারুফ
28-01-2026 02:46:58 PM
কারাফটক, পর্ব–৭

পর্ব–৭ ,নীরবতার কারাফটক

ঘরটা যেন আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে—আজ আর শব্দ করবে না।

দেয়ালের ফাটল, জানালার কাঠ, মেঝের ধুলো—সবকিছু স্থির। দিনের আলো ঢুকলেও আলোটা যেন আলো নয়; নিস্তেজ, ক্লান্ত, ভাঙা। এমন আলো শুধু শূন্যতা দেখায়, জীবন নয়।

সুর্বনা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। ভেতরে ঢোকার আগে একবার আকাশের দিকে তাকায়। আকাশও আজ নিরুত্তর।
হাতে কোনো টাকা নেই। নেই আশ্বাস, নেই সহানুভূতি। চারপাশে শুধু চাপ—মানুষের কথা, সমাজের দৃষ্টি, অদৃশ্য হুমকি। কেউ সরাসরি কিছু বলেনি, কিন্তু প্রতিটি নীরবতাই ছিল ভয় দেখানোর মতো।

সে ধীরে পা ফেলে ঘরে ঢোকে।

নাফিজ ঘুমাচ্ছে না। শিশুরা যেমন থাকে—চোখ আধখোলা, নিঃশ্বাসে কাঁপুনি। সুর্বনা কাছে গিয়ে বসে। কোলে তোলে তাকে। বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন করে ওঠে—এত ছোট একটা দেহ, অথচ তার চারপাশে কত ভার।

সে তাকায় নাফিজের দিকে। একবার না—বারবার।
এই চোখ দুটোই তো তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল এতদিন। এই কান্নাই তাকে সকাল পর্যন্ত টেনে এনেছে কত রাত।

আজ নাফিজ কাঁদছে না।

ঘরের একপাশে রাখা জিনিসগুলোর দিকে সুর্বনার চোখ যায়। সবকিছু যেন আগে থেকেই ঠিক করা—যেন কোনো দীর্ঘ হিসাবের শেষ অঙ্ক। তার মুখে কোনো আতঙ্ক নেই, নেই অস্থিরতা। আছে কেবল ক্লান্ত সিদ্ধান্ত।

সে নাফিজকে বুকে চেপে ধরে। শিশুর গায়ে তার বুকের উষ্ণতা লাগে। কয়েক মুহূর্ত সময় থেমে থাকে পৃথিবী।

তারপর—

ঘরের নীরবতা আরও গভীর হয়।

কিছু সময় পর সুর্বনা নড়েচড়ে বসে। নাফিজ আর নড়ে না। আর কাঁদে না।
এই ঘরে আর কোনো দিন শিশুর কান্না উঠবে না।
“মা” শব্দটা বাতাসে আটকে যায়—কখনো উচ্চারিত হয় না।

সবকিছু ঠান্ডা।

সুর্বনা চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে থাকে। চোখের কোণে পানি জমে, কিন্তু গড়িয়ে পড়ে না। কান্না করার শক্তিটুকুও যেন ফুরিয়ে গেছে।

এবার তার নিজের পালা।

সে উঠে দাঁড়ায়। ঘরটাকে একবার চারপাশ থেকে দেখে নেয়—এই ঘরেই সে স্বপ্ন দেখেছিল, এই ঘরেই ভেঙেছে। কাউকে কিছু বলা লাগবে না। কেউ শোনারও নেই।

যা করার, সে আগেই ঠিক করে রেখেছে।

ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে শেষবারের মতো নিজের নিঃশ্বাস শোনে। এই নিঃশ্বাসে ভয় নেই, আছে কেবল মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। সমাজ তাকে জায়গা দেয়নি; পৃথিবী তাকে সময় দেয়নি।

কিছুক্ষণের মধ্যেই—

সব শেষ।

নীরবতা এবার পূর্ণতা পায়।

এই বাড়িতে এখন আর কেউ কাঁদে না। কেউ হাসেও না।
দিনের বেলায়ও ঘরটা অন্ধকার লাগে। কারণ আলো শুধু চোখে পড়ে, হৃদয়ে নয়।

বাইরে মানুষ চলাচল করে। কেউ জানে না, এই বাড়ির ভেতরে একটি পুরো জীবন থেমে গেছে। কেউ জানে না, এই নীরবতার পেছনে কত প্রশ্ন, কত ব্যর্থতা, কত অবহেলা জমে আছে।

কারাফটক বন্ধ হয়ে গেছে।

ভেতরে কেউ নেই।
বাইরে কেউ ঢোকে না।

চলবে...........