ঢাকা, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ১১:১০:১২ PM

ঢাকায় শীর্ষ নেতাদের উচ্চঝুঁকির লড়াই

মান্নান মারুফ
24-01-2026 09:44:07 PM
ঢাকায় শীর্ষ নেতাদের উচ্চঝুঁকির লড়াই

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা ও কৌশলগত সমীকরণ নতুন মাত্রা লাভ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত এক রাজনৈতিক রীতির বাইরে গিয়ে এবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জোটের একাধিক শীর্ষ নেতা রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ঝুঁকিই নয়, বরং ভবিষ্যৎ বিরোধী রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে এক বড় ধরনের পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাধারণত দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ গ্রামীণ বা নিজ নিজ রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনগুলোতে নির্বাচন করে থাকেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই চিত্রে ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ, সচেতন ভোটারসমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত হচ্ছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রভাবশালী নেতারা। নির্বাচনী প্রচারণায় দেশজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা গেলেও ঢাকার নির্বাচনী এলাকাগুলোতে বিরাজ করছে ভিন্ন এক আবহ। পোস্টার, মিছিল ও সভা-সমাবেশের পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্যে পাল্টাপাল্টি আক্রমণ রাজধানীর রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে তুলেছে। অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও ভোটের হিসাব কষছেন প্রার্থীরা। ঢাকার এই লড়াই কেবল একটি বা কয়েকটি আসনের জয়-পরাজয়ের বিষয় নয়; বরং এটি সংশ্লিষ্ট দলগুলোর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক শক্তি এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সক্ষমতার পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থীদের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ঢাকা-১৭ আসনে, যার আওতায় গুলশান ও বনানীর মতো কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও অভিজাত এলাকা অন্তর্ভুক্ত। ডিসেম্বরের শেষ দিকে তার প্রার্থিতার ঘোষণা বিএনপির ভেতরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তার ঘোষণার পর ওই আসনে দলীয় এক মিত্র প্রার্থী সরে দাঁড়ান, যা দলীয় কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. খালিদুজ্জামান। নির্বাচনী প্রচারণায় তারেক রহমান গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনছেন। এক সমাবেশে তিনি বলেন, “মানুষ পরিবর্তন চায়, মানুষ নিরাপত্তা চায়।” একই সঙ্গে তিনি গত ১৫ বছরে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলে ধরেন। অন্যদিকে ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে এই আসনে বিএনপির প্রতীকে নির্বাচন করে পরাজিত হলেও এবার তিনি ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান থেকে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। তার প্রচারণার মূল বার্তা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন’ ও নাগরিক ক্ষমতায়ন। তিনি বলেন, “প্রতিটি নাগরিককে ক্ষমতায়ন করেই একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়া সম্ভব।” এই আসনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শফিকুল ইসলাম মিল্টন। ঢাকা-১১ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রার্থী হয়েছেন। রামপুরা ও বাড্ডা নিয়ে গঠিত এই আসনে তিনি জুন মাসে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে গঠিত রাজনৈতিক জোটের সমর্থন নিয়ে মাঠে নেমেছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি অভিযোগ করেছেন, তার সমর্থকদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এক বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম বলেন, “জনসমর্থন থাকলে কোনো কারচুপি সফল হবে না। ভোটাররাই তাদের ভোট রক্ষা করবেন।” এই আসনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী ডা. এম এ কাইয়ুম। ঢাকা-১৩ আসনে মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে ঐক্যবদ্ধ জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা মাওলানা মামুনুল হক। তিনি তার প্রচারণায় ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি সামাজিক সংস্কার ও রাজনৈতিক ঐক্যের বার্তা দিচ্ছেন। এক বক্তব্যে তিনি বলেন, “১৯৭১ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগ আমরা ভুলিনি। বিভাজনের রাজনীতি এখানেই শেষ হওয়া উচিত।” এই আসনে বিএনপির প্রতীকে সাবেক এনডিএম নেতা ববি হাজ্জাজ তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীতে শীর্ষ নেতাদের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এক ধরনের উচ্চঝুঁকির রাজনৈতিক জুয়া। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিশ্লেষক বলেন, “ঢাকায় পরাজয় মানে শুধু একটি আসন হারানো নয়; এটি একজন নেতার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ও নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতায় বড় ধাক্কা দিতে পারে। ঢাকার ভোটাররা তুলনামূলকভাবে বেশি সচেতন এবং আবেগের চেয়ে বাস্তবতা ও যুক্তিকে গুরুত্ব দেয়।” ইতিহাসও এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে কিছুটা সংযত করার বার্তা দেয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার দুটি আসনে পরাজিত হয়েছিলেন। আবার ২০০৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির নেতা এইচ এম এরশাদ ঢাকা-১৭ আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে রাজধানীতে আওয়ামী লীগের প্রাধান্য দেখা গেলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা বিরোধী দলের বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এই নির্বাচনের রাজনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্র দখল, ভোটারদের ওপর চাপ ও অনিয়মের আশঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর ২০টি সংসদীয় আসন এখন যেন দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক বিভাজন ও পুনর্গঠনের প্রতিচ্ছবি। এই নির্বাচনের ফলাফল একদিকে যেমন নতুন রাজনৈতিক জোট ও সমীকরণ সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি বিরোধী রাজনীতির শক্তি ও দুর্বলতার প্রকৃত চিত্রও তুলে ধরতে পারে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের রেশ এখনো জনমনে তাজা। সেই প্রেক্ষাপটে ঢাকায় জয় পাওয়া কেবল একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়; বরং বিরোধী রাজনীতির অস্তিত্ব, বিশ্বাসযোগ্যতা ও পুনরুত্থানের প্রশ্নের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।