ঢাকা, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:২৮:৪৭ PM

নিঃশব্দ বার্তা––১০

মান্নান মারুফ
17-01-2026 01:52:39 PM
নিঃশব্দ বার্তা––১০

শেষ অধ্যায়

কুদ্দুছের জীবন ছিল এক দীর্ঘ যাত্রাএকজন মানুষের, কিন্তু অনেকের জন্য। ত্যাগের, ক্লান্তির, ভালোবাসার। প্রতিটি দিন কাটত অন্যের জন্য, প্রতিটি রাত কাটত নিঃশব্দ কষ্টে। তিনি নিজেকে কখনো ভাবেননি নায়ক হিসেবে, নিজের সুখের স্বপ্নও বিলুপ্ত করে দিয়েছেন পরিবারের হাসির জন্য।

প্রবাসের রোদ, রাতের নিঃশ্বাস, একাকীত্বসবই তার জীবনকে কঠিন করেছে। কিন্তু দেশে ফিরে আসার একমাত্র ইচ্ছা ছিলমায়ের কোল, স্ত্রীর চোখে দেখা, সন্তানদের কাঁধে হাত রাখা। শুধু একটি মুহূর্তের জন্য। কিন্তু নিয়তি নির্মম ছিল। দেশে ফেরার আনন্দ কখনো পূর্ণ হতে পারেনি। বিমানবন্দরের ফ্লোরে পড়ে থাকা দেহ শুধু একটি দেহ ছিল নাহাজারো প্রবাসীর স্বপ্ন, আশা, ত্যাগের প্রতীক।

স্ত্রী, সন্তান, মাতাদের চোখে কুদ্দুছ রয়ে গেছে অনুপস্থিতি হিসেবে। সন্তানেরা বড় হয়ে উঠেছে বাবার শূন্যতায়, শিখেছে দায়িত্ব, ভালোবাসা, জীবন এবং বেঁচে থাকার মানে। মা শিখেছেঅপার্থিব ভালোবাসা মানে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখা। স্ত্রী শিখেছেজীবনের কঠিন সত্যের সঙ্গে দাঁড়ানো মানে নীরবে লড়াই করা।

সমাজ তাকে সফল প্রবাসী বলে ডাকে। রাষ্ট্র তাকে কেবল একটি ফাইল পরিসংখ্যান হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু মানবিক চোখেসে একজন মানুষ, যার জীবন অন্যদের জন্য বিসর্জিত, যার মৃত্যু নিঃশব্দে ঘটে গেল। এই পার্থক্যই আমাদের মর্মান্তিক করে তোলে।

কুদ্দুছের জীবন শিখিয়েছেসফলতা মানে কেবল অর্থ বা পদবি নয়। সফলতা মানে হলো দায়বদ্ধতা, ত্যাগ, ভালোবাসা, এবং শেষ মুহূর্তে মানুষের কাছে থাকা। কিন্তু সমাজ রাষ্ট্র যদি এই নিঃশব্দ ত্যাগকে না বোঝে, তাহলে সেই সফলতাও অসম্পূর্ণ থাকে।

আজ তার কফিন মাটির নিচে। কিন্তু তার গল্প রয়ে গেছে। তার নিঃশব্দ বার্তা রয়ে গেছেপ্রত্যেক প্রবাসী শ্রমিক, প্রত্যেক নিঃস্বার্থ মানুষ, প্রত্যেক ক্লান্ত প্রাণ, তাদের কষ্টকে আমরা দেখতে শিখব, তাদের ত্যাগকে আমরা সম্মান দেব।

কুদ্দুছের জীবন, মৃত্যু, এবং পরিবারসবই আমাদের কাছে একটি পাঠ। পাঠ, যা বলেপ্রত্যেক ত্যাগীকেই আমরা শিরোনাম দেব, প্রত্যেক ক্লান্তিকেই আমরা স্মরণ করব। পৃথিবী শুধু নথি বা হিসাব দিয়ে চলে না। মানুষরাই পৃথিবীকে পূর্ণ করে।

শেষবার তার চোখ বন্ধ হয়েছিল শান্তিতে। তার হাতে কোনো হাতে ধরা হয়নি, কোনো বিদায় বলা হয়নি। কিন্তু তার জীবন আমাদের শেখায়সত্যিকারের শান্তি আসে ত্যাগের পরিপূর্ণতায়, ভালোবাসার নিঃশব্দতায়।

কুদ্দুছ চলে গেলেন। কিন্তু তার গল্প, তার জীবন, তার শিক্ষাচিরকাল রয়ে যাবে।
আমাদের দায়িত্ব হলোতাদের কষ্টকে ভুলে না যাওয়া, তাদের ত্যাগকে সম্মান করা, তাদের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা।

এটাই কুদ্দুছের সত্যিকারের উত্তরাধিকার।
এটাই তার নিঃশব্দ বার্তা।

শেষ……….