পর্ব–৪
অনেক রাত আমি অনুভব করেছি,
ভেতরটা ধসে পড়ছে ধীরে ধীরে,
তবু কোথা থেকে যেন আশার বাণী আসে ফিরে ফিরে।
রাত মানুষের আসল মুখ দেখায়। দিনের কোলাহলে যেসব ব্যথা চাপা পড়ে থাকে, রাতের নিস্তব্ধতায় তারা জেগে ওঠে। আমি বহু রাত জেগে কাটিয়েছি—চোখ খোলা রেখে, অথচ কিছুই স্পষ্ট না দেখে। মনে হয়েছে, বুকের ভেতর কোনো অদৃশ্য স্থাপনা ধসে পড়ছে। ইটের পর ইট খুলে যাচ্ছে, ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। তবু আশ্চর্য, সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাইনি কখনো।
অনেক রাত আমি অনুভব করেছি, ভেতরটা ধসে পড়ছে ধীরে ধীরে। সংসারের টানাপোড়েন, টাকার অনিশ্চয়তা, সমাজের চাপা তাচ্ছিল্য—সব মিলিয়ে আত্মবিশ্বাস ক্ষয়ে গেছে। আগে যেসব সিদ্ধান্ত দৃঢ়ভাবে নিতাম, এখন সেগুলো নিতেও দ্বিধা হয়। মনে হয়, ভুল করছি না তো? আবার ভেঙে পড়ব না তো?
কিন্তু ঠিক সেই গভীর সময়েই কোথা থেকে যেন আশার বাণী আসে ফিরে ফিরে। কখনো তা ঐশির কণ্ঠে, কখনো তার একটি বার্তায়, কখনো বা নিছক স্মৃতির ভেতর।
গত সপ্তাহে মায়ের শরীরটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। রাত দুটোয় তাকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে হয়। পথ অন্ধকার, রিকশা পাওয়া কঠিন। সেই অসহায় মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, জীবনের বোঝা যেন আমার একার কাঁধে। হাসপাতালে বসে যখন রিপোর্টের অপেক্ষা করছিলাম, হাতের ফোনটা কেঁপে উঠল।
ঐশি।
আমি অবাক হলাম। এত রাতে সে কেন জেগে? কল ধরতেই সে বলল, “আজ সারাদিন অস্থির লাগছিল। ঠিক আছো তো?”
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। তারপর সব বললাম। সে মন দিয়ে শুনল। কোনো বাড়তি প্রশ্ন নয়, কোনো আতঙ্ক নয়। শুধু বলল, “আমি আছি। যা দরকার জানিও।”
এই ‘আমি আছি’ কথাটা কেমন যেন স্থিরতা এনে দেয়। বাস্তবে সে অনেক দূরে। তবু তার উপস্থিতি যেন আমার কাঁধের ভার একটু হালকা করে দেয়। মায়ের রিপোর্ট শেষ পর্যন্ত তেমন গুরুতর কিছু দেখাল না। কিন্তু সেই রাত আমাকে বুঝিয়ে দিল—মানুষের টিকে থাকার জন্য সব সময় সমাধান লাগে না, লাগে সঙ্গ।
অনেক রাত আমি ভেবেছি, যদি ঐশি না থাকত? হয়তো জীবন তখনো চলত, কিন্তু তার রং অন্যরকম হতো। আরও ধূসর, আরও নির্জীব। এখন অন্তত জানি, অন্ধকারের ভেতরেও একটি জানালা খোলা আছে।
তবু সবকিছু এত সহজ নয়। মানুষের মন কখনো একরৈখিক নয়। কিছুদিন আগে হঠাৎ ঐশির কণ্ঠে এক ধরনের দূরত্ব টের পেলাম। কথার ভেতর অকারণ বিরতি, বার্তার উত্তরে দেরি। আমি কিছু জিজ্ঞেস করিনি, তবু ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা বাড়ছিল।
সেদিন রাতে সত্যিই মনে হচ্ছিল, ভেতরটা আবার ধসে পড়ছে। যে আশ্রয়টুকু এতদিন আমাকে সামলে রেখেছিল, সেটাও কি নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে? মানুষ কি চিরকাল একই থাকে? নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়?
শেষ পর্যন্ত নিজেকে আটকাতে পারলাম না। লিখলাম, “সব ঠিক আছে তো?”
কিছুক্ষণ পর তার উত্তর এল, “হ্যাঁ, শুধু একটু ব্যস্ততা।”
আমি জানি, ব্যস্ততা জীবনের স্বাভাবিক অংশ। তবু অকারণ ভয় পেয়ে বসেছিলাম। বুঝলাম, আমার টিকে থাকার শক্তির সঙ্গে সঙ্গে এক ধরনের নির্ভরশীলতাও জন্ম নিয়েছে। এই নির্ভরতা বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ মানুষ তো চিরকাল পাশে থাকে না।
সেই রাতেই আমি দীর্ঘক্ষণ নিজেকে প্রশ্ন করলাম—আমি কি কেবল ঐশির জন্য বেঁচে আছি? নাকি তার উপস্থিতি আমাকে নিজের ভেতরের শক্তি খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে?
উত্তরটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হলো। ঐশি কোনো ভরসার লাঠি নয়; সে এক ধরনের আলো, যা আমাকে নিজের পথ দেখতে সাহায্য করেছে। পথ হাঁটতে তো আমাকে একাই হবে।
তবু কোথা থেকে যেন আশার বাণী আসে ফিরে ফিরে। কখনো তা নিজের ভেতর থেকেও আসে। আমি বুঝতে শুরু করেছি, এতদিন আমি কেবল বাহ্যিক সমস্যাগুলোকে দোষ দিয়েছি। কিন্তু নিজের ভেতরের ভয়গুলোকে স্বীকার করিনি।
আমি এখন ছোট ছোট পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি। প্রতিদিন ভোরে উঠে হাঁটতে বেরোই। নতুনভাবে দোকানের হিসাব গুছিয়ে বসি। অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাচ্ছি। অনেকদিন পর পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে কথা বলেছি। ধীরে ধীরে জীবনের চাকা আবার গতি পাচ্ছে।
ঐশি মাঝে মাঝে বলে, “তুমি আগের চেয়ে স্থির হয়েছো।”
হয়তো তাই। কারণ এখন জানি, ভেঙে পড়া মানেই শেষ নয়। ধসে পড়া মানেই ধ্বংস নয়। কখনো কখনো পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুন ভিত্তি তৈরি হয়।
অনেক রাত এখনো আসে, যখন নিঃশব্দে বসে থাকি। ভেতরে চাপা কষ্ট জেগে ওঠে। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা চোখে ভাসে। কিন্তু সেই সঙ্গে একটুকরো বিশ্বাসও থাকে—আমি একা নই।
ঐশি হয়তো জানে না, তার প্রতিটি সাধারণ কথা আমার জীবনে কত গভীর প্রভাব ফেলে। সে জানে না, তার নীরব উপস্থিতি কতবার আমাকে আত্মসমর্পণ থেকে ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু আমি জানি।
জীবন এখনো অসম্পূর্ণ। স্বপ্ন এখনো পুরো হয়নি। কিন্তু আমি আর আগের মতো ভয় পাই না। কারণ ধস নামলেও জানি, আবার দাঁড়ানোর শক্তি আছে।
অনেক রাত আমি অনুভব করেছি, ভেতরটা ধসে পড়ছে ধীরে ধীরে—তবু কোথা থেকে যেন আশার বাণী আসে ফিরে ফিরে। কখনো তা ঐশির কণ্ঠে, কখনো নিজের অন্তরের গভীর থেকে।
আর সেই আশার কারণেই আমি এখনো বেঁচে আছি, লড়ে যাচ্ছি, স্বপ্ন দেখছি।
চলবে..........