ঢাকা, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:৩৮:৪৯ AM

উপন্যাস: স্বপ্ন

মান্নান মারুফ, বিশেষ প্রতিনিধি
27-02-2026 03:02:47 PM
উপন্যাস: স্বপ্ন

পর্ব

তবু ঐশি আছো বলেই । তবু ঐশি আছো বলেই ভাঙা উঠোনে আজও জোছনা নামে, চুপচাপ বসে থাকা স্বপ্নগুলো আবার একটু নড়েচড়ে বসে।

উঠোনটা একসময় খুব সুন্দর ছিল। বিকেলের রোদ এসে পড়ত ঠিক মাঝখানে, আমগাছের ছায়া দুলত নরম বাতাসে। মা তখন ধান শুকোতেন, বাবা বসতেন পিঁড়িতে, আর আমিকুদ্দুছখালি পায়ে দৌড়ে বেড়াতাম। সেই উঠোন এখন ভাঙা। ইট সরে গেছে, কোথাও কোথাও মাটি বসে গিয়েছে। দেয়ালের চুন খসে পড়েছে, দরজার কপাটে জং ধরেছে। তবু জোছনা নামলে সব ভাঙাচোরা ঢেকে যায়। মনে হয়, এই বাড়ি এখনো আমাকে চেনে, আমার দীর্ঘশ্বাস শুনতে পায়।

জীবন সবসময় গল্পের মতো এগোয় না। আমার জীবন তো আর সেরকম নয়। যে বয়সে স্বপ্ন দেখার কথা, সে বয়সেই আমাকে হিসেব শিখতে হয়েছেকত টাকা বাকি, কত ঋণ শোধ, কতটুকু মান-সম্মান বাঁচানো যায়। অনেক কিছুই হাতছাড়া হয়েছে। কিছু মানুষ দূরে সরে গেছে, কিছু সম্পর্ক কেবল স্মৃতির ভেতর বেঁচে আছে। তবু এই দীর্ঘ অন্ধকারে একটি নাম বারবার আলো হয়ে জ্বলেঐশি।

যে ধুলো জমেছিল বুকের কোণে, তোমার একফোঁটা কথায় ঝরে পড়ে বৃষ্টির মতো। তুমি খুব সাধারণ কথা বলো—“খেয়েছো?”, “এত রাত জেগো না”, “নিজের যত্ন নিও।অথচ সেই সাধারণ কথাগুলোই আমার অসাধারণ আশ্রয় হয়ে ওঠে। আমি কখনো তোমাকে বলিনি, কিন্তু সত্যি এটাইতোমার প্রতিটি শব্দ যেন শুকিয়ে যাওয়া নদীর বুকে জলের রেখা আঁকে।

শুকিয়ে যাওয়া আশার ডালপালায় সবুজের আভা লাগেঅলক্ষ্যে। আমি টের পাই না কবে থেকে আমার ভেতরের রুক্ষ জমিতে আবার নরম ঘাস গজাতে শুরু করেছে। হয়তো সেদিন থেকে, যেদিন প্রথম তুমি বলেছিলে—“সব শেষ হয়ে যায় না, কুদ্দুছ। মানুষ চাইলে আবার শুরু করতে পারে।আমি হেসেছিলাম। কারণ আমি জানি, শুরু করা এত সহজ নয়। তবু তোমার বিশ্বাস আমাকে ধীরে ধীরে বদলে দেয়।

আমি কুদ্দুছ জানি, সব ঠিক হয়ে যায়নি এখনো। ভাঙা ইটের ফাঁকে ফাঁকে ব্যথা রয়ে গেছে। সংসারের চাপ, মানুষের অবহেলা, নিজের ভুল সিদ্ধান্তসব মিলিয়ে বুকের ভেতর একটা অদৃশ্য ভার জমে আছে। রাতের বেলায় সেই ভার আরও স্পষ্ট হয়। চারপাশে যখন নিস্তব্ধতা নামে, তখন অতীতের শব্দগুলো ফিরে আসেঅসমাপ্ত কথোপকথন, না বলা ভালোবাসা, অকারণ অভিমান।

ঐশি আমার জীবনে হঠাৎ করে আসেনি। দীর্ঘদিনের চেনা, অথচ অচেনা ছিলে তুমি। একই পাড়ায় বড় হওয়া, একই স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করাতবু কখনো কথা বলা হয়নি সেভাবে। সময় আমাদের আলাদা পথে নিয়ে গিয়েছিল। তুমি শহরে পড়তে গেলে, আমি রয়ে গেলাম এই ভাঙা বাড়ির দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে। জীবন তখন আমাকে স্বপ্ন দেখার অবকাশ দেয়নি।

বছর দুয়েক আগে হঠাৎ এক সন্ধ্যায় তোমার সঙ্গে আবার কথা। সামাজিক মাধ্যমে একটি সাধারণ শুভেচ্ছা—“কেমন আছো?” সেদিন বুঝিনি, এই দুটি শব্দ আমার স্থবির জীবনে এত বড় আলোড়ন তুলবে। কথায় কথায় আমরা ফিরে গিয়েছিলাম সেই স্কুলের দিনগুলোতে। তুমি বলেছিলে, “তুমি খুব চুপচাপ ছিলে।আমি হেসে বলেছিলাম, “চুপচাপ মানুষরাই বেশি ভাবতে জানে।

তারপর থেকে নিয়মিত কথা হতে লাগল। তুমি তোমার শহুরে জীবনের গল্প বলোব্যস্ততা, অফিস, ট্রাফিক, কোলাহল। আমি বলি আমার গ্রামের কথাশীতের কুয়াশা, বৃষ্টিভেজা পথ, বিদ্যুতের অনিয়মিত আলো। দুটো আলাদা জগৎ, অথচ অদ্ভুতভাবে এক সুতোয় বাঁধা।

তবু তোমার উপস্থিতি একটা প্রদীপের মতোঝড়ের মধ্যেও নেভে না সহজে। আমার জীবনে ঝড় কম আসেনি। ব্যবসায় লোকসান, আত্মীয়ের বিশ্বাসঘাতকতা, অসুস্থতার খরচসব মিলিয়ে অনেকবার মনে হয়েছে, আর পারব না। সেই সময়গুলোতে তুমি পাশে থেকেছো নীরবে। বড় কোনো সমাধান দাওনি, কেবল শুনেছো। আর মানুষকে শোনার মতো মানুষ পাওয়া কত বড় আশীর্বাদ, সেটা আমি তোমার কাছে শিখেছি।

একদিন তুমি বলেছিলে, “তুমি নিজেকে যতটা ব্যর্থ ভাবো, আসলে ততটা নও।আমি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে ছিলাম। কারণ আমি জানি, ব্যর্থতার সংজ্ঞা সবার কাছে এক নয়। সমাজ যাকে সফল বলে, সে- কি সত্যিই সফল? আর যে নীরবে লড়ে যায়, তাকে কি কেবল হারানো মানুষ বলা যায়? তোমার কথাগুলো আমাকে ভাবতে শিখিয়েছে নতুন করে।

তুমি আছো বলেই অন্ধকার পুরোটা কালো হয়ে যায় না, রাতের গভীরেও একটু ভোরের গন্ধ থাকে। এই ভোর এখনো দৃশ্যমান নয়। তবু আমি তার আভাস পাই। আগের মতো আর হাল ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে না। ছোট ছোট কাজগুলোও এখন অর্থবহ মনে হয়। ভাঙা উঠোনটা মেরামত করার কথা ভাবি। পুরোনো ঘরটায় নতুন রঙ করার স্বপ্ন দেখি। হয়তো এসব খুব সাধারণ, তবু এগুলোই আমার পুনর্জন্মের ইঙ্গিত।

ঐশি, তুমি জানো নাতোমার প্রতি আমার অনুভূতির গভীরতা কতখানি। আমি কখনো তাড়াহুড়ো করে কিছু বলতে চাই না। কারণ আমি জানি, ভালোবাসা উচ্চারণের আগে তাকে দায়িত্ব নিতে হয়। আমি চাই না, আমার অনিশ্চিত জীবনের ভার তোমার কাঁধে চাপুক। তবু মনের গোপন কোণে একটা স্বপ্ন জন্ম নিয়েছেএকদিন যদি সব ঠিকঠাক হয়, যদি আমি নিজের পায়ে পুরোপুরি দাঁড়াতে পারি, তবে তোমাকে বলব, “তুমি ছিলে বলেই আমি টিকে গেছি।

রাত গভীর হলে আমি উঠোনে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখি। অসংখ্য তারার মাঝে একটা তারা আলাদা করে জ্বলে। আমি জানি না, সেটাকে কী নামে ডাকব। তবু মনে মনে ভাবি, ওটাই হয়তো ঐশির তারা। দূরে থেকেও আলো দেয়, কাছে না এসেও পথ দেখায়।

জীবন এখনো সহজ হয়নি। সমস্যার শেষ নেই। তবু আগের মতো আর শূন্য লাগে না। কারণ আমার ভেতরে এখন একটা বিশ্বাস কাজ করেসব ভেঙে গেলেও, সব হারিয়েও, মানুষ আবার দাঁড়াতে পারে। যদি তার পাশে একজন থাকে, যে নিঃশব্দে বলে, “আমি আছি।

এই প্রথমবার আমি অনুভব করছি, স্বপ্ন মানে কেবল বড় কিছু অর্জন করা নয়। স্বপ্ন মানেভাঙা উঠোনে দাঁড়িয়ে নতুন করে জোছনা খুঁজে পাওয়া। স্বপ্ন মানেঅন্ধকারের মাঝেও ভোরের গন্ধ টের পাওয়া। স্বপ্ন মানেকারও উপস্থিতিতে নিজের ভেতরের সাহসটুকু খুঁজে পাওয়া।

আর আমার সেই স্বপ্নের নামঐশি।

 চলবে.........