কখনো কখনো ভালোবাসা ফুলের মতো ঝরে পড়ে। কেউ দেখে, কেউ দেখে না। তবু সে ঝরে পড়েই সুন্দর। তার ভালোবাসাও এমনই—নীরব, কিন্তু গভীর। এই নীরবতার ভেতরেই অপেক্ষা জন্ম নেয়। অপেক্ষা মানে কেবল সময় গোনা নয়; অপেক্ষা মানে নিজেকে ভেঙে আবার গড়ে তোলা। যে ভালোবাসা একে অপরকে ছাড়তে পারছে না, অথচ পাশাপাশি থাকতেও পারছে না—সেই ভালোবাসার নামই অপেক্ষা। সে জানে, তাকে ছেড়ে থাকা শেখা মানে ভালোবাসা ফুরিয়ে যাওয়া নয়। বরং এই দূরত্বেই ভালোবাসা আরও স্বচ্ছ হয়। দূরত্ব মানুষের কণ্ঠকে নীরব করে দেয়, কিন্তু হৃদয়ের শব্দ বাড়িয়ে তোলে। প্রতিদিনের সকালগুলোতে সে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে। সূর্য ওঠে, আলো পড়ে—কিন্তু মনটা কোথাও আটকে থাকে। সে অপেক্ষা করে কোনো চিঠির জন্য নয়, কোনো ফোনকলের জন্যও নয়। সে অপেক্ষা করে নিজের ভেতরের সেই অনুভূতির জন্য, যা বলবে—এখনো ভালোবাসা আছে। একদিন সে বুঝেছিল, ভালোবাসা সবসময় দাবি করে না। কখনো কখনো ভালোবাসা শুধু অনুমতি চায়—থাকতে দেওয়ার অনুমতি। নীরবে, আড়ালে, অদৃশ্যে। তাই সে আর প্রশ্ন করে না—কেন দূরে, কেন নীরব। সে শুধু মনে মনে বলে—থাকো। যেভাবেই থাকো, থেকো। অপেক্ষার দিনগুলো সহজ নয়। রাতগুলো আরও কঠিন। রাত নামলে স্মৃতিরা জেগে ওঠে। পুরোনো কথোপকথন, অসমাপ্ত হাসি, অর্ধেক বলা বাক্য—সব এসে ভিড় করে। সে জানে, এগুলো থেকে পালানো যায় না। পালাতে গেলেই এগুলো আরও তীব্র হয়। তাই সে বসে থাকে। শোনে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস। ভাবতে শেখে—ভালোবাসা কি সবসময় পাওয়া মানে? নাকি ভালোবাসা কখনো কখনো ছেড়ে দেওয়ার নাম? সে তাকে ছেড়ে থাকতে পারছে এখন। এই পারা—এটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কারণ যে ভালোবাসা ছাড়তে পারে না, সে ভালোবাসা নয়; সে আসক্তি। আর যে ভালোবাসা ছাড়তে পারে, দূরে থাকতে পারে, তবু নষ্ট হয় না—সে ভালোবাসা নজিরবিহীন। এক বিকেলে হঠাৎ বৃষ্টি নামল। জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছিল। সে মনে করল, একদিন দু’জনে একসঙ্গে এমন বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিল। সেদিন কথা কম ছিল, অনুভূতি বেশি। আজও কথা কম, অনুভূতি প্রচণ্ড। তবু আজ সে একা। এই একাকীত্ব তাকে দুর্বল করেনি; বরং শক্ত করেছে। সে বুঝেছে—অপেক্ষা মানে স্থবির থাকা নয়। অপেক্ষা মানে ভেতরে ভেতরে পরিণত হওয়া। দিনের পর দিন কেটে যায়। সে আর কাউকে দোষ দেয় না। ভাগ্যকে নয়, সময়কেও নয়। সে শুধু নিজেকে শেখায়—ভালোবাসা মানে দায়িত্ব। নিজের আবেগের দায়িত্ব, নিজের নীরবতার দায়িত্ব। সে জানে, যদি কখনো আবার দেখা হয়, তবে সে আর আগের মতো থাকবে না। সে আরও শান্ত হবে, আরও গভীর হবে। অনেকেই জিজ্ঞেস করে—এভাবে কতদিন? সে হাসে। উত্তর দেয় না। কারণ অপেক্ষার কোনো সময়সীমা নেই। অপেক্ষা একটা অবস্থান—যেখানে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে নিজের সবচেয়ে সত্য অনুভূতির পাশে। কখনো কখনো সে অনুভব করে, দূরে থেকেও তারা কথা বলছে। মন আর মন যোগাযোগ করছে। চোখে দেখা না গেলেও, শব্দে ধরা না পড়লেও—কোথাও একটা সেতু আছে। সেই সেতুর নাম বিশ্বাস। সে বিশ্বাস করে—যা সত্য, তা কখনো নষ্ট হয় না। হয়তো রূপ বদলায়, হয়তো দূরে সরে যায়, কিন্তু মরে না। ভালোবাসাও তেমন। আজ সে ফুলের মতো ঝরে পড়েছে। মাটিতে পড়ে আছে। কেউ দেখছে না। তবু সে জানে—এই ঝরে পড়াতেই সৌন্দর্য। অপেক্ষা তাই আর কষ্টের নাম নয়। অপেক্ষা এখন প্রার্থনার মতো। নীরব, ধীর, গভীর। সে প্রতিদিন নিজেকে বলে—আমি অপেক্ষায় আছি, কারণ আমি ভালোবাসি। আমি ভালোবাসি, তাই ছাড়তে পারি। এই পর্বে সে আর কিছু চায় না। না পাওয়া, না পাওয়ার ভয়—সব ছেড়ে দিয়েছে। সে শুধু চায়, এই ভালোবাসা যেন অক্ষত থাকে। যেভাবেই থাকুক। অপেক্ষা চলতে থাকে। সময় এগোয়। ফুল ঝরে পড়ে। আর ভালোবাসা—নীরবে, গভীরে—থেকে যায়।
সময় একদিন নীলকে শিখিয়ে দেয়—সব অপেক্ষার শেষ হয় না, কিছু অপেক্ষা মানুষকে শেষ পর্যন্ত মানুষ করে তোলে। নায়িকা তার জীবনে আর ফিরে আসে না—না হঠাৎ দেখা, না আকস্মিক ফোনকল, না কোনো ব্যাখ্যা। তবু নীল জানে, সে হারায়নি। কিছু মানুষ হারায় না—তারা রয়ে যায় ভেতরের গঠনে, সিদ্ধান্তে, নীরবতায়।
নীল এখন আর জানালার ধারে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে না। সে আলো দেখে, বৃষ্টি দেখে, মানুষ দেখে—আর বোঝে, ভালোবাসা পাওয়া মানে কাউকে পাওয়া নয়; ভালোবাসা মানে নিজের ভেতরের নরম জায়গাটুকু বাঁচিয়ে রাখা। নায়িকার অনুপস্থিতি তাকে ভাঙেনি; তাকে সংযত করেছে, সংবেদনশীল করেছে। নীল বুঝেছে—ভালোবাসা যদি সত্য হয়, তবে তার সবচেয়ে সুন্দর রূপ দেখা যায় ছাড়তে পারার ক্ষমতায়।
একদিন নীল শহর বদলায়। নতুন রাস্তা, নতুন কাজ, নতুন মুখ। কেউ জানে না তার অতীতের গল্প। আর নীলও বলে না। কারণ যে ভালোবাসা ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে, তা গভীর নয়। সে হাসে, দায়িত্ব নেয়, মানুষকে সময় দেয়। তার আচরণে এক ধরনের শান্তি—যেন বহুদিনের অপেক্ষা শেষে সে নিজের কাছে পৌঁছেছে।
নায়িকা হয়তো অন্য কোথাও, অন্য জীবনে। হয়তো সে-ও কোনো এক সন্ধ্যায় বৃষ্টির শব্দে থমকে দাঁড়ায়। হয়তো তার মনেও ভেসে আসে নীলের নীরবতা। তারা জানে না একে অপরের বর্তমান—কিন্তু বিশ্বাস জানে। সেই বিশ্বাসই তাদের শেষ সেতু।
এই গল্প তাই মিলনের নয়। এই গল্প ফুলের মতো ঝরে পড়া ভালোবাসার। যে ভালোবাসা মাটিতে পড়ে গিয়েও নষ্ট হয় না—বরং সেখানেই সবচেয়ে গভীরভাবে বেঁচে থাকে।
নীল আর অপেক্ষাকে কষ্ট ভাবে না। অপেক্ষা এখন তার জীবনের ভাষা—নীরব, ধীর, গভীর। সে জানে, সে এমন এক ভালোবাসা পেয়েছিল, যা তাকে কাউকে পাওয়ার জন্য নয়—মানুষ হওয়ার জন্য এসেছিল।