ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৭:১৪:২০ PM

তারেক রহমান:বিএনপির রাজনীতির নতুন অধ্যায়

মান্নান মারুফ
23-01-2026 04:10:15 PM
তারেক রহমান:বিএনপির রাজনীতির নতুন অধ্যায়

বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে যেসব নেতা দীর্ঘ সময় প্রবাসে থেকেও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, তাদের মধ্যে তারেক রহমান অন্যতম। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক যুগেরও বেশি সময় দেশের বাইরে অবস্থান করলেও দলীয় রাজনীতি, কৌশল নির্ধারণ ও নেতৃত্বের প্রশ্নে ছিলেন সক্রিয় ও প্রভাবশালী। ২০২৫ সালের শেষ দিকে তাঁর দেশে প্রত্যাবর্তন এবং ২০২৬ সালের শুরুতে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ বিএনপির রাজনীতিতে শুধু একটি পরিবর্তন নয়, বরং একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, মামলা-মোকদ্দমা, প্রবাসজীবন এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনিবার্য আলোচ্য চরিত্র। তাঁর প্রত্যাবর্তন বিএনপিকে যেমন নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে, তেমনি দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

পারিবারিক পরিচয় ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

তারেক রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর। তিনি স্বাধীনতার ঘোষক, সেক্টর কমান্ডার ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান। স্বাধীনতার ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ঐতিহ্যে গড়া একটি পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। ফলে রাজনীতি তাঁর জীবনে ছিল স্বাভাবিক এক উত্তরাধিকার। তবে শুধুই পারিবারিক পরিচয় নয়, বরং ব্যক্তিগত মেধা, সংগঠক হিসেবে দক্ষতা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনুশীলনের মাধ্যমেই তিনি নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেন। সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ধাপে ধাপে নেতৃত্বের আসনে পৌঁছান তিনি।

শিক্ষা ও প্রারম্ভিক জীবন

ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে তারেক রহমানের শিক্ষাজীবনের সূচনা। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। যদিও স্নাতক পর্যায় সম্পন্ন করার আগেই তিনি পড়াশোনা থেকে সরে এসে বস্ত্র ও নৌ-যোগাযোগ খাতে ব্যবসায় যুক্ত হন, তবুও রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ কখনো থেমে থাকেনি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক তত্ত্ব, উন্নয়ন দর্শন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মডেল নিয়ে তাঁর অধ্যয়ন ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চিন্তাকে সমৃদ্ধ করে। পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি নিজেকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করেন নেতৃত্বের গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য।

রাজনীতিতে পদচারণা

নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই তারেক রহমানের রাজনৈতিক সক্রিয়তা দৃশ্যমান হয়। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি মাতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেশব্যাপী নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন। ওই সময় থেকেই মাঠপর্যায়ের রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা গড়ে ওঠে। ২০০১ সালের নির্বাচনে তাঁর ভূমিকা ছিল আরও সংগঠিত ও কৌশলগত। এই নির্বাচনের পর বিএনপির ভেতরে তিনি একজন সম্ভাবনাময় সংগঠক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। দলের তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত হয়।

২০০২ সালে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি দেশজুড়ে ব্যাপক গণসংযোগ শুরু করেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়, সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম তদারকি এবং সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের মাধ্যমে তিনি দলের তরুণ অংশের মধ্যে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন। এই সময়েই তিনি ‘প্রতিষ্ঠাতার সন্তান’ পরিচয়ের সীমা ছাড়িয়ে একজন দক্ষ সংগঠক ও রাজনৈতিক কৌশলবিদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

বিতর্ক, মামলা ও প্রবাস জীবন

২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারেক রহমান গ্রেপ্তার হন এবং একাধিক মামলার মুখোমুখি হন। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তাঁকে দণ্ডিত করা হয়। বিএনপি শুরু থেকেই এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে এসেছে। কারাবন্দি অবস্থায় তাঁর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ দেশ-বিদেশে মানবাধিকার মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে যান এবং দীর্ঘ সময় সেখানেই অবস্থান করেন। অনেকের কাছে এটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ‘নির্বাসিত অধ্যায়’ হলেও বাস্তবে প্রবাসে থেকেও তিনি দলীয় নীতিনির্ধারণ, আন্দোলনের কৌশল প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

এই সময়েই তিনি আধুনিক রাজনৈতিক কৌশল, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং প্রবাসী নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নতুন মাত্রা দেন।

২০২৪-এর আন্দোলনে ভূমিকা

২০২৪ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তারেক রহমান সরাসরি মাঠে উপস্থিত না থাকলেও কৌশলগত ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ছিলেন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি—এক কথায় নৈপথ্যের নায়ক। প্রবাসে অবস্থান করেও তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে দিকনির্দেশনা দেন। ভার্চুয়াল বৈঠক, ভিডিও বার্তা ও সাংগঠনিক নির্দেশনার মাধ্যমে আন্দোলনের রূপরেখা নির্ধারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর ধারাবাহিক বক্তব্যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, জনসম্পৃক্ততা এবং আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

যুগপৎ আন্দোলনের কাঠামো কার্যকর রাখা এবং বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সামাজিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করাও ছিল তাঁর কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তিনি সংকটকালে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম একজন কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হন।

রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন

২০২৪ সালে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তনের পর আদালতের রায়ে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হয়। ফলে তাঁর দেশে ফেরার পথ সুগম হয়।

২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে দেশে ফেরেন। ঢাকায় তাঁর আগমন উপলক্ষে বিমানবন্দর থেকে শুরু করে শহরের বিভিন্ন স্থানে নেতাকর্মীদের ঢল নামে। তাঁর প্রত্যাবর্তন বিএনপির রাজনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে এবং দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি হয়।

২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর দলটি পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব কাঠামোয় ফিরে আসে।

নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় উপস্থিতি

দলীয় নেতৃত্ব গ্রহণের পরপরই তারেক রহমান নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় হন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৭ এবং বগুড়ার একটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেন। ২২ জানুয়ারি থেকে তিনি দলীয় ও জোট প্রার্থীদের পক্ষে সরাসরি মাঠে নামেন।

সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তাঁর নির্বাচনী প্রচার ব্যাপক সাড়া ফেলে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের মাধ্যমে তিনি নির্বাচনী মাঠে নিজের শক্ত অবস্থান জানান দেন।

তাঁর প্রচারে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শনের পাশাপাশি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। পর্যবেক্ষকদের মতে, তাঁর বক্তব্যে আগের তুলনায় পরিমিতি, সংযম এবং রাজনৈতিক পরিপক্বতার স্পষ্ট ছাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সাধারণ মানুষের ধারণা, তিনি উভয় আসনেই বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করবেন। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যেমন বেগম খালেদা জিয়া কখনো নির্বাচনে পরাজিত হননি, তেমনি তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও বিজয়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। তাঁর পক্ষে জনসমর্থনের একটি সুস্পষ্ট জোয়ার তৈরি হয়েছে বলেই মনে করছেন তারা।

ব্যক্তিজীবন ও পারিবারিক সহচরিতা

১৯৯৪ সালে তারেক রহমানের সঙ্গে ডা. জোবায়দা রহমানের বিবাহ হয়। ডা. জোবায়দা রহমান একজন চিকিৎসক এবং সাবেক নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের কন্যা।

রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা চড়াই-উতরাইয়ে স্ত্রী ও কন্যা জাইমা রহমান তাঁর পাশে অবিচল সহচর হিসেবে রয়েছেন। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে পরিবারই ছিল তাঁর প্রধান শক্তির উৎস।

তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একদিকে যেমন আশাবাদী অনুসারীদের কাছে নেতৃত্বের প্রতীক, অন্যদিকে সমালোচকদের কাছে বিতর্কিত চরিত্র। তবে এটাও অস্বীকার করা যায় না যে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, মামলা-মোকদ্দমা, প্রবাস জীবন এবং সময়ের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন।

বিএনপির পুনর্গঠন, নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তা—এই তিন ধারায় তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানকে মূল্যায়ন করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানের এই নতুন অধ্যায় কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনী ফলাফল, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা এবং তাঁর নেতৃত্বের বাস্তব প্রয়োগের ওপর। তবে এটুকু নিশ্চিত, তাঁর প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নতুন করে সূচিত হয়েছে, যার প্রভাব আগামী দিনের রাজনীতিতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হবে।