পর্ব ১: সিডনির গোধূলি
সিডনির হারবার ব্রিজে গোধূলির নরম আলো পড়ছে। সূর্য পশ্চিম আকাশে ডুবে যাচ্ছে, আর শহরের কাচের অট্টালিকা ধীরে ধীরে তার রঙ বদলাচ্ছে—কমলা, গোলাপি আর হালকা লাল। কুদ্দুছ সেখানে বসে আছে, হাতে ল্যাপটপ। তার চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা, যা কেউ সহজে বুঝতে পারে না।
“আজও যেন একদিনের শেষ যুদ্ধে হেরে এলাম,” কুদ্দুছ ভেতরে ভেতরে বলল, নিজের মনের অশান্তি আঁকড়ে ধরে।
সে এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, বাখেরগঞ্জের। স্কলারশিপ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছে, স্বপ্ন আর ধার-দেনার মিশ্রণে। তবে পড়াশোনা কখনো একা কষ্ট নয়, তার জীবনে যে চাপ, তা বেশি—এটি সে জানে।
একটি ছোট ক্যাফে তার আশ্রয়। সেখানে সে ওয়েটারের কাজ করছে। তার প্রতিদিনের রুটিন, ল্যাপটপে পড়াশোনা, তারপর অল্প ঘণ্টার ক্যাফে কাজ—সবই যেন একসাথে মিলেমিশে তার জীবনকে বোঝায়।
একদিন বিকেলের আলো ছিটকে পড়ছে ক্যাফের কাচের জানালায়, তখন সে লক্ষ্য করল একজন মেয়েকে। অ্যামেলিয়া। সাদা শার্ট আর হালকা নীল স্কার্ট। সে যেন ক্যাফের হালকা আলোতেই ঝলমল করছে।
“আপনি কফি নেবেন?” কুদ্দুছ জিজ্ঞেস করল, গলার স্বর একটু অস্থির।
“ল্যাটে হবে, দয়া করে। আর হ্যাঁ, এই শহরের ছবি দেখছি ল্যাপটপে—আপনি কি নিজে তুলেছেন?” অ্যামেলিয়ার চোখে কৌতূহল।
কুদ্দুছ হাসল, অল্পের জন্য। “হ্যাঁ, ঢাকার ছবি। শহরের কোলাহল, ধুলোমাখা রাস্তা, বর্ষার পানি—সব দেখাচ্ছি।”
অ্যামেলিয়ার চোখ বড় হয়ে গেল। “আপনি ঢাকার মানুষ? আমি আগে কখনো এমন দৃঢ় চোখের মানুষ দেখিনি। যেন লড়াই আর আশা একসাথে চোখে বদ্ধ। আপনি কি সব দেখেছেন?”
কুদ্দুছ হালকা চুম্বকের মতো মৃদু হাসল। “আমার চোখে দেখার গল্প অনেক। গ্রামের মেঠো পথ, বর্ষার ঘ্রাণ, ছোট ছোট সুখ—সবই আছে। আর আপনার জীবন কেমন?”
অ্যামেলিয়ার চোখের আড়ালে এক ধরনের খালি কাঁপন। “আমার বাবা—ব্যবসায়িক প্রভাবশালী। তার এই আভিজাত্য, ধনসম্পদ, আর তার কারণে আমার একাকীত্বের দিনগুলো।”
কুদ্দুছ ভাবল, এই ফাঁকবাজ দুনিয়ায় এমন মানুষও আছে—যার জীবন বাহ্যিকভাবে পূর্ণ, কিন্তু ভিতরে ফাঁপা।
“শুনুন,” কুদ্দুছ ধীরে বলল, “প্রত্যেকের জীবনই সংগ্রাম। ধনসম্পদ থাকুক বা না থাকুক, সুখের মান একটাই—আপনি কি তা খুঁজে পান?”
অ্যামেলিয়া কাঁধ নাড়ল। “আমরা কি একসাথে তা খুঁজে বের করতে পারি?”
কুদ্দুছের গা আলতো করে কাঁপল। এক অদ্ভুত আনন্দ মেশানো অস্থিরতা। “হয়তো, যদি আমাদের চোখ মেলানোর সাহস থাকে।”
তাদের এই প্রথম সংলাপ ছিল ছোট, সরল, তবে ভিতরে বহুকাল ধরে থাকা এক নতুন সম্পর্কের সূচনা। তারা একে অপরের চোখে মুহূর্তে অন্য বিশ্বের খোঁজ পেল।
গোধূলি ঢলে গেছে। শহরের আলো রঙ বদলাচ্ছে। কফের গরম বাষ্প ধীরে ধীরে বাতাসে মিলছে, আর কুদ্দুছ ও অ্যামেলিয়া উভয়ই বুঝতে পারছে, আজকের দিন শুধু আরেকটি দিন নয়। এটি একটি শুরু।
সেই রাতে, কুদ্দুছ তার কক্ষে বসে ভাবল—“এটাই কি নতুন জীবন? আমি কি সত্যিই প্রস্তুত?” তবে উত্তর তার জানা নেই। শুধু এতটুকু জানে, অ্যামেলিয়ার চোখে একটি নতুন আশা আছে, যা তার একাকীত্ব ভাঙতে পারে।
“শহরের আলো নিভতে শুরু করেছে, কিন্তু আমার হৃদয়ে এখনো একটি নরম আলো জ্বলে—নতুন দিনের, নতুন গল্পের।”
চলবে..........