পর্ব ৯: সিডনি থেকে ঢাকা
ভোরের সূর্যের প্রথম কিরণ ঢাকা বিমানবন্দরের টার্মিনালে এসে পড়ছে। কুদ্দুছের হৃদয় অস্থির—উত্তেজনা আর ভয়ের মিশ্রণ। হাতে অ্যামেলিয়ার হাত। তিনি জানেন, আজকের দিন তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর মধ্যে একটি।
“তুমি কি জানো, কুদ্দুছ?” অ্যামেলিয়া ফিসফিস করে বলল, “আমি ঠিক এখনই বুঝতে পারছিৃ পৃথিবীর সব আলো, সব আভিজাত্য, সব প্রভাব—কোনোটাই সত্যিই আমার জন্য মূল্যবান নয়। শুধু তোমার সঙ্গে থাকা।”
কুদ্দুছের চোখে অদ্ভুত শান্তি। “আমি জানি। এবং আমরা একে অপরকে হারাব না। এই শহর, এই নতুন জীবন—সবই সহজ হয়ে যাবে যদি তুমি পাশে থাকো।”
বিমানের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তারা ঢাকার গরম, ভ্যাপসা বাতাসে প্রবেশ করল। অ্যামেলিয়ার চোখে বিস্ময়। “এত মানুষ! এত শব্দ! এত ভিড়!”
কুদ্দুছ হেসে বলল, “এটাই আমার শহর। কফির দোকের গরম, রাস্তায় মানুষের কোলাহল, ধুলোমাখা মাটির ঘ্রাণ—সবই আমার পৃথিবী। এবং আজ তুমি সেই পৃথিবীতে প্রবেশ করেছ।”
বাহিরে তাদের দেখা হলো আফরান কাকা ও কুদ্দুছের মা—চোখে কনমণি জল। অ্যামেলিয়ার চোখে অদ্ভুত শান্তি। “আমি বুঝতে পারছি,” সে বলল, “এতদিন আমি যে শান্তি খুঁজছিলাম, তা কোনো অট্টালিকায় নেই। আছে এই মাটির মানুষগুলোর মাঝে।”
কাফের দোক বা সিডনির আকাশের ঝকঝকে আলো নেই। এখানে আছে বাংলাদেশের মেঘলা আকাশ, এক পশলা বৃষ্টি, আর মানুষের নরম মাটির সাথে সংযোগ। অ্যামেলিয়া হাসল—প্রথমবারের মতো পুরোপুরি নিঃশ্বাস নিল।
বাড়ি পৌঁছে, তারা ভাঙাচোরা ঘরের দরজায় দাঁড়াল। কুদ্দুছের মা প্রথমে অবাক, তারপর চোখে জল ধরে ফেললেন।
“তুমিৃ তুমি কেমন?” কণ্ঠে কাঁপন।
অ্যামেলিয়া হাত মেলাল। “আমি ভালো আছি। এবং আমি এখানেই থাকতে চাই।”
কুদ্দুছ কণ্ঠে কেবল হালকা ফিসফিস—“আমি জানি, সবই সহজ নয়। তবে তুমি পাশে থাকলে, সব বাধা সহজ হয়ে যাবে।”
বিকেলের আলো বারান্দায় পড়ছে। অ্যামেলিয়া চায়ের কাপ হাতে, কেবল বাইরে তাকিয়ে আছে। আফরান কাজ শেষে ফিরে এসে দেখল—অ্যামেলিয়া কত সহজে এই নতুন জীবনকে নিজের করে নিয়েছে।
“তুমি কি জানো, আমি কখনও ভাবিনি,” আফরান হেসে বলল, “কেউ এত সহজে আমাদের ছোট্ট জীবনকে বুঝতে পারবে?”
অ্যামেলিয়া হেসে বলল, “আমি শুধু অনুভব করি। এবং আমি জানি, আমি এখানে আছি এক ভালোবাসার জন্য যা সবকিছুর চেয়ে বড়।”
বিকেলের রোদ বারান্দায় পড়ছে। কফির গরম, ধুলোমাখা বাতাস—সব মিলেমিশে তাদের ছোট পৃথিবী তৈরি করেছে। কুদ্দুছ ও অ্যামেলিয়া একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসছে। সিডনির ঝকঝকে আকাশের চেয়েও তাদের হৃদয়ে বড় এক পৃথিবী তৈরি হয়েছে—যেখানে ভালোবাসা সবকিছুর চেয়ে শক্তিশালী।
“তুমি কি জানো,” কুদ্দুছ বলল, “আমি এই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এই শহরের, এই মাটির, এই মানুষের মধ্যে আমাদের গল্প লেখা হবে।”
অ্যামেলিয়া হাত ধরে বলল, “আমরা একে অপরকে হারাব না। আমাদের পৃথিবী সব বাধা পার করবে।”
সেদিন বিকেলে, আকাশে মেঘলা আলো, মাটির ঘ্রাণ, চা-পানির গরম—সব মিলেমিশে তাদের হৃদয়ে একটি অদ্ভুত শান্তি এনে দিল।
“সিডনির ঝকঝকে আকাশ নেই, আছে বাংলাদেশের মেঘলা আকাশ। তবে আমাদের হৃদয়ে যে ভালোবাসার স্থান, তা কোনো মানচিত্র বা পাসপোর্ট দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। আমরা নিঃস্ব, কিন্তু আমাদের ভালোবাসা সমুদ্রের সমান বিশাল।”
চলবে.............