ঢাকা, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ১২:১০:১৪ AM

নির্বাচন ও আন্তর্জাতিক সমীকরণে গভীর সংকটে দেশ

মান্নান মারুফ
16-01-2026 08:41:26 PM
নির্বাচন ও আন্তর্জাতিক সমীকরণে গভীর সংকটে দেশ

বাংলাদেশের রাজনীতি বর্তমানে এক জটিল, বহুমাত্রিক ও সংবেদনশীল পর্যায়ের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে হিসাব–নিকাশ ও কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে, তা কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানামুখী সমীকরণ। ফলে বাংলাদেশ ক্রমেই একটি বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক স্বার্থের বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে—এমন আশঙ্কা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো স্পষ্টতই বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নেতৃত্ব সংকট, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর নীরব কিন্তু কার্যকর হস্তক্ষেপ—এই দুই চাপে রাজনীতির স্বাভাবিক গতিপথ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশি কূটনীতিকদের ভূমিকা ও বিভিন্ন রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ বাংলাদেশের নির্বাচনকে একটি আন্তর্জাতিক গুরুত্বের ইস্যুতে পরিণত করেছে।

দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার সময় ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক সহনশীলতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করেছে—এমন অভিযোগ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল থেকে উঠে এসেছে। বিরোধী মত দমন, নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক শক্তির অপব্যবহারের অভিযোগে দলটির ভাবমূর্তি দেশ ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এই দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক আচরণের ফলস্বরূপ দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশ বর্তমানে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে। হত্যা, গুম, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগে একাধিক মামলা তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। তারপরও  ঐ দলটি  থেমে নেই। দলটির প্রভাবশালী এক নেতা নতুন করে দলকে সংগঠিত করতে নানা মুখী চেষ্টা করছেন। সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে সামনে আনার চেস্টা করছেন। তাদের মধ্যে এ বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনায় কে সভাপতি কে সাধারন সম্পাদক হবেন এসব বিষয়ও উঠে এসেছেন। বর্তমানে ঐ আওয়ামীলীগ নেতা রাশিয়া অবস্থান করছেন। ওখানেও তার বেশ কয়েক দফা বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে বলে সুত্র দাবি করেছে।

অন্যদিকে দেশের আরেকটি বড় রাজনৈতিক দল বর্তমানে ক্ষমতার বাইরে থাকলেও জনসমর্থনের দিক থেকে এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি জরিপ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে দেশের বৃহৎ অংশের ভোট এই দলটির পক্ষে যেতে পারে। তবে দলটি অভ্যন্তরীণভাবে গভীর সংকটে ভুগছে। নেতৃত্বে বিভাজন, নীতি নির্ধারণে অস্পষ্টতা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দমন-পীড়নের প্রভাব তাদের সংগঠনকে দুর্বল করে রেখেছে। এ ছাড়া কতিপয় রাজনৈতিক দলের অপপ্রচারের কারনে কিছুটা হলেও বেকায়দায় রয়েছেন এ দলটি। ফলে একদিকে জনগণের প্রত্যাশা, অন্যদিকে বাস্তব রাজনৈতিক সক্ষমতার ঘাটতি ও প্রতিপক্ষের রোষানলের কারনে দলটির শীর্ষ নেতারা হিমশিম খাচ্ছেন।

এই দলটিও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের প্রভাবশালী কয়েকটি রাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যে অবস্থান নিয়েছে, তা দলটির কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মানবাধিকার, অবাধ নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রশ্নে বিদেশি চাপকে দলটি একদিকে সুযোগ হিসেবে দেখলেও, অন্যদিকে তা জাতীয় রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাব বৃদ্ধির আশঙ্কাও তৈরি করছে।

এদিকে আরেকটি রাজনৈতিক দল, যারা অতীতে সীমিত প্রভাব রাখলেও বর্তমানে ক্ষমতায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় বেশ সক্রিয়, তারা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ জোরদার করেছে। আফ্রিকার একটি দেশ এবং এশিয়ার দুটি মুসলিম দেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের পাশাপাশি প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক গভীর করার চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যোগাযোগ কেবল রাজনৈতিক সমর্থন নয়, বরং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এই দলটি নিজেদেরকে একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যারা বিদ্যমান প্রধান দলগুলোর ব্যর্থতার সুযোগ নিতে প্রস্তুত।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রভাবশালী একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিবেশী দেশের একটি সংস্থার পরামর্শে তারা পূর্বের জোট রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে এককভাবে প্রার্থী দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। এ    দলটিও ক্ষমতার অংশীদার হতে চায় এবং সে লক্ষ্যে দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন শক্তির নীরব সমর্থন লাভের চেষ্টা করছে। ধর্মীয় আবেগ, সাংগঠনিক শক্তি এবং আঞ্চলিক প্রভাব—এই তিনটি উপাদানকে তারা রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করছে।

এই সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন আর কেবল জাতীয় সীমার মধ্যে আবদ্ধ নেই। বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক পথ ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ফলে নির্বাচনকে ঘিরে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কৌশলে আন্তর্জাতিক হিসাব-নিকাশ অনিবার্যভাবে যুক্ত হচ্ছে।

তবে এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে—বাংলাদেশের জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা কতটা প্রতিফলিত হবে? নির্বাচন যদি আন্তর্জাতিক চাপ, কূটনৈতিক সমীকরণ ও পর্দার আড়ালের সমঝোতার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তবে গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিদেশি প্রভাবের ওপর ভর করে গড়ে ওঠা ক্ষমতা সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী ও স্থিতিশীল হয় না।

আগামী নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এটি কেবল সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রেও একটি বড় পরীক্ষা। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত স্বল্পমেয়াদি ক্ষমতার হিসাবের বাইরে গিয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। অন্যথায় বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি আন্তর্জাতিক চক্রান্ত ও পরাশক্তির কৌশলগত খেলায় ব্যবহৃত ভূখণ্ডে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে—যার মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হবে দেশের সাধারণ মানুষকেই। এ ব্যাপারে বিএনপির একজন সিনিয়র নেতার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি কোন কথা বলতে চায় নি। বরং তারা এখন নির্বাচন নিয়ে ব্যাস্ত আছেন বললেন এ রিপোটারকে। কুটনৈতিক মেরুকরন নিয়ে জামায়াতের এক নেতার সাথে আলাপ হলেও তিনিও এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাননি ।