ঢাকা, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:৩০:০০ PM

নিঃশব্দ বার্তা–১

মান্নান মারুফ
17-01-2026 01:38:49 PM
নিঃশব্দ বার্তা–১

(উপন্যাসধর্মী রচনা)

কুদ্দুছ দেশে ফিরছে মনে কতই না আনন্দ। দীর্ঘদিন পর বাড়ি ফিরছে। তিনিই জীবনের সব রোদ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, যেন পরিবারের উঠোনে কখনো ছায়া না পড়ে। এই একটিমাত্র বাক্যেই হয়তো তাঁর জীবনের সমস্ত ইতিহাস লেখা হয়ে যায়। তবু ইতিহাসের মতো করে যদি বলা হয়, তবে বলতে হয়এই মানুষটি ছিলেন সেই প্রবাসী, যাঁর জীবনের সকাল শুরু হতো সূর্যের আগেই, আর রাত শেষ হতো ক্লান্তির ভারে চোখ বুজে আসার অনেক পরে।

পঁচিশ বছর। সংখ্যাটা ছোট নয়। এই দীর্ঘ সময় তিনি কাটিয়েছেন মরুভূমির দেশেযেখানে দিনের রোদ আগুনের মতো ঝরে পড়ে, আর রাতের নীরবতা মানুষের ভেতরের কষ্টগুলোকে আরও তীব্র করে তোলে। সেখানে তাঁর কোনো উৎসব ছিল না, ছিল না কোনো নিজস্ব আনন্দ। ছিল কেবল দায়িত্ব। পরিবারের মুখে হাসি রাখার দায়িত্ব, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগানোর দায়িত্ব, বৃদ্ধ মায়ের ওষুধের দায়িত্ব, সংসারের প্রতিটি অভাব ঢেকে রাখার দায়িত্ব।

এই দায়িত্ববোধই তাঁকে প্রতিদিন কাজে ঠেলে দিত। কখনো অসুস্থ শরীর নিয়ে, কখনো তীব্র মাথাব্যথা কিংবা বুকের ভেতরের চাপ লুকিয়ে রেখে। সহকর্মীরা জানত না, ফোনের ওপারে থাকা পরিবারও জানত নাএই মানুষটা কতটা ক্লান্ত। তিনি নিজেও হয়তো স্বীকার করতেন না। কারণ তিনি জানতেন, দুর্বলতা দেখানোর সুযোগ তাঁর নেই। তিনি প্রবাসী। তাঁর কাঁধে সংসারের ভর।

দেশে ফেরা ছিল তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন। বিশেষ করে বয়স পঞ্চান্ন ছুঁতেই সেই স্বপ্ন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। মনে মনে ভাবতেনআর কষ্ট নয়। এবার ফিরবো। মায়ের মাটিতে পা রাখবো। সকালে উঠোনে দাঁড়িয়ে কুয়াশা দেখবো। স্ত্রীর হাতে চায়ের কাপ নেবো। সন্তানদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেবো। এই ছোট ছোট দৃশ্যগুলোই ছিল তাঁর বড় স্বপ্ন।

ফিরে আসার টিকিট কেটে যখন তিনি শেষবারের মতো প্রবাসের ঘরটি তালাবদ্ধ করলেন, তখন তাঁর চোখে জল ছিল। সেই জল কষ্টের নয়, স্বস্তির। মনে হচ্ছিল, দীর্ঘ যুদ্ধের পর তিনি বুঝি অবশেষে বিশ্রাম নিতে যাচ্ছেন। বিমানবন্দরে বসে অপেক্ষার সময় তিনি মায়ের কথা ভাবছিলেন, ভাবছিলেন বাড়ির দরজার কথা, যেখানে দাঁড়িয়ে সবাই তাঁকে বরণ করে নেবে।

কিন্তু নিয়তি অনেক সময় মানুষের স্বপ্নের দিকে তাকিয়েও নির্দয় থাকে।

বিমান বাংলাদেশে অবতরণ করল। দীর্ঘ যাত্রা শেষে তিনি অবশেষে নিজের দেশের মাটিতে পা রাখলেন। হয়তো মনে মনে বলেছিলেন—“আলহামদুলিল্লাহ।কিন্তু সেই মুহূর্তেই শরীর যেন হঠাৎ তাঁকে ছেড়ে দিল। বুকের ভেতর জমে থাকা অজস্র না-বলা কষ্ট একসঙ্গে আছড়ে পড়ল। তিনি দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। কারও চোখে পড়ার আগেই, পরিবারের কাউকে একবার দেখার আগেই, তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।

এয়ারপোর্টের ফ্লোরে পড়ে থাকা সেই দেহটা তখন আর কেবল একজন মানুষ ছিল না। ওটা ছিল এক জীবনের সমস্ত ত্যাগের প্রতীক। যাঁর হাতের রক্তে ঘাম লেগে ছিল, যাঁর চোখে কখনো নিজের জন্য স্বপ্ন ছিল নাশুধু অন্যদের ভালো রাখার আকুতি ছিল।

রিসিভ করতে আসা পরিবার কিছুক্ষণ পরে জানতে পারলযাঁকে নিতে এসেছে, তিনি আর আসবেন না। তাঁদের জন্য অপেক্ষা করে রাখা বুকটা চিরতরে থেমে গেছে। স্ত্রী যখন খবরটি শুনলেন, তিনি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারলেন না। সন্তানরা বোবা হয়ে গেল। এয়ারপোর্টের সেই জায়গাটা তাদের কাছে হয়ে উঠল এক ভয়ংকর স্মৃতিস্তম্ভযেখানে আনন্দের অপেক্ষা বদলে গেল হাহাকারে।

এই মানুষটা একা মরলেন, কিন্তু তাঁর কষ্ট একা ছিল না। তাঁর কষ্ট ছড়িয়ে আছে অসংখ্য প্রবাসীর জীবনেযাঁরা নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে পরিবারের হাসি কেনেন। যাঁদের ফেরার পথ সব সময় নিরাপদ নয়। যাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায় অনেক সময় এমনই নীরব হয়।

তিনি জীবনের সব রোদ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই রোদেই তিনি পুড়ে গেলেন। পরিবারের উঠোনে ছায়া পড়ল ঠিকইকিন্তু সেই ছায়া এল তাঁর শূন্যতায়।

চলবে…………