ঢাকা, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:১২:১২ PM

মিরপুরে আলোচনার কেন্দ্রে ব্যারিস্টার আরমান

মান্নান মারুফ
21-01-2026 01:12:50 PM
মিরপুরে আলোচনার কেন্দ্রে ব্যারিস্টার আরমান

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাশেম আরমান, যিনি ব্যারিস্টার আরমান নামেই অধিক পরিচিত। প্রয়াত শিল্পপতি ও জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর পুত্র ব্যারিস্টার আরমান এবারের নির্বাচনে মিরপুর আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্যারিস্টার আরমানের ক্ষেত্রে প্রচলিত রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার পাশাপাশি একটি শক্তিশালী মানবিক সহানুভূতির আবহ তৈরি হয়েছে, যা তাকে নির্বাচনী দৌড়ে আলাদা মাত্রা দিচ্ছে। দীর্ঘ প্রায় নয় বছর নিখোঁজ থাকার পর সম্প্রতি তার মুক্তির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

দীর্ঘ নিখোঁজের পর মুক্তি

পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ব্যারিস্টার আরমান বেশ কয়েকমাস আগে গভীর রাতে মুক্তি পান। তার পরিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করে। ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় নিজ বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাকে আটক করে নিয়ে যায় বলে পরিবারের অভিযোগ।

সে সময় তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টসংলগ্ন মিরপুর ডিওএইচএসের ১১ নম্বর সেকশনের ৭ নম্বর রোডের ৫৩৪ নম্বর বাড়ির দোতলায় বসবাস করতেন। অভিযোগ অনুযায়ী, দুই শিশু সন্তান, স্ত্রী ও বোনের সামনেই তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পর দীর্ঘ সময় ধরে তার কোনো আনুষ্ঠানিক সন্ধান পাওয়া যায়নি।

মুক্তির দাবিতে অবস্থান ও চাপ

ব্যারিস্টার আরমানের মুক্তির দাবিতে ঐ দিন রাতে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার কচুক্ষেত এলাকায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা অবস্থান নেন। কর্নেল (অব.) সামসেরের নেতৃত্বে প্রায় ২০–২৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

অবস্থানকারীরা গণমাধ্যমকে জানান, গোয়েন্দা সংস্থার তথাকথিত “আয়না ঘর”-এ অনেক মানুষকে বেআইনিভাবে আটক করে রাখা হয়েছে বলে তাদের দাবি। তারা বলেন, বন্দিদের অক্ষত অবস্থায় পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করা পর্যন্ত তারা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। এ কর্মসূচিতে গুম হওয়া স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-ও সংহতি প্রকাশ করে অংশ নেয়।

চাপের এক পর্যায়ে ব্যারিস্টার আরমানের মুক্তির খবর পাওয়া যায় বলে আন্দোলনকারীরা জানান।এ সময় উপস্থিত লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক বলেন,“বছরের পর বছর ডিজিএফআই, র‍্যাব ও পুলিশের বিভিন্ন বন্দিশালায় অসংখ্য মানুষকে গুম করে রাখা হয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। তাদের দ্রুত মুক্তি না দিলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”তিনি আরও জানান, বিষয়টি সেনা কর্তৃপক্ষ ও সেনাপ্রধানকে জানানো হয়েছে এবং তাদের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।

নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রভাব

ব্যারিস্টার আরমানের মুক্তির ঘটনা নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। মিরপুর এলাকায় তার পরিচিতি তিনটি মাত্রায় আলোচিত হচ্ছে—
এক, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে তার রাজনৈতিক পরিচয়;
দুই, তার পিতা মীর কাসেম আলীর পরিচিতি ও প্রভাব;
তিন, দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার ঘটনায় নির্যাতিত ব্যক্তি হিসেবে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি।

এই তিনটি পরিচয়ের সম্মিলিত প্রভাব তাকে নির্বাচনী মাঠে শক্ত অবস্থানে নিয়ে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সম্ভাবনা

স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এবারের নির্বাচনে ব্যারিস্টার আরমানের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে। মিরপুর এলাকায় বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি থাকলেও ব্যারিস্টার আরমানের সাম্প্রতিক মুক্তি ও তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া মানবিক আবেগ ভোটের সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

একজন স্থানীয় ভোটার বলেন,“রাজনীতি এক বিষয়, কিন্তু একজন মানুষ বছরের পর বছর নিখোঁজ ছিলেন—এটা মানুষকে নাড়া দেয়। অনেকেই সহানুভূতির জায়গা থেকে তার দিকে ঝুঁকছেন।”সব মিলিয়ে মিরপুর আসনে এবারের নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানবাধিকার, গুম ও নিখোঁজের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। ব্যারিস্টার আরমানের মুক্তি সেই আলোচনাকে আরও তীব্র করেছে।যদিও শেষ পর্যন্ত ভোটারদের রায়ই নির্ধারণ করবে কে বিজয়ী হবেন, তবে বর্তমান বাস্তবতায় ব্যারিস্টার আরমান মিরপুর আসনের অন্যতম আলোচিত ও শক্তিশালী প্রার্থী—এ কথা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ স্বীকার করছেন।