ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:১২:৫৬ PM

অপেক্ষা- ২

মান্নান মারুফ
20-01-2026 12:08:38 PM
অপেক্ষা- ২

 ভিন্ন মানে

মানুষ ভালোবাসাকে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে—
কেউ ভালোবাসে শব্দে, কেউ লেখায়, কেউ আবার চিৎকার করে জানাতে চায়—
“দেখো, আমি কতটা ভালোবাসি।”

সমাপ্তি বিশ্বাস করত, ভালোবাসা যত বেশি শব্দে বাঁধা পড়ে, ততই দুর্বল হয়ে যায়।
কারণ শব্দ একদিন ক্লান্ত হয়, ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দেয়।
কিন্তু দায়িত্ব—সে থেকে যায়। নীরবে, দৃঢ়ভাবে।

নীলকে সে দেখেছিল সেই নীরবতার ভেতরেই।
নীল খুব বেশি কথা বলত না। আবেগের প্রদর্শনী তার স্বভাবে ছিল না।
তবু যখনই দরকার পড়ত, সে থাকত—ঠিক সময়টায়, ঠিক জায়গায়।
সমাপ্তি বুঝেছিল, নীল ভালোবাসে উপস্থিতিতে।

চারপাশের মানুষদের দেখত সে—
কেউ ভালোবাসার নামে দাবি করে,
কেউ ভালোবাসার নামে আঘাত দেয়,
কেউ ভালোবাসার কথা বলে, কিন্তু পাশে থাকে না।
আবার কেউ পাশে থাকে, অথচ কখনো বলে না।

নীল ছিল দ্বিতীয় ধরনের মানুষ।
তার কাছে ভালোবাসা মানে উচ্চারণ নয়—উপস্থিতি।
সমাপ্তি এই নীরবতাকে ভয় পেত না।
কারণ নীলের নীরবতা ছিল ভরসার মতো।

অনেক সময় সমাপ্তি ভাবত—
মানুষ কেন ভালোবাসাকে প্রমাণ করতে চায়?
কেন ভালোবাসার সঙ্গে শর্ত জুড়ে দেয়?
ভালোবাসলে ফোন ধরতেই হবে,
ভালোবাসলে সময় দিতে হবে,
ভালোবাসলে বদলাতে হবে—

এই শর্তগুলো তার কাছে ভয়ংকর লাগত।
নীল কখনো তাকে বদলাতে চায়নি।
সে যেভাবে আছে, সেভাবেই গ্রহণ করেছিল।
এই গ্রহণযোগ্যতাই ছিল তাদের প্রেমের সবচেয়ে গভীর চিহ্ন।

নীলের ভালোবাসা ছিল নিঃশব্দ, কিন্তু অস্পষ্ট নয়।
সে জানত সে কী চায়, আবার এটাও জানত—সে কী চায় না।
সে চায়নি সমাপ্তিকে নিজের ওপর নির্ভরশীল করতে।
সে চায়নি তার ভালোবাসা কারো দুর্বলতার কারণ হোক।
সে শুধু চেয়েছিল—যদি কোনোদিন প্রয়োজন হয়, সে যেন পাশে থাকে।

সমাপ্তি বুঝেছিল,
মানুষ ভালোবাসার কথা ভুলে যেতে পারে,
কিন্তু দায়িত্ব ভুলে যায় না।
আবেগ একসময় শান্ত হয়,
কিন্তু দায়িত্ব থাকলে সম্পর্ক টিকে যায়।

এই কারণেই নীল আবেগ নয়—দায়িত্বকে বেছে নিয়েছিল।

কখনো কখনো সমাপ্তির মনে হতো—
নীল কি খুব বেশি নীরব?
সে কি খুব বেশি অপেক্ষা করে?
কিন্তু পরক্ষণেই নিজের মনেই উত্তর পেত—
নীল কাউকে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে না,
সে প্রস্তুত থাকার জন্য অপেক্ষা করে।

তাদের ভালোবাসায় কোনো তাড়া ছিল না।
সময়কে চাপ দেওয়া হয়নি।
নীল জানত, যা সত্যি—তা সময়ের পরীক্ষায় টিকে যায়।
আর সমাপ্তি জানত, এই ধীরতার ভেতরেই নিরাপত্তা।

মানুষ নীলকে জিজ্ঞেস করত না, সে ভালোবাসে কিনা।
হয়তো সবাই ভাবত—সে শক্ত, অনুভূতিহীন।
কেউ জানত না, তার শক্ত হওয়ার পেছনে
কতটা নীরব ভালোবাসা জমে আছে।

সমাপ্তি জানত—
নীল প্রতিদিন কতবার নিজের ইচ্ছেগুলো চুপ করে গিলে ফেলে
শুধু তার শান্তির জন্য।

নীল কখনো তার ভালোবাসার বোঝা কাউকে দিতে চায়নি।
সে চেয়েছিল, তার ভালোবাসা যেন আশ্রয় হয়—চাপ না।
তাই সে কাউকে দোষ দিত না, কাউকে দায়ী করত না।

তার জীবনে অনেক মুহূর্ত ছিল,
যখন সে চাইলে বলতে পারত—
“থেকো”, “ফিরে এসো”, “আমাকে প্রয়োজন।”

কিন্তু সে বলেনি।
কারণ নীল জানত—
ভালোবাসা চাওয়ার বিষয় নয়,
ভালোবাসা দেওয়ার বিষয়।

সমাপ্তি বুঝেছিল,
সত্যিকারের ভালোবাসা মানে স্বাধীনতাকে সম্মান করা।
নীল কখনো তাকে আটকে রাখতে চায়নি।
সে চেয়েছিল, সমাপ্তি নিজের মতো করে বাঁচুক।
আর যদি সেই পথে কখনো নীলকে দরকার হয়—
সে থাকবে।

রাতে অনেক সময় সমাপ্তি নিজের সঙ্গে কথা বলত।
প্রশ্ন করত—
এই নীরবতা কি একদিন ভুল বোঝাবুঝি হয়ে উঠবে?
তারপর নিজেকেই বোঝাত—
যে ভালোবাসা বোঝার ক্ষমতা রাখে না,
সে শব্দ থাকলেও ভুল বুঝবে।
আর যে বোঝে,
সে নীরবতাতেই বুঝে নেয়।

নীল জানত,
সব মানুষ একই ভাষায় ভালোবাসে না।
কেউ স্পর্শে, কেউ যত্নে, কেউ দূরে থেকে।
তার ভালোবাসা ছিল দূরে থেকে আগলে রাখার মতো—
চোখে দেখা যায় না,
কিন্তু অনুভবে থাকে।

তার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল—
তার ভালোবাসা যেন সমাপ্তির জীবনে ভার হয়ে না দাঁড়ায়।
তাই সে নিজের কাঁধেই তুলে নিত সব ভার—
নিজের কষ্ট, ক্লান্তি, অপূর্ণতা।

সে কখনো নিজেকে প্রশ্ন করেনি—
সে বিনিময়ে কী পাচ্ছে।
কারণ নীল বিনিময়ের জন্য ভালোবাসেনি।
তার কাছে ভালোবাসা ছিল
নিজের একটা অংশ দিয়ে দেওয়া—
ফিরে পাওয়ার আশা ছাড়াই।

মানুষ হয়তো ভাবত, সে কম ভালোবাসে।
কিন্তু সমাপ্তি জানত—
গভীর ভালোবাসা অনেক সময় শব্দহীন হয়।
নদীর গভীরতা যেমন শব্দ করে না,
নীলের ভালোবাসাও তেমনই—
শান্ত, গভীর, নির্ভরযোগ্য।

এই ছিল তাদের ভালোবাসার ভিন্ন মানে—

যেখানে কোনো উচ্চারণ নেই,
কিন্তু আছে দায়।
যেখানে কোনো চিৎকার নেই,
কিন্তু আছে উপস্থিতি।
যেখানে শব্দ শেষ হয়ে যায়,
কিন্তু দায়িত্ব থেকে যায়—
নিঃশব্দ, চিরকাল।

 চলবে........