নীরব সংগ্রাম
কুদ্দুছ চলে যাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি বদলে গেল তার স্ত্রীর জীবন। শোকের সময়টা সবাই ভাগ করে নেয়, কিন্তু শূন্যতার সময়টা কেউ নেয় না। জানাজার দিন শেষ হতেই মানুষ ধীরে ধীরে ফিরে গেল নিজেদের সংসারে। আর সে রয়ে গেল একা—দুটি সন্তান, এক বৃদ্ধ শাশুড়ি, আর ভবিষ্যৎ নামের এক অচেনা অন্ধকার নিয়ে।
স্বামী বেঁচে থাকতে সে কখনো বড় সিদ্ধান্ত নেয়নি। সংসারের ভার ছিল কুদ্দুছের কাঁধে। সে শুধু সামলাত—ঘর, সন্তান, অপেক্ষা। কিন্তু এখন অপেক্ষার মানুষটাই নেই। অপেক্ষা বদলে গেছে দায়িত্বে।
প্রবাস থেকে পাঠানো টাকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ঘরের হিসাবগুলো হঠাৎ করেই কঠিন হয়ে উঠল। যে ঘরটা একসময় নিরাপত্তার প্রতীক ছিল, এখন সেটাই বোঝা মনে হয়। বিদ্যুতের বিল, স্কুলের ফি, ওষুধের খরচ—সবকিছু যেন একসঙ্গে মুখ তুলে দাঁড়াল।
লোকজন সহানুভূতি দেখাল। কেউ বলল,
“আল্লাহ যা করেন ভালোই করেন।”
কেউ বলল,
“আপনি শক্ত থাকবেন।”
কিন্তু শক্ত থাকা মানে কী—তা কেউ বুঝিয়ে দেয়নি।
রাতে সবাই ঘুমালে সে একা বসে থাকত। কুদ্দুছের জামাকাপড় আলমারিতে সাজানো। এখনো তার গন্ধ আছে। সে জামা ছুঁয়ে ছুঁয়ে ভাবত—এই মানুষটাই তো সংসার চালাত, স্বপ্ন দেখত, কষ্ট লুকাত। আজ সে নেই, অথচ সংসারটা ঠিকই চলছে—এটাই কি জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্য?
সন্তানদের সামনে সে কখনো কাঁদত না। মেয়েটার চোখে সে শক্ত মা হতে চেয়েছিল। ছেলেটার কাছে সে হতে চেয়েছিল ভরসা। নিজের কান্না সে গিলে ফেলত। কারণ সে জানত—এখন সে ভেঙে পড়লে সবাই ভেঙে পড়বে।
কিন্তু সমাজ সহজ নয়। কেউ কেউ উপদেশ দেয়, কেউ কেউ প্রশ্ন করে—
“এখন কী করবেন?”
এই প্রশ্নটার ভেতর লুকিয়ে থাকে সন্দেহ, চাপ, ভবিষ্যতের অঘোষিত শর্ত।
সে ধীরে ধীরে বুঝতে শিখল—স্বামীর মৃত্যু শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, সামাজিক পরিচয়েরও পরিবর্তন। সে এখন “কুদ্দুছের স্ত্রী” নয়, সে এখন “বিধবা”। এই একটি শব্দই তাকে আলাদা করে দেয়।
তবু সে হাল ছাড়েনি। সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। ছোট ছোট কাজ শিখেছে। নিজের ভেতরের ভয়কে প্রতিদিন একটু একটু করে জয় করেছে। কেউ হাত ধরেনি, তবু সে হাঁটতে শিখেছে।
কখনো কখনো সে ভাবত—কুদ্দুছ যদি বেঁচে থাকত, হয়তো এই কষ্ট দেখতে হতো না। আবার পরক্ষণেই মনে হতো—এই কষ্টই কি তার ত্যাগের ধারাবাহিকতা নয়?
এই নীরব সংগ্রাম কোনো শিরোনাম পায় না। কোনো সংবাদ হয় না। কিন্তু এই সংগ্রামের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ।
কুদ্দুছ চলে গেছে।
কিন্তু তার রেখে যাওয়া দায়িত্বগুলো এখনো বেঁচে আছে—
তার স্ত্রীর নিঃশব্দ লড়াইয়ে।
চলবে…….