কুদ্দুছ
কুদ্দুছ কখনো নিজেকে নায়ক ভাবেনি। নায়ক হওয়ার মতো কোনো বড় স্বপ্ন, কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার ছিল না। সে শুধু একজন দায়িত্ববান মানুষ হতে চেয়েছিল। সংসারের জন্য নির্ভরযোগ্য একটি ছায়া—যে ছায়ার অস্তিত্ব বোঝা যায় না, কিন্তু না থাকলে অসহনীয় হয়ে ওঠে।
গ্রামের বাড়িটা ছিল তার জীবনের শুরু। ছোট্ট উঠোন, পাশে শিউলি গাছ, আর সন্ধ্যা নামলেই মায়ের ডাকে ঘরে ফেরা। কুদ্দুছের শৈশব খুব বড় কিছু ছিল না, কিন্তু স্নিগ্ধ ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর অল্প বয়সেই সে বুঝে গিয়েছিল—এই সংসারে এখন তাকে বড় হতে হবে। মায়ের চোখে যে ভরসা সে দেখেছিল, সেটাই তার জীবনের প্রথম বোঝা হয়ে উঠেছিল।
প্রবাসে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল না। কিন্তু বিকল্পও ছিল না। দেশে থেকে যা রোজগার হতো, তাতে সংসার চলত না, চলত না ছোট দুই ভাইবোনের পড়াশোনা। কুদ্দুছ তাই নিজের স্বপ্নগুলোকে ভাঁজ করে তুলে রেখেছিল বুকের গভীরে। বিমানে ওঠার দিন সে কাউকে কাঁদতে দেয়নি। মাকেও বলেছিল—“আমি ঠিক ফিরে আসব।” সেই ‘ঠিক’-এর ভেতর যে কত অনিশ্চয়তা লুকানো ছিল, সে তখনো জানত না।
বিদেশের জীবন তাকে দ্রুত বদলে দিয়েছিল। রোদে পুড়ে তার চামড়া কালো হয়েছিল, কিন্তু মন নরমই থেকে গিয়েছিল। প্রতিদিন কাজ শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে সে ফোন ধরত। ওপার থেকে স্ত্রীর কণ্ঠ শুনলেই যেন নতুন শক্তি পেত। সন্তানদের হাসির শব্দ ছিল তার দিনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। নিজের জন্য কিছু চাইত না, শুধু বলত—“ওদের ভালো রাখো।”
কুদ্দুছ জানত, তার শরীর ভালো নেই। বুকের ভেতর মাঝেমধ্যে যে চাপটা হতো, সেটা সে গুরুত্ব দেয়নি। ডাক্তারের কাছে গেলে কাজ বন্ধ হবে—এই ভয়ে সে নীরবেই সহ্য করত। তার কাছে বিশ্রাম মানে ছিল বিলাসিতা, যা তার প্রাপ্য নয়। সে ভেবেছিল, দেশে ফিরে গিয়েই সব দেখাবে, সব সারাবে।
ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কুদ্দুছ অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে গিয়েছিল। যেন বহুদিনের দেনা শোধ করতে যাচ্ছে। সে বাজার থেকে পরিবারের জন্য ছোট ছোট উপহার কিনেছিল—মায়ের জন্য ওষুধ, স্ত্রীর জন্য একটি শাল, সন্তানদের জন্য খেলনা। নিজের জন্য কিছু কেনেনি। তার নিজের চাহিদা ছিল শুধু একটি—ঘরের মেঝেতে নিশ্চিন্তে বসে থাকা।
কিন্তু ভাগ্য কুদ্দুছকে সেই সুযোগ দিল না।
দেশের মাটিতে পা রেখেই সে থেমে গেল। কোনো বিদায় নয়, কোনো শেষ কথা নয়। শুধু একটি নিঃশব্দ পতন। যে মানুষটি সারাজীবন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে, সে মানুষটি সবার অগোচরে ভেঙে পড়ল।
কুদ্দুছের মৃত্যুর পর সবাই তাকে নায়ক বলল। কিন্তু সে বেঁচে থাকতে কেউ তাকে নায়ক বলেনি। বেঁচে থাকতে সে ছিল কেবল একজন প্রবাসী শ্রমিক, একজন সংসারের খুঁটি। মৃত্যুই তাকে নায়ক বানাল।
এই উপন্যাসে কুদ্দুছ কোনো কল্পিত চরিত্র নয়। সে হাজার হাজার কুদ্দুছের প্রতিনিধি—যারা বেঁচে থাকে অন্যদের জন্য, আর মরেও যায় নীরবে।
চলবে………..