ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৮:৩৬:৪৮ PM

প্রথম পরিচয়-২

মান্নান মারুফ
16-01-2026 12:35:01 PM
প্রথম পরিচয়-২

পর্ব ২: প্রথম পরিচয়
কাফের ভেতরের বাতাসে কফির গরম বাষ্প আর হালকা সঙ্গীতের মিশ্রণ। একটি ছোট টেবিলের পাশে কুদ্দুছ বসে ল্যাপটপ খুলে কাজ করছে, কিন্তু মন তার আজ অন্যত্র—কিছুক্ষণ আগে যে চোখে চোখ মিলেছিল, সেই মেয়ের দিকে।
দরজার ঘণ্টা কেঁপে উঠল, এবং সে তার হাতে কফি নিয়ে ঢুকে গেল। কুদ্দুছের হৃদয় অজান্তেই দ্রুত ধড়ফড় করতে শুরু করল।
“হ্যালো,” মেয়েটি ধীরে ধীরে বলল, “আমি আজ নতুন। এখানে কখনও এসেছি না। তুমি কি সাহায্য করতে পারবে?”
কুদ্দুছ হালকা হাসল, নিজের ভয়টা অচেনা ভাষায় লুকাতে লুকিয়ে। “অবশ্যই। তুমি কি কফি বা চা নেবে?”
“কফি। তবে একটু ভিন্ন—আমি চেষ্টা করতে চাই, এই শহরের কোনো নতুন স্বাদ।” মেয়েটি হালকা কৌতূহলে তাকাল।
কুদ্দুছ মৃদু করে মাথা নাড়ল। “ঠিক আছে, আমি তোমার জন্য সাজেস্ট করব। তুমি নতুন এখানে। একা?”
“হ্যাঁ। নতুন শহর, নতুন জীবন। সবাই ব্যস্ত, আমি কেবলৃ আমি।” তার চোখে এক ধরনের অনির্দিষ্ট আকাঙ্ক্ষা।
কুদ্দুছ বোঝার চেষ্টা করল, সে কি ভয় পেয়েছে, না কৌতূহল তার মনের ভিতর ঢেউ তুলেছে। “তোমার নাম?”
“অ্যামেলিয়া।” শব্দটি যেন কফের গরম বাষ্পের মতো বাতাসে ভেসে গেল।
কুদ্দুছের চোখে হালকা আলোর ঝিলিক। “আমি কুদ্দুছ।”
মুহূর্তটা ছোট, কিন্তু দুইজনের জন্য সময় স্থির হয়ে গেল।
“তুমি এই শহরটি জানো?” অ্যামেলিয়া হালকা প্রশ্ন করল, যেন নিজের একা থাকার ফাঁকা ঘরটি ভরাতে চাচ্ছে।
কুদ্দুছ হাসল, “আমি শুধু ল্যান্ডমার্ক জানি। তবে গল্প জানি শহরের। রাস্তা, মানুষ, কফে—সবই।”
অ্যামেলিয়া অদ্ভুতভাবে আগ্রহী হয়ে উঠল। “তাহলে আমাকে দেখাবে? শহর তোমার চোখে কেমন?”
“হয়তো, একদিন। তবে আজ, কফি দিয়ে শুরু করা যাক।”
কফি এলো। ধীরে ধীরে, এক কাপ ল্যাটে হাতে, তারা বসে আড্ডা শুরু করল।
“ঢাকার কথা বলো,” অ্যামেলিয়া বলল, “কেমন থাকে সেখানে?”
কুদ্দুছ হাসল, চোখে আড়ালভাগে একটুকরো স্মৃতি ভেসে উঠল। “ঢাকা বড়, কোলাহলপূর্ণ। বর্ষার সময়, রাস্তায় পানি। ভ্যাপসা, ঘ্রাণ—সব মিশে এক অদ্ভুত রঙ।”
অ্যামেলিয়ার চোখ বড় হয়ে গেল। “আমি কখনও এমন কিছু দেখিনি। সবই যেন ভিন্ন।”
কুদ্দুছের গলার স্বর নরম হয়ে গেল। “তোমার মতো কেউ দেখলে, সে হয়তো শোনবে না কোলাহল, শুধু গল্প।”
অ্যামেলিয়া হালকা হেসে বলল, “আমি শোনতে চাই। বলো, তুমি কি দেখেছ?”
কুদ্দুছ ঢেউয়ের মতো মনে করল: গ্রামের মেঠো পথ, বর্ষার ঘ্রাণ, মাটির গন্ধ, ছোট ছোট আনন্দ—সবই যেন জীবনের রঙ।
“তুমি বিশ্বাস করবে না,” কুদ্দুছ বলল, “কিভাবে একজন মানুষ তার সুখ খুঁজে পায় ছোট ছোট জিনিসে—একটি নদীর ধারে বসা, এক বাটি ভাত, আর সূর্যাস্ত দেখার সময়।”
অ্যামেলিয়ার চোখে আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। “আর আমি? আমি কি সেই ছোট সুখ বুঝতে পারব?”
কুদ্দুছ চোখে এক অদ্ভুত জেদ। “হয়তো। তবে প্রথমে জানতে হবে—তুমি কি সত্যিই শোনার মতো?”
অ্যামেলিয়া গম্ভীর হয়ে বলল, “হ্যাঁ, আমি চাই শোনার। আমি চাই বুঝতে।”
দু’জনের চোখে এক অদ্ভুত মিল। কফির গরম বাষ্প তাদের মাঝের দূরত্ব ধীরে ধীরে মুছে দিল।
“তুমি কি জানো,” অ্যামেলিয়া হঠাৎ বলল, “আমার জীবনে সবই ছিল পরিকল্পনা, ধন, আভিজাত্য। কিন্তু ভিতরেৃ ভিতরে এক অদ্ভুত একাকীত্ব।”
কুদ্দুছের হৃদয় কেঁপে উঠল। “আমি জানি। আমি এখানে এসেছি স্বপ্ন নিয়ে, তবে কখনো ভাবিনি—এমন কারো চোখে আমি আমার গল্প শোনাব।”
মুহূর্তটি দীর্ঘ হয়ে গেল। তারা শুধু একে অপরকে দেখছে, কোন শব্দের প্রয়োজন নেই। কফির গরম, বাতাসের নরমতা, মানুষের হালকা কথোপকথন—সব মিশে এক বিশেষ অনুভূতি তৈরি করল।
“তুমি কি কখনও ভেবেছ,” অ্যামেলিয়া হেসে বলল, “মানুষ একে অপরের গল্প শুনে শুধু বুঝতে পারে না, অনুভবও করতে পারে?”
কুদ্দুছ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। “হ্যাঁ, আর সেই অনুভূতি হলো সবচেয়ে মূল্যবান।”
কফে শেষ হলে, অ্যামেলিয়া বলল, “তুমি কি আমাকে আবার দেখাবে? ঢাকা শহরের গল্প বলবে?”
কুদ্দুছ কিছুটা লজ্জা পেয়ে বলল, “আমি চাই। তবেৃ আমি জানি না কখন।”
অ্যামেলিয়ার চোখে অদ্ভুত উজ্জ্বলতা। “যদি তুমি সত্যিই চাও, আমরা তো সময় বের করতে পারব। সময় সবসময় আসে। আর যদি না আসে?”
কুদ্দুছ হালকা হাসল। “তাহলে আমরা নিজেরাই সময় বানাব।”
কাফে থেকে বের হওয়ার সময়, তারা একে অপরকে আলিঙ্গন না করে বিদায় নিল, কিন্তু দু’জনের হৃদয়ে একটি অদৃশ্য বন্ধন তৈরি হয়েছে।
সিডনির রাস্তা ভরা রোদ আর মানুষের চাপে, কুদ্দুছ একটুকরো শান্তি পেল। যদিও জীবনে অনেক সমস্যা, ভিসার অনিশ্চয়তা, আর পড়াশোনার চাপ আছে, আজ তার মনে হলো—কোনও এক গল্প, কোনও এক মানুষ, জীবনকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়।

“শহরের কোলাহলে একাকীত্ব হারিয়ে গেল, শুধু চোখে চোখের একটি নতুন আলো—একটি গল্পের শুরু।”   

 চলবে.......