ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:১৫:৫২ PM

অপেক্ষা - ৫

মান্নান মারুফ
20-01-2026 12:22:57 PM
অপেক্ষা - ৫

পর্ব ৫ : ফুলেদের বৃষ্টি বিলাস

একদিন হঠাৎ সমাপ্তির মনে হলো—
ভালোবাসা মানে শুধু কষ্ট নয়।
ভালোবাসা মানে শুধু সহ্য করাও নয়।
ভালোবাসা মানে ফুলের মতো ঝরে পড়া—
নিঃশব্দে, নরমভাবে, নিজের সৌন্দর্য রেখে।

এই ভাবনাটা এলো একেবারে অপ্রস্তুত সময়ে।
সে তখন রাস্তায় হাঁটছিল।
চারদিকে মানুষ, গাড়ি, শব্দ—সব মিলিয়ে কোলাহল।
হঠাৎ সে দেখল, ফুটপাতের পাশে একটি গাছ থেকে ফুল ঝরে পড়ছে।

কেউ দেখছে না।
কেউ থামছে না।
তবু ফুলগুলো ঝরছে—নিজের নিয়মে।

সেই মুহূর্তে সমাপ্তি বুঝে গেল,
তার আর নীলের ভালোবাসাও ঠিক এমনই।
কেউ দেখুক বা না দেখুক,
কেউ গুরুত্ব দিক বা না দিক—
এই ভালোবাসা থাকবেই।

এতদিন সমাপ্তি ভেবেছিল,
ভালোবাসা মানে কষ্ট সহ্য করা।
নিজেকে চেপে রাখা।
নিজের অনুভূতিকে ছোট করে ফেলা।

আর নীল ভেবেছিল,
ভালোবাসা মানে দায়িত্ব নেওয়া।
নীরবে পাশে থাকা।
সব না বলেও সব বোঝা।

কিন্তু সেদিন সমাপ্তি বুঝল—
ভালোবাসা মানে নিজেকে শুকিয়ে ফেলা নয়।
ভালোবাসা মানে নিজের ভেতরের সৌন্দর্যটুকু ঝরিয়ে দেওয়া।
আর নীলও বুঝল—
এই ঝরাটাকে আটকানো নয়,
আগলে রাখাই ভালোবাসা।

ফুল ঝরে পড়লে গাছ হালকা হয়।
ঝরে না পড়লে ডাল ভেঙে যায়।
এই কথাটা দুজনের মনেই গভীরভাবে বসে গেল।

তারা বুঝতে পারল,
ভালোবাসাকে আটকে রাখলে
একদিন দুজনই ভেঙে পড়বে।

তাই তারা ঠিক করল—
তারা আর ভালোবাসাকে বোঝা ভাববে না।
চাপ বানাবে না।
তারা ভালোবাসবে স্বাভাবিকভাবে,
যেমন ফুল কোনো হিসাব না করেই ঝরে পড়ে।

এই ভালোবাসা কাউকে দেখানোর জন্য নয়।
তারা বাহবা চায় না।
তারা চায় না কেউ এসে বলুক—
“তোমরা কত ভালোবাসো।”

এই ভালোবাসা তাদের নিজেদের শান্তির জন্য।
নিজেদের জীবনের জন্য।

অনেক মানুষ ভালোবাসে দেখানোর জন্য।
ছবি তোলে, কথা লেখে, প্রমাণ দেয়।
সমাপ্তি আর নীল এসব করেনি।

কারণ তারা জানত—
যে ভালোবাসা প্রমাণ করতে হয়,
সেখানে কোথাও ভয় লুকিয়ে থাকে।

তাদের ভালোবাসায় ভয় ছিল না।
না হারানোর ভয়,
না না-পাওয়ার ভয়।

কারণ তারা আগেই মেনে নিয়েছিল—
ভালোবাসা মানে পাওয়া নিশ্চিত নয়,
কিন্তু দেওয়া নিশ্চিত।

তারা ভালোবাসাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়নি।
তারা ভালোবাসাকে মুক্ত করে দিয়েছে।
যেখানে যেতে চায়,
যেভাবে ঝরতে চায়—
সে সেভাবেই থাকবে।

ফুল যেমন ঝরে পড়েও সুন্দর থাকে,
তাদের ভালোবাসাও তেমনই।
কখনো কষ্টে ঝরে,
কখনো আনন্দে ঝরে।
কিন্তু ঝরাটা বন্ধ হয় না।

কিছু কিছু দিনে তারা খুব শান্ত বোধ করত।
মনে হতো—
ভালোবাসা আসলে খুব সহজ।
কাউকে ভালো চাইতে পারাই যথেষ্ট,
সবকিছু পাওয়া না পেলেও।

তারা বুঝেছিল—
ভালোবাসা মানে প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা নয়।
ভালোবাসা মানে একে অন্যের অনুভূতিকে বিশ্বাস করা।

সমাপ্তি যখন নীলকে ভাবত,
তার মনে কোনো অভিযোগ আসত না।
নীল যখন সমাপ্তিকে ভাবত,
তার মনেও কোনো দাবি জাগত না।

শুধু একটা নরম অনুভূতি থাকত।
যেন নীরবে কেউ বলছে—
“তুমি ঠিক আছো, আমি আছি।”

এই অনুভূতিটুকুই তাদের জন্য অনেক ছিল।
তারা আর কিছু চায়নি।

অনেক মানুষ জীবনে আসে,
অনেকেই চলে যায়।
কিন্তু কিছু ভালোবাসা থেকে যায়—
নাম ছাড়া,
দাবি ছাড়া।

সমাপ্তি আর নীলের ভালোবাসাও তেমনই।

হয়তো তারা একে অন্যের জীবনে
সবচেয়ে বড় জায়গা নেয়নি।
কিন্তু নিজেদের জীবনে
এই ভালোবাসাটাকে তারা সবচেয়ে যত্নে রেখেছে।

তারা জানত—
সব ফুল মাটিতে পড়ে নষ্ট হয় না।
কিছু ফুল মাটিকে উর্বর করে।
কিছু ফুল নতুন জীবনের শুরু করে।

তাদের ভালোবাসাও হয়তো তেমনই।
তারা হয়তো জানবেই না,
এই নিঃশব্দ ভালোবাসা
কার জীবনে কী বদল আনবে।

কিন্তু তারা এটা জানত—
ভালোবাসা কখনো বৃথা যায় না।

এই ভাবনাটাই তাদের হালকা করে দিল।
আর কোনো চাপ নেই।
আর কোনো হিসাব নেই।

শুধু ভালোবাসা আছে—
ফুলের মতো ঝরে পড়া ভালোবাসা।

সেদিনের পর থেকে
সমাপ্তি আর নীল
এই ভালোবাসাকে আর লুকাতে চায়নি।
দেখানোর জন্য নয়,
অনুভব করার জন্য।

তারা জানত—
ফুলেদের বৃষ্টি বিলাস
সবাই বোঝে না।

কিন্তু যারা বোঝে,
তাদের জন্যই এই ঝরাটা সার্থক।

এই ছিল তাদের ভালোবাসার নতুন রূপ—
কষ্ট নয়,
দায় নয়,
বরং এক ধরনের শান্ত,
দুজনার হয়ে ঝরে পড়া ভালোবাসা।

কেউ দেখুক বা না দেখুক—
সমাপ্তি আর নীল
ফুল হয়ে ঝরতেই থাকে।