ঢাকা, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:১৪:১৩ PM

অপেক্ষা -১

মান্নান মারুফ
19-01-2026 02:09:33 PM
অপেক্ষা -১

পর্ব ১ : কথাহীন ভালোবাসা

নীল কোনোদিন বলেনি, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
এই বাক্যটা তার মুখে আটকে থাকেনি, বরং তা প্রয়োজনই হয়নি। কারণ সে বিশ্বাস করত—ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তাহলে তা বলা লাগে না, অনুভব করালেই যথেষ্ট। শব্দ কখনো কখনো মানুষকে বিভ্রান্ত করে, কিন্তু নীরবতা সবসময় সত্য কথা বলে।

প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙার পর তার প্রথম চিন্তা হতো তাকে নিয়ে। কোনো পরিকল্পনা ছিল না, কোনো আশা প্রকাশ ছিল না—শুধু এক ধরনের অভ্যাস। ঠিক যেমন নিঃশ্বাস নেওয়া। মানুষ যেমন নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য আলাদা করে ভাবেনা, তেমনি সে তাকে ভালোবাসার জন্য ভাবেনি। ভালোবাসা তার ভেতরে স্বাভাবিকভাবে ছিল।

সে জানত, ভালোবাসার মানে ফুল দেওয়া নয়, লম্বা বার্তা লেখা নয়, কিংবা জনসম্মুখে ঘোষণা দেওয়া নয়। তার কাছে ভালোবাসা মানে দায়িত্ব। মানে, কাউকে কষ্ট না দেওয়া। মানে, নিজের সবটুকু দিয়ে কাউকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করা।

অনেক সময় সে দূরে বসে তার সুখ কল্পনা করত। নিজের উপস্থিতি ছাড়াই যদি সে ভালো থাকে—এই চিন্তাটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় স্বস্তি ছিল। সে কখনো নিজেকে প্রয়োজনীয় করে তুলতে চায়নি। কারণ তার বিশ্বাস ছিল, ভালোবাসা মানে দাবি নয়, ভালোবাসা মানে ছাড়।

তাদের কথা হতো খুব কম। কখনো কখনও কয়েকদিন পরপর। আবার কখনো দীর্ঘ সময় কোনো যোগাযোগই থাকত না। তবু সে কখনো অভিযোগ করেনি। তার কাছে সময়ের ব্যবধান কোনো বিষয় ছিল না। কারণ সে জানত, মন এক থাকলে দূরত্ব শুধু সংখ্যায় থাকে, অনুভূতিতে নয়।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সে প্রায়ই জানালার পাশে দাঁড়াত। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। চাঁদ থাকলে ভালো লাগত, না থাকলেও। কারণ আকাশটা তার কাছে একটাই কথা মনে করিয়ে দিত—পৃথিবীর সব মানুষ আলাদা আলাদা জায়গায় থেকেও একই আকাশের নিচে থাকে। এই ভাবনাটা তাকে শান্ত করত।

সে জানত, মানুষ ভালোবাসাকে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে। কেউ বলে, ভালোবাসা মানে একসাথে থাকা। কেউ বলে, ভালোবাসা মানে না ছাড়তে পারা। কিন্তু তার কাছে ভালোবাসা মানে ছিল—নিজেকে প্রস্তুত করা। প্রস্তুত থাকা সবকিছুর জন্য। সুখের জন্য যেমন, দুঃখের জন্যও তেমন।

একদিন সে খুব সাধারণ একটা সিদ্ধান্ত নিল। কোনো নাটকীয় মুহূর্ত ছিল না, কোনো আবেগী কান্নাও ছিল না। সে শুধু নিজের ভেতরে বলেছিল—আমি আমার পুরো জীবন তোমার হাতে তুলে দিলাম। শুধু আজকের দিনটা নয়, আমার ভবিষ্যৎ, আমার স্বপ্ন, আমার সমস্ত সম্ভাবনাও।

এই সিদ্ধান্তের বিনিময়ে সে কিছু চায়নি। কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, কোনো নিশ্চয়তা নয়। সে শুধু নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল পৃথিবীর সব কষ্ট, সব ক্লান্তি, সব অপূর্ণতার দায়। কারণ সে জানত, ভালোবাসা মানে নিজেকে হালকা করা নয়, ভালোবাসা মানে ভার নেওয়া।

সে মাঝে মাঝে ভাবত, যদি কোনোদিন সে জানতে পারে—এই নিঃশব্দ ভালোবাসার কথা। যদি বুঝতে পারে, কেউ দূরে বসে তার জন্য নিজের জীবনকে সাজিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু এই ভাবনাটাও সে জোর করে রাখত না। কারণ তার ভালোবাসা শর্তহীন ছিল।

সাইকোলজি বলে, যাকে তুমি ভুলতে পারছো না, সে কোনো না কোনোভাবে তোমাকে মিস করছে। সে এই কথা বিশ্বাস করত। অনেক সময় হঠাৎ তার বুক ভারী হয়ে আসত, কোনো কারণ ছাড়াই। তখন সে বুঝত—কোথাও কেউ হয়তো তাকে ভাবছে। মন আর মন কথা বলে, শব্দ ছাড়াই।

কিছু রাত ছিল খুব কঠিন। ঘুম আসত না। মাথার ভেতর অনেক প্রশ্ন ঘুরে বেড়াত। কিন্তু সে কখনো এই প্রশ্নগুলোকে উচ্চারণ করেনি। কারণ সে জানত, সব প্রশ্নের উত্তর শব্দে পাওয়া যায় না। কিছু উত্তর সময় নিজেই দিয়ে দেয়।

সে নিজের জীবনকে খুব সাধারণভাবে চালিয়ে যেত। কাজ, দায়িত্ব, মানুষের ভিড়—সবই ছিল। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও তার ভেতরে একটা আলাদা জায়গা ছিল, যেখানে শুধু সে আর তার নিঃশব্দ ভালোবাসা থাকত। সেই জায়গায় কোনো অভিযোগ ছিল না, কোনো আক্ষেপ ছিল না—শুধু গ্রহণ ছিল।

অনেক মানুষ তার ভালোবাসাকে দুর্বলতা ভাবতে পারত। কিন্তু সে জানত, এই নীরবতা দুর্বলতা নয়, এটা সাহস। কারণ সবাই বলতে পারে, সবাই চাইতে পারে—কিন্তু খুব কম মানুষই আছে যারা কিছু না চেয়েও পুরোটা দিয়ে দিতে পারে।

এই ছিল তার ভালোবাসা।
কোনো উচ্চারণ নয়।
কোনো ঘোষণা নয়।
একটি নিঃশব্দ সিদ্ধান্ত—
যার ভেতরে লুকিয়ে ছিল
একটা সম্পূর্ণ জীবন।