জানাজার দিন
কুদ্দুছের জানাজার দিন গ্রামের আকাশটা অদ্ভুতভাবে ভারী ছিল। রোদ ছিল, তবু আলো ঠিকমতো নামছিল না। বাতাস থেমে থেমে বইছিল—যেন গ্রামটাও বুঝে গেছে, আজ কোনো উৎসব নেই, আজ ফেরার আনন্দ নেই; আজ এসেছে একজন মানুষ, কিন্তু কফিনে করে।
গ্রামের মানুষ ভিড় করেছিল। কেউ কুদ্দুছকে খুব কাছ থেকে চিনত, কেউ চিনত না। তবু সবাই জানত—এই মানুষটা প্রবাসে ছিল। এই পরিচয়টাই যেন সব ব্যাখ্যা হয়ে দাঁড়াল। কেউ বলল, “ভাগ্য ভালো, দেশে মরতে পেরেছে।” কেউ বলল, “শেষ পর্যন্ত আরাম পেল।” কিন্তু কেউ বলল না—সে বাঁচতে পারল না কেন।
মায়ের চোখে তখন আর জল নেই। কান্না যেন আগেই শেষ হয়ে গেছে। তিনি কফিনের পাশে বসে ছিলেন নীরবে। আশপাশে লোকজন ফিসফিস করে কথা বলছিল, কিন্তু তাঁর কানে কিছুই ঢুকছিল না। তাঁর সামনে শুধু একটি দৃশ্য—ছোট্ট কুদ্দুছ উঠোনে খেলছে, হঠাৎ পড়ে গিয়ে কাঁদছে, আর তিনি ছুটে যাচ্ছেন।
আজ ছুটে যাওয়ার সুযোগ নেই।
স্ত্রীটি জানাজার কাতারে দাঁড়াতে পারেনি। নারীদের ভিড়ের ভেতরে সে নিঃশব্দে বসে ছিল। তার মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—যে মানুষটা সংসারের সব বোঝা একা বইল, তার জানাজার ভারও কি সে একাই বইবে? এত মানুষ এসেছে, কিন্তু কেউ কি জানে—রাতে সে কীভাবে একা থাকবে?
সন্তানরা বাবার কফিন বুঝত না। বড় মেয়েটা জানত—এটাই শেষ দেখা। ছোট ছেলেটা বারবার জিজ্ঞেস করছিল,
“আব্বু কখন উঠবে?”
কেউ উত্তর দিতে পারেনি।
ইমাম যখন জানাজার নামাজের কথা বললেন, গ্রামের মানুষ কাতার বেঁধে দাঁড়াল। কুদ্দুছের জীবনের সবচেয়ে বড় সমাবেশটা হলো তার মৃত্যুর দিনে। বেঁচে থাকতে সে কখনো এত মানুষের সামনে দাঁড়ায়নি। তখন সে ছিল কাজে ব্যস্ত, রেমিট্যান্স পাঠাতে ব্যস্ত, সংসার টানতে ব্যস্ত।
নামাজ শেষে কফিন ওঠানো হলো। মায়ের হাত কাঁপছিল। তিনি শেষবারের মতো ছেলের কফিনের দিকে তাকালেন। মনে মনে বললেন—
“এই তো তোর ফেরা, কুদ্দুছ?”
কবরস্থানে মাটি পড়ার শব্দটা খুব ভারী ছিল। প্রতিটি ঢেল যেন একেকটা বছর—প্রবাসের বছর, একাকীত্বের বছর, না–বলা কষ্টের বছর। কেউ একজন বলল,
“আল্লাহ ভালোই করেছে, কষ্ট শেষ।”
কিন্তু মা জানতেন—কষ্ট শেষ হয় না, কেবল রূপ বদলায়।
গ্রাম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে গেল। লোকজন ফিরে গেল নিজের ঘরে, নিজের জীবনে। কুদ্দুছ থেকে গেল কবরের ভেতর, আর তার পরিবার থেকে গেল শূন্যতার ভেতর। প্রবাসের টাকা দিয়ে বানানো ঘরটা আজ সবচেয়ে নিঃস্ব লাগছিল।
এই জানাজা শুধু কুদ্দুছের ছিল না।
এটা ছিল হাজারো প্রবাসীর অনুপস্থিত জীবনের সমাপ্তি অনুষ্ঠান।
যেখানে সবাই আসে শেষবারের মতো,
কিন্তু কেউ থাকে না তার পরে।
কুদ্দুছ শুয়ে আছে মায়ের মাটিতে।
তিনি ফিরেছেন ঠিকই।
কিন্তু যে জীবনের জন্য তিনি ফিরতে চেয়েছিলেন—
সে জীবনটা আর নেই।
চলবে……