ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ নির্বাচনি মাঠে অনুপস্থিত থাকলেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে নিজেদের দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে। দলীয় মনোনয়ন ঘোষণার পর সারাদেশে বিএনপির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের শতাধিক নেতা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এতে করে নির্বাচন ঘিরে বিএনপির সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। দলীয় সূত্র জানায়, মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তেও অন্তত ৬০টির বেশি আসনে শতাধিক বিএনপি নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে দলীয় বহিষ্কার কিংবা পদত্যাগের পরও তারা নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে আওয়ামী লীগশূন্য নির্বাচনি মাঠে নির্ভার থাকার কথা থাকলেও বিএনপিকে এখন লড়তে হচ্ছে নিজেদের ভেতরের বিভাজন সামাল দিতে।
কেন্দ্র থেকে তৃণমূল—বিদ্রোহ সর্বত্র
বরিশাল থেকে চট্টগ্রাম, রাজশাহী থেকে ময়মনসিংহ—দেশের প্রায় সব বিভাগেই বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বিপরীতে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। কোথাও একজন, কোথাও একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে থাকায় ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। দলীয় নেতাদের মতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিএনপির নির্বাচনি ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
বরিশাল বিভাগে বরিশাল-১, বরিশাল-৩, পটুয়াখালী-৩ ও ঝালকাঠি-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের বিপরীতে বিদ্রোহী প্রার্থীরা সক্রিয় রয়েছেন। কুমিল্লা অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি আসনেই বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী দেখা গেছে। বিশেষ করে কুমিল্লা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সামিরা আজিম দোলা শুরুতে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিলেও পরে আবার মাঠে নামেন।
ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোতেও একই চিত্র। মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের একাধিক আসনে বিএনপির একাধিক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। খুলনা অঞ্চলে নড়াইল ও বাগেরহাটে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও ঠাকুরগাঁওয়েও বিদ্রোহ থামেনি।
রাজশাহী বিভাগে রাজশাহী, নাটোর ও সিরাজগঞ্জের প্রায় সব আসনেই বিদ্রোহী প্রার্থীরা অবস্থান নিয়েছেন। ময়মনসিংহ বিভাগে পরিস্থিতি আরও জটিল—এখানে প্রায় প্রতিটি আসনে একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলেও বিদ্রোহী প্রার্থীর দীর্ঘ তালিকা বিএনপির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই অবস্থা সিলেট ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও।
বহিষ্কার, অনুরোধ—তবু অনড় বিদ্রোহীরা
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় ইতোমধ্যে অন্তত ১০ জন নেতাকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। পাশাপাশি দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে অনেক বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে নির্বাচনি মাঠ ছাড়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। এতে কয়েকজন সাড়া দিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেও বড় একটি অংশ এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছে।
এ পর্যন্ত যারা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন ঝিনাইদহ-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মুর্শিদা খাতুন, মাদারীপুর-৩ আসনের আসাদুজ্জামান পলাশ, ভোলা-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী গোলাম নবী আলমগীর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের সৈয়দ একে একরামুজ্জামান এবং সুনামগঞ্জ-৫ আসনের মিজানুর রহমান চৌধুরী। নোয়াখালী-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসনা জসীমউদ্দীন মওদুদও তারেক রহমানের আহ্বানে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।
তবে পটুয়াখালী-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বহিষ্কৃত হওয়ায় এখন আর দলীয় অনুরোধ মানার সুযোগ নেই এবং তিনি শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকবেন।
বিএনপির বক্তব্য: একক প্রার্থী নিশ্চিত করা হবে
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ও হাইকমান্ড আশাবাদী যে মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে সব আসনে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান বেগম সেলিমা রহমান বলেন,
“বড় দল হিসেবে বিএনপি থেকে অনেকেই নির্বাচন করতে চান। কিন্তু দলের বৃহত্তর স্বার্থে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। একক প্রার্থীর বিষয়ে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। অন্যথায় দল সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।”
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন জানান, যেসব এলাকায় একাধিক কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন, সেখানে দলের চেয়ারম্যানের নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনের মধ্যে অধিকাংশ সমস্যার সমাধান হবে।
বিদ্রোহীদের পাল্টা অবস্থান
তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের অনেকেই জানিয়েছেন, তারা যেকোনো পরিস্থিতিতেই নির্বাচন করবেন। ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব বলেন,
“আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছি এবং নির্বাচন করবো। জনগণ আমার পাশে আছে। তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা হয়েছে, উনি দোয়া করেছেন।”
শেষ পর্যন্ত কী হবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে বিএনপির সামনে সুবর্ণ সুযোগ থাকলেও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ সেই সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দিতে পারে। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারি বিএনপি কতটা সফলভাবে বিদ্রোহীদের সরিয়ে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে দলটির নির্বাচনি কৌশল ও ফলাফল।
নিজেদের ঘরের এই আগুন শেষ পর্যন্ত নিভবে, নাকি তা আরও বড় সংকটে রূপ নেবে—সে দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক অঙ্গনের।