পর্ব ৪: চোখে চোখে কথা
সিডনির সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ক্যাফের ভেতরে এক অদ্ভুত শান্তি। ল্যাপটপের পর্দায় ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তার ছবি। কুদ্দুছ তাকিয়ে আছে ছবির দিকে, চোখে ঘামচোখের মিশ্রণ—স্বপ্ন আর বাস্তবতার ঝড়।
“দেখছ?” কুদ্দুছ ফিসফিস করে বলল, “এটাই আমার শহর। বর্ষার দিনগুলো, ধুলোমাখা রাস্তাগুলো, ভ্যাপসার ঘ্রাণৃ সবই আমার সঙ্গে।”
অ্যামেলিয়া তার দিকে তাকাল, চোখে বিস্ময় আর কৌতূহল। “এত সুন্দরভাবেৃ তুমি সবকিছু এত ভালোভাবে বর্ণনা করতে পারছ?”
কুদ্দুছ হালকা হাসল। “শুধু বর্ণনা নয়, অনুভবও করতে হয়। চোখে চোখ রাখলে কেউ অনুভব করতে পারে।”
অ্যামেলিয়ার চোখে ঝলক—এক ধরনের অদ্ভুত আগ্রহ। “আমাকে দেখাও?”
কুদ্দুছ হেসে বলল, “দেখাতে চাই, তবে শুধু চোখে চোখে। শব্দের দরকার নেই।”
এক মুহূর্তের জন্য, তারা চুপচাপ একে অপরের দিকে তাকাল। কফির গরম বাষ্প, ক্যাফের মৃদু আলো, রাস্তার দূরের হালকা শব্দ—সব মিলেমিশে তাদের একটি অদৃশ্য বন্ধন তৈরি করল।
“তুমি কি জানো?” অ্যামেলিয়া হঠাৎ বলল, “আমি সবসময় এমন কিছু খুঁজেছি—যা সত্যি, যা অনুভব করা যায়। তুমি আমাকে দেখালেই, আমি বুঝিৃ সত্যি আছে।”
কুদ্দুছ চোখ মেলল, ধীরে বলল, “এটাই আসল জীবন—কতটা সহজ বা কঠিন, তা নয়। অনুভূতি যা দেয়, সেটাই বড়।”
অ্যামেলিয়া হেসে বলল, “তুমি কি জানো, তোমার চোখে কি আছে? এক অদ্ভুত শক্তি। যেন সবাইকে নিজের গল্প বলতে বাধ্য করছ।”
“হয়তো, কারণ আমি চাই কেউ আমার গল্প শোনুক। আমার মতো, কারও কাছে সহজ সুখের গল্প আছে কিনা তা জানার জন্য।”
কফের গরম কাপ হাতে ধরে তারা বসল। অদ্ভুতভাবে, এই ছোট্ট আড্ডা তাদের দুজনের জন্য বড় দুনিয়া হয়ে উঠল।
“কুদ্দুছ,” অ্যামেলিয়া ধীরে বলল, “আমি কি কখনও তোমার সঙ্গে থাকব? বুঝতে পারব, এই শহরের বাইরে কি আছে?”
কুদ্দুছ চোখে অদ্ভুত দম বন্ধ অনুভূতি নিয়ে বলল, “আমি চাই। তবে বাস্তবতাৃ সব সময় আমাদের সঙ্গে থাকবে। ভিসা, পড়াশোনা, পরিবার—সবকিছু।”
অ্যামেলিয়া হেসে বলল, “যদি সত্যি ভালোবাসা থাকে, আমরা পেরিয়ে যাব। চোখে চোখ রাখলেই বোঝা যায়।”
কাফের বাইরে, রাস্তায় গাড়ির হালকা শব্দ। ঢাকার গল্প আর সিডনির বাস্তবতার মিশ্রণ তাদের কল্পনায় মিলেমিশে এক নতুন পৃথিবী তৈরি করল।
“তুমি জানো, আমি কিছুদিন ধরে ভাবছি,” কুদ্দুছ বলল, “আমাদের গল্প শুধু আজকের নয়। হয়তো একদিনৃ আমাদের স্বপ্ন বাস্তবে আসবে।”
অ্যামেলিয়ার চোখে জ্বলজ্বলানি। “আমি চাই সেটাই হোক। আমরা একসাথে থাকব, পৃথিবী যত বাধা দিলেও।”
হঠাৎ, অ্যামেলিয়ার ফোন বেজে উঠল। বাবা। কণ্ঠে চাপ, কড়া স্বর।
“অ্যামেলিয়া, তুমি কি ভাবছো? তুমি আমাদের নিয়ম ভেঙেছ। এমন সম্পর্ক কোনোভাবেই সহ্য করা যাবে না।”
অ্যামেলিয়া নিঃশ্বাস নিয়ে কেবল ফোন কেটে দিল। তার চোখে অদ্ভুত শান্তি।
“কোদ্দুছ,” সে বলল, “যদি পৃথিবী আমাদের জন্য জায়গা না দেয়, আমরা নিজেদের জন্য জায়গা বানাব।”
কুদ্দুছ হাতটা ধরে বলল, “আমি দেখাব, কিভাবে। আমরা একে অপরকে হারাব না।”
সেই রাত, তারা কফের টেবিলে বসে গভীরভাবে চোখে চোখ রাখল। শব্দ নয়, কেবল অনুভূতি।
কুদ্দুছ মনে করল—এই এক চোখের মিলনে জীবনের সব ঝুঁকি, সব অন্ধকার হালকা হয়ে যাচ্ছে।
“তুমি কি জানো, আমি কেমন অনুভব করছি?” অ্যামেলিয়া ফিসফিস করে বলল।
“না। বলো।”
“আমি ভয় পাচ্ছি। কিন্তু ভয় পেলে, আমরা একসাথে থাকি। একে অপরকে সমর্থন করি।”
কুদ্দুছ হেসে বলল, “হ্যাঁ। এবং সেই সমর্থনই আমাদের পৃথিবী তৈরি করবে। আজকের অন্ধকার, আগামী দিনের আলো।”
একটি মুহূর্তের জন্য তারা চুপ। কফির গরম, বাতাসের হালকা শব্দ, এবং তাদের হৃদয়ের স্পন্দন—সব মিলেমিশে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করল।
“শোনো,” কুদ্দুছ ধীরে বলল, “তুমি যদি সত্যি আছ, আমার পাশে, আমি যেকোনো ঝুঁকি নেব। পৃথিবী যত বাধা দিক না কেন।”
অ্যামেলিয়ার চোখে অদ্ভুত রোমাঞ্চ। “আমি জানি। আমি এখানে আছি। এবং থাকব।”
সেদিন, তাদের সম্পর্ক শুধু পরিচয় বা বন্ধুত্ব নয়। এটি হয়েছে এক গভীর সংযোগ—চোখে চোখের ভাষা, হৃদয়ে হৃদয়ের প্রতিশ্রুতি।
“শহরের শব্দ, কফির গরম, এবং চোখে চোখের কথা—সব মিলেমিশে আমাদের পৃথিবী তৈরি করল, যেখানে ভালোবাসা সবকিছুর চেয়ে বড়।”