ঢাকা, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:৩০:২৬ PM

নিঃশব্দ বার্তা–৩

মান্নান মারুফ
17-01-2026 01:43:22 PM
নিঃশব্দ বার্তা–৩

“শেষ যাত্রা”
এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে কুদ্দুছের স্ত্রী বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। বিমানের সময় পার হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। মনে মনে ভাবছিল—লাগেজ নিতে হয়তো দেরি হচ্ছে। এত বছর পর মানুষটা ফিরছে, একটু দেরি তো হতেই পারে। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কাঁপুনি ছিল, তবু সে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছিল। আজ কাঁদবে না বলে ঠিক করেছিল।
তার হাতে ছিল ছোট ছেলের হাত। বাবাকে কখনো কাছ থেকে দেখা হয়নি ছেলেটার। ফোনের পর্দায় দেখা মুখটাই ছিল তার কাছে বাবা। আজ প্রথমবার সে বাবার হাত ধরবে—এই আনন্দে ছেলেটা বারবার জিজ্ঞেস করছিল,
“আম্মু, আব্বু কি এখন বের হবে?”
স্ত্রী হাসি দিয়ে বলেছিল,
“হ্যাঁ রে, একটু পরেই।”
কুদ্দুছের স্ত্রী জানত, এই দিনটার জন্য সে কত রাত নির্ঘুম কাটিয়েছে। কতবার মনে মনে দৃশ্যটা কল্পনা করেছে—স্বামী সামনে আসবে, সে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরবে, কোনো কথা বলবে না, শুধু কাঁদবে। পঁচিশ বছরের অপেক্ষার পর আজ সেই মুহূর্ত।
কিন্তু সময় গড়াচ্ছিল। মানুষ আসছে, যাচ্ছে। পরিচিত মুখ দেখা যাচ্ছে না। বুকের ভেতরের কাঁপুনি এবার ভয় হয়ে উঠল। সে কাউকে জিজ্ঞেস করল। উত্তর এল অস্পষ্ট, এলোমেলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক কর্মকর্তা এসে ধীর কণ্ঠে বললেন—
“আপনারা একটু আমাদের সঙ্গে আসবেন?”
সেই মুহূর্তে তার পা দুটো যেন মাটিতে আটকে গেল। সে বুঝে গেল—কিছু একটা ঠিক নেই। হৃদয় তখনই যেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
অন্যদিকে, কুদ্দুছ তখন এয়ারপোর্টের এক কোণে পড়ে ছিল। তার হাতে পাসপোর্ট, তাতে নতুন সিল—ফিরে আসার সিল। চোখে ছিল শান্তি, যেন দীর্ঘ পথচলার শেষে সে বিশ্রামে নেমেছে। কেউ জানত না, এই মানুষটা ঠিক সেই মুহূর্তে কতখানি ক্লান্ত ছিল। বুকের ভেতরের যন্ত্রণাটা সে কাউকে দেখাতে পারেনি। শেষবারের মতো দেশের বাতাস টেনে নিয়েই সে থেমে গেল।
স্ত্রী যখন তাকে দেখতে পেল, তখন আর কোনো চিৎকার বের হয়নি। শুধু একটা চাপা শব্দ—যেন বুকের ভেতর কিছু ভেঙে পড়ল। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এই মানুষটাই তো আসছিল তার দিকে, এই মানুষটার জন্যই তো সে এত বছর অপেক্ষা করেছে। আজ দেখা হলো ঠিকই, কিন্তু এমনভাবে—যেখানে কথা নেই, স্পর্শ নেই, শুধু শূন্যতা।
সন্তানরা কিছুই বুঝতে পারছিল না। বড় মেয়েটা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। বাবার চোখ বন্ধ কেন—এই প্রশ্নটা তার মুখে আসেনি, কিন্তু চোখে ছিল। ছোট ছেলেটা বাবার হাত ধরতে গিয়েছিল, কিন্তু সেই হাত আর সাড়া দেয়নি।
এয়ারপোর্টের সেই জায়গাটা তখন বদলে গিয়েছিল। যেখানে মানুষের ফেরার আনন্দ থাকার কথা, সেখানে নেমে এলো নীরবতা। কুদ্দুছের জীবনের শেষ অধ্যায়টা লেখা হলো সবার অগোচরে—কোনো বিদায় ভাষণ ছাড়া, কোনো শেষ কথা ছাড়া।
পাসপোর্টে লেখা ছিল—ফিরে আসা।
রাষ্ট্র তাকে গ্রহণ করেছিল।
কিন্তু জীবন তাকে ফিরতে দিল না।
কুদ্দুছের স্ত্রী পরে অনেকবার ভেবেছে—যদি সে আরেকটু আগে আসতে পারত, যদি একবার তাকে ডাকতে পারত, যদি একটা কথা বলতে পারত—“আমি আছি।” কিন্তু এসব ‘যদি’ আর ‘কিন্তু’ কোনো কাজের নয়। জীবন যেমন কঠিন ছিল, বিদায়টাও তেমনি কঠিন হলো।
এই মৃত্যু শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়। এটা একটি পরিবারের ছিন্ন হয়ে যাওয়া। এটা প্রবাসের মূল্য। যে মূল্য কেউ হিসাব করে না, কেউ ফেরতও দেয় না।
কুদ্দুছ চলে গেছে।
কিন্তু এয়ারপোর্টের সেই মুহূর্ত,
স্ত্রীর কাঁপতে থাকা হাত,
সন্তানের অবুঝ চোখ—
এই সবকিছু মিলিয়ে সে রয়ে গেছে চিরকাল।
চলবেৃৃ......