সফলতার ভাঙা সংজ্ঞা
কুদ্দুছের বড় মেয়ে এখন বড় হয়েছে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার ভাবনারাও বদলেছে। ছোটবেলায় সে ভাবত—বাবা মানেই শক্ত মানুষ, যিনি দূরে থাকেন, কিন্তু সবকিছু ঠিক করে দেন। এখন সে বুঝতে শিখেছে—বাবা মানে ছিল দায়িত্বের এক নাম, যে দায়িত্বের ভারে মানুষটা ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল।
স্কুলে একদিন শিক্ষক জিজ্ঞেস করেছিলেন,
“তোমার বাবা কী করেন?”
মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। আগে সে বলত—“আমার বাবা প্রবাসী।” এই শব্দটা তখন গর্বের ছিল। সমাজও বলত—“ভালো করেছেন, প্রবাসে গেছেন।” কিন্তু আজ সে বুঝেছে, প্রবাস শব্দটার আড়ালে কতটা নিঃসঙ্গতা লুকিয়ে থাকে।
সে বলেছিল,
“আমার বাবা আর নেই।”
এই এক বাক্যেই যেন সব ব্যাখ্যা শেষ হয়ে গেল। কেউ আর জানতে চায়নি—তিনি কী করতেন, কেন মরলেন, কীভাবে মরলেন।
ছেলেটা একটু ভিন্ন। সে বাবাকে আদর্শ মানে, কিন্তু ভয়ও পায়। বাবার মতো হতে চায়, আবার বাবার মতো হারিয়ে যেতেও চায় না। সে প্রশ্ন করে—কেন এত কাজ করাকে সাফল্য বলা হয়? কেন নিজের শরীর, নিজের জীবন তুচ্ছ হয়ে যায়?
বাড়ির দেয়ালে বাবার ছবি ঝোলানো। ছবির নিচে লেখা নেই কোনো পদবি, নেই কোনো পুরস্কার। শুধু একটি মুখ—যে মুখটা সব সময় ক্লান্ত ছিল, তবু হাসত। সন্তানেরা এই মুখের সামনে দাঁড়িয়ে নতুন করে সাফল্যের মানে খোঁজে।
সমাজ আজও কুদ্দুছকে “সফল প্রবাসী” বলেই মনে করে। বাড়ি আছে, সন্তান পড়াশোনা করে—এই হিসাবেই তাকে সফল বলা হয়। কিন্তু সন্তানেরা জানে—এই সাফল্যের মূল্য ছিল বাবার জীবন।
রাষ্ট্রের খাতায় কুদ্দুছ একটি পরিসংখ্যান। বিদেশফেরত শ্রমিক। আকস্মিক মৃত্যু। ফাইল বন্ধ। কোথাও লেখা নেই—এই মানুষটা বিশ্রাম পায়নি, চিকিৎসা পায়নি, শেষ মুহূর্তে একজন মানুষের হাতও পায়নি।
মেয়েটা একদিন মাকে বলেছিল,
“আমরা কি বাবার মতো হব?”
মা চুপ করে ছিল। উত্তর জানা ছিল না।
এই নীরবতাই আসলে রাষ্ট্রের নীরবতা, সমাজের নীরবতা। যে নীরবতায় কুদ্দুছরা হারিয়ে যায়, অথচ কেউ দায় নেয় না।
কুদ্দুছের সন্তানরা আজ নতুনভাবে সফল হতে চায়। তারা চায়—বাঁচতে, শুধু টিকে থাকতে নয়। তারা চায়—কাজ করতে, কিন্তু ক্লান্তিতে মরতে নয়।
এই গল্প শুধু তাদের নয়।
এই গল্প হাজারো সন্তানের,
যারা বাবার শূন্যতায় বড় হয়ে ওঠে
আর প্রশ্ন তোলে—
সাফল্য আসলে কী?
চলবে……