নীরব লাশ
এয়ারপোর্টের ফ্লোরে পড়ে থাকা দেহটা শুধু একজন মানুষের ছিল না,
ওটা ছিল হাজারো না–ফেরা স্বপ্নের নীরব লাশ।
কুদ্দুছের শেষ দিনগুলো খুব অদ্ভুতভাবে শান্ত ছিল। যেন দীর্ঘ এক ক্লান্ত জীবনের শেষে সে নিজেও বুঝে গিয়েছিল—আর বেশি দূর নেই। প্রবাসের ঘরটা সে ধীরে ধীরে গুছিয়ে নিচ্ছিল। দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের দিনগুলোতে সে লাল কলমে দাগ দিচ্ছিল—আর কয়টা দিন বাকি, আর কয়টা সকাল এই মরুভূমির রোদে পুড়তে হবে।
শেষ সপ্তাহে সে আর আগের মতো কথা বলত না। সহকর্মীরা ভাবত, দেশে ফেরার আনন্দে হয়তো সে চুপচাপ। কেউ জানত না, রাতের বেলা বুকের ভেতর যন্ত্রণায় সে কতবার জেগে উঠত। ওষুধ খেয়ে আবার কাজে চলে যেত। কুদ্দুছ বিশ্বাস করত—ফিরে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। দেশে মায়ের কোলে মাথা রাখলেই এই চাপটা সরে যাবে।
শেষ কর্মদিবসে সে মালিকের কাছে বিদায় নিতে গিয়েছিল। মালিক কাগজে সই করলেন—চাকরি সমাপ্ত। একটি মানুষের জীবনের পঁচিশ বছরের হিসাব শেষ হয়ে গেল মাত্র এক লাইনের স্বাক্ষরে। কেউ জিজ্ঞেস করল না—সে কেমন আছে, শরীরটা ঠিক আছে কি না।
লাগেজ গোছানোর সময় কুদ্দুছ পুরোনো কিছু কাগজ বের করেছিল—পাসপোর্টের প্রথম ভিসা, প্রথম রেসিডেন্স কার্ড, বেতনের স্লিপ। প্রতিটা কাগজে লুকিয়ে ছিল একেকটা বছর, একেকটা ঘাম। এই কাগজগুলোই তার অস্তিত্বের প্রমাণ ছিল প্রবাসে। মানুষ হিসেবে নয়, শ্রমিক হিসেবে।
বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইমিগ্রেশন কাউন্টারে অফিসার পাসপোর্টে সিল দিলেন—“ফিরে আসা।” সেই শব্দটা কুদ্দুছের চোখ ভিজিয়ে দিয়েছিল। এতদিন পর সে রাষ্ট্রের খাতায় ফিরছে। কিন্তু সেই রাষ্ট্র জানত না—এই ফেরাটা কতটা ক্লান্ত।
ফ্লাইটে বসে সে চোখ বন্ধ করেছিল। হয়তো স্বপ্ন দেখছিল—বাড়ির উঠোন, মায়ের মুখ, স্ত্রীর চা বানানোর শব্দ। এই স্বপ্নগুলোই তাকে এত বছর বাঁচিয়ে রেখেছিল। কিন্তু স্বপ্নের ভারটাই শেষ পর্যন্ত তার শরীর নিতে পারল না।
ঢাকায় নেমে যখন সে এয়ারপোর্টের ফ্লোরে পড়ে গেল, তখন কেউ জানত না তার নাম। সে তখন কেবল একটি দেহ। দ্রুত একটি ফাইল খোলা হলো। পরিচয় নির্ধারণ, কাগজপত্র মিলানো, রিপোর্ট লেখা—সবকিছু চলতে লাগল নিয়ম মেনে।
রাষ্ট্রের কাছে কুদ্দুছ তখন একটি কেস।
একটি নম্বর।
একটি নথি।
কিন্তু যে দেহটা মেঝেতে পড়ে ছিল, সেটা কেবল কুদ্দুছের দেহ ছিল না। ওটার ভেতরে ছিল হাজারো না–ফেরা স্বপ্ন—মায়ের পাশে বসে গল্প করা, সন্তানের হাত ধরে হাঁটা, স্ত্রীর সঙ্গে নিঃশব্দে বসে থাকা। সব স্বপ্ন একসঙ্গে নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
কেউ এসে চাদর চাপা দিল। কাগজে সই হলো—“মৃত।” একটি শব্দে শেষ হয়ে গেল একটি জীবন। অথচ এই মানুষটা বেঁচে থাকতে কত শব্দহীন ত্যাগ করেছে।
রাষ্ট্রীয় নিয়মে তার মৃত্যু সম্পন্ন হলো। কিন্তু মানবিকতায় কোথাও সে অসম্পূর্ণ রয়ে গেল। কেউ জিজ্ঞেস করল না—শেষ মুহূর্তে তার পাশে কেউ ছিল কি না। কেউ লিখল না—সে একা ছিল।
এয়ারপোর্টের ফ্লোর আজও প্রতিদিন মানুষের পায়ে পিষ্ট হয়। কেউ জানে না, সেই জায়গায় একদিন পড়ে ছিল কুদ্দুছ। আর তার সঙ্গে পড়ে ছিল—প্রবাস নামের দীর্ঘ ঋণ।
এই দেহটা ছিল না শুধু একজন মানুষের।
এটা ছিল একটি সময়ের লাশ।
একটি ব্যবস্থার নীরব ব্যর্থতা।
হাজারো কুদ্দুছের প্রতিচ্ছবি।
চলবে………….